লন্ডনে চার বছর স্বেচ্ছা নির্বাসনে থাকার পর পাকিস্তানে ফিরেছেন নওয়াজ শরিফ। শনিবার (২১ অক্টোবর) দুপুরে ইসলামাবাদে পৌঁছান তিনি। এদিন লাহোরের ঐতিহাসিক ‘মিনার-ই-পাকিস্তান’ স্মৃতিস্তম্ভের সামনে বিশাল এক জনসভায় দীর্ঘ ভাষণও দেন তিনি, যেখানে উঠে আসে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ। বাংলাদেশের অগ্রগতির প্রশংসা করে নওয়াজের দেয়া ভাষণের একটি ক্লিপ সামাজিকমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) পোস্ট করেছেন ভারতীয় সাংবাদিক সিদ্ধান্ত শিবাল।
ভাষণে নওয়াজ শরিফ বলেন, পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান আলাদা না হলে বর্তমান পাকিস্তান এক বিশাল অর্থনৈতিক কডিডোরে পরিণত হতো। যাকে ভারতও গুরুত্ব দিতো। বাংলাদেশ অর্থাৎ পূর্ব পাকিস্তানের সঙ্গে থাকলে আমরা এগিয়ে যেতাম।
বাংলাদেশকে অবজ্ঞা করা হয়েছিল উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, আমরা তখন বলেছি, এরা তো শুধু পাট চাষ করে এবং এরা আমাদের বোঝা। আমরা সেই বোঝা তুলে মাটিতে ছুড়ে ফেলেছিলাম। এখন দেখুন, সেই বাংলাদেশই উন্নয়নে আমাদের চেয়ে এগিয়ে গেছে। আর আমরা পেছনেই রয়ে গেছি। এই অবস্থা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, অনেক ভাবনাচিন্তা করেই ইউরোপ-আমেরিকা বা আরব দুনিয়ার কোনও দেশ নয়, নওয়াজ একদা অখণ্ড ভারতের অপর দুই অংশ ভারত ও বাংলাদেশের অগ্রগতির প্রসঙ্গ টেনে আসলে জাতীয়তাবাদকে হাতিয়ার করতে চাইছেন। পাকিস্তানের মানুষকে বোঝাতে চাইছেন, তিনি পাকিস্তানকে ভারত ও বাংলাদেশের সমকক্ষ করে তুলবেন।
চার বছর বিদেশে স্বেচ্ছা নির্বাসনের জীবন কাটিয়ে শনিবার বিকালে দেশে ফিরে এসেছেন পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ। দেশে ফিরেই পাকিস্তান মুসলিম লিগ (নওয়াজ)-এর প্রতিষ্ঠাতা শরিফ ঘোষণা করেছেন তিনি কারও বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিতে চান না। দেশে থাকার সময় জেলে ছিলেন। তখনই হারান বাবা, মা এবং স্ত্রীকে। শত অনুরোধেও জেল কর্তৃপক্ষ শেষ দেখার সুযোগ দেয়নি। এইসব প্রসঙ্গেই সাংবাদিক বৈঠক এবং জনসভায় আক্ষেপ করেন। তারপর আবেগতাড়িত কণ্ঠে ঘোষণা করেন, কারও বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিতে দেশে ফিরিনি। ফিরেছি উন্নত পাকিস্তান গড়ার স্বপ্ন বুকে নিয়ে।
শনিবার দুবাই থেকে একটি ভাড়া করা বিমানে দলীয় সতীর্থ, সাংবাদিক মিলিয়ে প্রায় দেড়শো জনকে নিয়ে ইসলামাবাদে পৌঁছান। বিমানবন্দর থেকে সোজা ছুটতে হয়েছিল আদালতে, জামিন সংক্রান্ত নথিপত্রে সইসাবুদ করতে। গত শুক্রবার বকেয়া সব মামলাতেই জামিন পেয়েছেন নওয়াজ।
আদালত পর্ব শেষ করে কপ্টারে উড়ে যান নিজের শহর লাহোরে। সেখানে বিশাল জনসভায় ভাষণে লম্বা সময় ধরে বাংলাদেশের কথা বলেন। একদা পূর্ব পাকিস্তান হাতছাড়া হওয়া নিয়ে আক্ষেপ করে নওয়াজ বলেন, ‘পূর্বপ্রান্তের ওই ভূখণ্ড আজ আমাদের সঙ্গে থাকলে পাকিস্তান বদলে যেত। আমরা উন্নত অর্থনীতি গড়ে তুলতে পারতাম। কিন্তু নিজেদের ভুলের জন্য আজ পাকিস্তানের এই দশা।’
পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের উন্নয়নের প্রশংসা করতে গিয়ে বলেন, ‘সামান্য পাট ছাড়া আর কী উৎপাদন হত সেখানে। অথচ, আজ সেই দেশ পাকিস্তানকে ছাপিয়ে কোথায় পৌঁছে গিয়েছে। বাংলাদেশের থেকেও আমরা কেন পিছিয়ে পড়লাম, পাকিস্তানের মানুষের তা জানার অধিকার আছে।’
দেশে ফেরার আগে ভারতের চন্দ্রযানের সফল অবতরণ নিয়ে নওয়াজ দুবাইয়ে সাংবাদিকদের কাছে মুখ খুলেছিলেন। বলেন, ‘হিন্দুস্থান চাঁদে যান পাঠাচ্ছে। দিল্লিতে জি-২০ সম্মেলন করছে। আর পাকিস্তান দেশে দেশে ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে।’
প্রসঙ্গত, এর আগে জেলবন্দি ইমরান খানও মন্তব্য করেছিলেন তার দশা হয়েছে শেখ মুজিবুর রহমানের মতো। জেলে যাওয়ার আগে ইমরান বলেন, ‘মুজিবুরকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে না দিয়ে জেলে আটকে রাখা হয়েছিল। পূর্ব পাকিস্তানে বাঙালিদের উপর নির্মম হত্যাকাণ্ড চালিয়েছিল পাক সেনা। আর আজ মানুষ সঙ্গে আছে বলে আমাকে জেলে ঢোকানো হচ্ছে।’
পাকিস্তানের রাজনৈতিক মহলের খবর, নওয়াজ অচিরেই তার দল পাকিস্তান মুসলিম লিগ (নওয়াজ)-এর দায়িত্ব বুঝে নিয়ে ময়দানে নেমে পড়বেন। শনিবার তার দেশে ফেরা থেকে শুরু করে লাহোরের জনসভায় আগাগোড়া উপস্থিত ছিলেন ভাই তথা আর এক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। তিনি ঘোষণা করে দিয়েছেন সরকার গড়ার সুযোগ পেলে দাদা নওয়াজই হবেন প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু দলের কর্তৃত্ব থাকবে কার হাতে? শনিবার থেকেই এই ব্যাপারে জল্পনা শুরু হয়েছে নওয়াজের ছায়াসঙ্গী মেয়েকে নিয়ে। অনেকেই মনে করছেন, প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী দেশে ফিরে পয়লা দিনেই বার্তা দিলেন, মেয়েই তার উত্তরসূরি।
এখন দেখার বিষয় সেনা বাহিনীর সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের সমীকরণ কী দাঁড়ায়। সেনা অভ্যুত্থানে ক্ষমতা হারানো নওয়াজও আর এক প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী জেলবন্দি ইমরান খানের মতোই সেনার সমালোচক। যদিও প্রতিহিংসার পথে হাঁটবেন না ঘোষণা করে তিনি সেনাবাহিনীকেও সংঘাত এড়ানোর বার্তা দিতে চেয়েছেন, মনে করছে সে দেশের রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা।