শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের নির্বাচনী এলাকা চট্টগ্রাম-৯ (কোতোয়ালি-বাকলিয়া) আসন। চট্টগ্রাম শহরের মূল কেন্দ্রে অবস্থিত গুরুত্বপূর্ণ এই নির্বাচনী এলাকার দিকে মনোযোগ প্রধান দুই দলের। চট্টগ্রামের মর্যাদার কিংবা সৌভাগ্যের আসন হিসাবে বিবেচিত এ আসন থেকে যে দলের প্রার্থী জয় লাভ করে সেই দলই সারা দেশে সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে এবং সরকার গঠন করে বলে মনে করা হয়। ২০১৪ সালের নির্বাচনে জোটের প্রার্থী জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু ছাড়া গত ৬টি সংসদ নির্বাচনের ইতিহাস এমনটিই বলছে। এ আসনের যিনি সাংসদ হন তিনি সরকারের মন্ত্রিসভায়ও ঠাঁই পান। সর্বশেষ ২০১৮ সালে দুই লাখ ২৩ হাজার ৬১৪ ভোট পেয়ে প্রথমবারের মতো সাংসদ নির্বাচিত হয়ে শিক্ষা উপমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন মহিবুল হাসান চৌধুরী। সারা দেশের ন্যায় গুরুত্বপূর্ণ এ আসনেও লেগেছে ভোটের আগাম হাওয়া। আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগ চায় জয়ের ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে আর বিএনপিকে নির্বাচন নিয়ে প্রকাশ্যে দেখা না গেলেও আসনটি পুনরুদ্ধার করতে বদ্ধপরিকর দলটির নেতা-কর্মিরা। চট্টগ্রামের ৯ নম্বর আসন হলেও বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের ৩০০টি নির্বাচনী এলাকার মধ্যে এটির অবস্থান ২৮৬। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী (২০১৮) এই আসনে মোট ভোটার রয়েছে ৩,৯০,৩৬৩ জন। সাবেক সিটি মেয়র ও নগর আওয়ামী লীগের সভাপতি প্রয়াত মহিউদ্দিন চৌধুরীর ছেলে ওই এলাকায় সাংসদ নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে প্রায় বেশীরভাগ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নতুন ভবন নির্মাণ, রাস্তা-ঘাটের সংস্কারসহ এলাকায় ব্যাপক উন্নয়ন করেছে। গত পাঁচ বছরে চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের আধুনীকায়ন, বাকলিয়া এক্সেস রোড, শাহ আমানত সেতু থেকে (নদী ঘেঁষে) কালুরঘাট সেতু পর্যন্ত সংযোগ সড়কসহ নানা দৃশ্যমান উন্নয়নে সরকারের প্রায় শতকোটির টাকার উপরে ব্যয় হয়েছে। এবারও ঐতিহ্যের এই আসন ধরে রাখতে স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠনের বড় একটি অংশ মনে করেন বর্তমান সাংসদ মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের বিকল্প নেই। তবে চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন এই আসনের বাসিন্দা এবং ভোটার। এবার তিনি দল থেকে মনোনয়ন চাইবেন বলে ধারণা দলের একটি অংশের। তাদের দাবী এই আসনে আ জ ম নাছির উদ্দিন নির্বাচিত হলে এলাকার উন্নয়নে ভুমিকা পালন করবেন। কারণ মেয়র থাকাকালিন সময়ে উন্নয়নসহ এই এলাকার রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে বেশ সক্রিয় ছিলেন। এদিকে চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের আইনবিষয়ক সম্পাদক ও চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি বর্তমানে চট্টগ্রাম জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটরের (পিপি) দায়িত্বে থাকা এডভোকেট শেখ ইফতেখার সাইমুল চৌধুরীও এই আসনে দল থেকে এবার মনোননয়ন চাইবেন।
আগামী নির্বাচনে দল থেকে মনোনয়ন চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দিন গতকাল সোমবার দৈনিক দেশ বর্তমানকে বলেন, এবার দল থেকে এই আসনে আমি মনোনয়ন প্রত্যাশী। আমি ছাড়াও দলের যোগ্যরা মনোনয়ন চাইতে পারে এটা স্বাভাবিক। তবে আমাকে মনোনয়ন দিলে শতভাগ জিতবো বলে বিশ^াস করি। দল যদি যোগ্য মনে করে অন্য কাউকে মনোনয়ন দেন তাহলে থাকেও জেতাতে কাজ করবো।
অপরদিকে প্রকাশ্যে ভোট ও মনোনয়ন নিয়ে তৎপরতা না থাকলেও নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন আন্দোলনের পাশাপাশি কৌশলে নিজেদের সাংগঠনিক কাজ চালিয়ে যাচ্ছে বিএনপি। এই আসনে বিএনপি থেকে মনোনয়ন দৌঁড়ে এগিয়ে আছেন চট্টগ্রাম নগর বিএনপির আহ্বায়ক ডা. শাহাদাত হোসেন। দলের একটি বড় অংশের মতে তিনি এই আসনের যোগ্য ও একক প্রার্থী এবং নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে তাঁর জয়ী হবার সম্ভবনা বেশী। ক্লিন ইমেজ এবং দলের দুঃসময়ে স্থানীয় নেতা-কর্মিদের পাশে থাকার কারনে তাঁর বিকল্প নেইও মনে করছেন কর্মি-সমর্থকরা। তবে তিনি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে প্রতিদ¦ন্দ্বীতা করায় এই আসনে দল থেকে মনোনয়ন চাইবেন বলে শোনা যাচ্ছে নগর বিএনপির সদস্য সচিব আবুল হাসেম বক্করের নামও। কারণ হিসাবে বিএনপি একটি অংশ মনে করছে দল প্রতিবারেই ডা. শাহাদাত হোসেনকে মূূল্যায়ন করে মনোনয়ন দেন। তাছাড়া তিনি যেহেতু সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে দলের প্রার্থী হন সেহেতু এই আসনে দলের মনোনয়ন চাইতে পারেন আবুল হাশেম বক্কর। তবে তাদের দুজনের মাঝে কোন কোন্দল কিংবা গ্রুপিং নাই বলে দাবী দলের একাধিক নেতা-কর্মির। ফলে দল এদের দুজন থেকে যাকে মনোনয়ন দেবেন তিনিই নির্বাচনে প্রতিদ¦ন্দ্বীতা করবেন। এছাড়া বিএনপি থেকে ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়ন পাওয়া শিল্পপতি শামসুল আলম এবারও মনোনয়ন প্রত্যাশী বলে গুঞ্জন চলছে। যদি মামলা এবং সাজার কারনে তিনি প্রার্থী হিসাবে দাঁড়াতে না পারেন তাহলে ছেলে শোয়েব রিয়াদ দল থেকে মনোনয়ন চাইবেন বলেও একটি সূত্রে জানা গেছে।
অন্যদিকে চট্টগ্রাম নগর বিএনপির সদস্য সচিব আবুল হাশেম বক্কর দৈনিক দেশ বর্তমানকে বলেন, তত¦াধায়ক সরকারের অধীনে নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে আমরা অংশগ্রহণ করবো। তখন এই আসনে দল থেকে মনোনয়ন চাইবো। দল দিলে নির্বাচন করবো না হয় দলের দেওয়া অন্য প্রার্থীকে জন্য জেতাতে কাজ করবো। আমি আর ডা. শাহাদাত হোসেনর মাঝে কোন দ্বন্দ্ব নেই বলেও জানান বিএনপির এই নেতা।
এদিকে জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য সোলায়মান আলম শেঠ এই আসনে প্রার্থী হওয়া নিয়ে গুঞ্জন থাকলেও তিনি এই আসনে প্রার্থী হওয়ার বিষয়টি নাকচ করে দেন। এছাড়াও বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের এম এ মতিন, ইসলামিক ফ্রন্টের মুজিবুল হক শুক্কুর আগামী নির্বাচনে প্রার্থী হবেন বলে রয়েছে গুঞ্জন।
গত বেশ কয়েকদিন ধরে এই এলাকায় বসবাস করা প্রধান দুই দলের একাধিক নেতা-কর্মীর সাথে কথা বলে জানা যায়, এই আসনে বর্তমান সাংসদ মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল এলাকায় জনপ্রিয়। উপমন্ত্রী হওয়ায় এলাকার স্কুল-কলেজ এবং রাস্তাঘাটসহ বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মসূচীতে তাঁর সরাসরি অবদান রয়েছে। ফলে এ আসনে আওয়ামী লীগ থেকে একক প্রার্থী হিসাবে অনেকটা নিশ্চিত তিনি। তবে দলের একটি অংশ সাবেক সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিনকে চাইলেও তিনি কেন্দ্র থেকে নির্বাচন নিয়ে সরাসরি সবুজ সংকেত না পাওয়া পর্যন্ত এটা নিয়ে সরব হবেন না। বরং দলের মনোনীত প্রার্থীকে জেতাতে অতীতের ন্যায় কাজ করবেন বলেও জানা যায়।
অন্যদিকে নিরপক্ষে সরকারের অধীনে আগামী নির্বাচন হলে, অনেকটা একক প্রার্থী হিসাবে ডা. শাহাদাত হোসেনকে চায় স্থানীয় বিএনপির একটি বড় অংশ। তারা মনে করছেন তিনি প্রার্থী হলে এই আসন পুনরুদ্ধার করা সহজ হবে। যদি কোন কারনে অন্যকোন প্রার্থীকে দল থেকে মনোনয়ন দেন তাহলে এই আসন পুনরুদ্ধার করা কঠিন হবে মনে করছেন স্থানীয় নেতা-কর্মীরা।
সবমিলিয়ে প্রধান দুই দল গুরত্বপূর্ণ এই আসনে একক প্রার্থী নিশ্চিত করে নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করলে নির্বাচনে জেতা সহজ হবে, নয়তো একাধিক প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বীতা করলে জয়ের সমীকরণ কঠিন হবে বলে মনে করছেন স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।