আন্দোলন করুন, সন্ত্রাস করলে ছাড় নেই -প্রধানমন্ত্রী

আন্দোলন করুন, সন্ত্রাস করলে ছাড় নেই -প্রধানমন্ত্র
বিশেষ প্রতিবেদক
আন্দোলনের নামে অগ্নিসন্ত্রাস, দুর্বৃত্তায়ন ও ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ হলে ছাড় দেয়া হবে না বলে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গতকাল শনিবার বার কাউন্সিলের নবনির্মিত ভবন উদ্বোধন এবং আইনজীবী মহাসমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, আন্দোলনের নামে বিএনপি, জামায়াত এবং আরও অনেকেই মাঠে নামতে চায়। আন্দোলন করুন, আমাদের কোনও মাথাব্যথা নেই। কিন্তু তারা যদি আবার ওই রকম অগ্নিসন্ত্রাস, ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ করে আমরা কিন্তু ছেড়ে দেবো না। এটা বাস্তবতা। রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশটি অনুষ্ঠিত হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী অগ্নিসন্ত্রাসের সঙ্গে জড়িতদের বিচার দ্রুত শেষ করতে আইনজীবীসহ সরকারি কর্মকর্তাদের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি বলেন, এরা এত অন্যায় করেছে। এদের বিচারকাজ কেন দ্রুত হবে না। এ ব্যাপারে নজর দিতে হবে। কারণ অন্যায়কে প্রশ্রয় দিলে এরা বাড়বে। এদের অনেকে আন্ডারগ্রাউন্ডে ছিল এখন আন্দোলনের সুযোগে সামনে আসছে। আমরা তাদের বাধা দিচ্ছি না। এই অপরাধীরা যাতে যথাযথ সাজা পায় সেই ব্যবস্থা নিতে হবে। বিচারহীনতা যেন না চলে, ন্যায়বিচার যেন মানুষ পায়।
আইনজীবী ও বিচারকের ওপর বিএনপি জামায়াত হামলা করেছিল উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজ বিএনপি জামায়াত এদেশে মানুষের ওপর আক্রমণ করে। সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালায়। জঙ্গিবাদ সৃষ্টি করে তাদের লেলিয়ে দেয়। অবশ্যই তাদের বিচার বাংলাদেশে হতে হবে। তিনি বলেন, অর্থনৈতিকভাবে সারা বিশ্বব্যাপী কিছু মন্দা ভাব যাচ্ছে। তার হাত থেকে বাংলাদেশও রেহাই পায়নি। তবে আমরা প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ, স্যাংশন পাল্টা স্যাংশন সেই সঙ্গে নতুন করে ফিলিস্তিনের ওপর হামলা হয়েছে। হাসপাতালে হামলা করে নারী শিশুদের নির্বিচারে হত্যা করা হয়েছে। এর ফলে আবারও বিশ্বব্যাপী তেল ও জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাচ্ছে। উন্নত দেশগুলোও হিমশিম খাচ্ছে।
শেখ হাসিনা বলেন, অনেকে আছেন রিজার্ভ নিয়ে বেশ উদ্বিগ্ন। অথচ জাতির পিতা ১৯৭২ সালে যখন শাসনভার হাতে নেন কোনও রিজার্ভ মানি ছিল না। কোনও মুদ্রা ছিল না। খাদ্য ছিল না। সরকার প্রধান বলেন, জাতির পিতার হাত ধরে বাংলাদেশের বিচার কাঠামোর গোড়াপত্তন ঘটে। জাতির পিতা আইনজীবীদের কল্যাণ ফান্ড করে দিয়ে যান। জাতির পিতা আমাদের যে পদক্ষেপ দিয়ে গেছেন সেই পথ ধরে আমরা চলি।
তিনি বলেন, জাতির পিতাকে হত্যার পর বেইমান মুনাফিক খন্দকার মোশতাক জিয়াউর রহমানের সহায়তায় ক্ষমতা দখল করে, কিন্তু টিকতে পারেনি। পেছন থেকে যারা কলকাঠি নাড়ায় তারা বেইমানদের ব্যবহার করে, রাখে না। মোস্তাককে বিদায় নিতে হয়। আসল চেহারা বেরিয়ে আসে জিয়াউর রহমানের। একাধারে সেনাপ্রধান সঙ্গে সঙ্গে আবার নিজেকে রাষ্টপতি ঘোষণা দেয়। জিয়াউর রহমান জনগণের ভোট চুরি করে, নির্বাচনি প্রক্রিয়া ধ্বংস করে, এরপর দল গঠন করে। জনগণের ভোট কারচুপি করে দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠ দিয়ে সংবিধানকে ক্ষতবিক্ষত করেছে।
শেখ হাসিনা বলেন, আইনের শাসন, বিচার পাওয়ার অধিকার প্রতিটি মানুষ যাতে পায় সেই ব্যবস্থা আমরা করেছি। বিচার ব্যবস্থার মান উন্নয়নে আমরা অবকাঠামোগত উন্নয়ন করি। তিনি বলেন, ২০০১ সালে বিএনপি যখন ক্ষমতায় এসেছিল বাংলাদেশ ছিল সন্ত্রাসীদের দেশ। জঙ্গিদের দেশ, দুর্নীতির দেশ। দুর্নীতির দুর্গন্ধ ছড়িয়েছে। তারা দেশের অর্থপাচার করেছে। তিনি বলেন, আমাকে বারবার মৃত্যুর মুখোমুখি হতে হয়েছে। কিন্তু আমি দমে যাইনি। আমি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের মেয়ে। দমে যাওয়ার না। নিজের জীবনের চাওয়া-পাওয়া নিয়ে রাজনীতি করি না। রাজনীতি করি এদেশের মানুষের জন্য। কাজেই আমার সংগ্রাম আমি চালিয়ে যাই।
তিনি বলেন, জুডিশিয়ারি যাতে স্মার্ট হয় সেজন্য প্রতিটি আইন ডিজিটালাইজড করা রায়গুলো ডিজিটালাইজড করা, ইংরেজি রায়গুলো যাতে বাংলায় অনুবাদ যাতে হয়, সেটা যেন অনলাইনে পরিচালিত হয় মানুষ যাতে দেখতে পারে সেটা চাই। তিনি বলেন, আমরা বাংলাদেশকে সার্বিকভাবে উন্নত করবো, পাশাপাশি আইনের শাসন চলবে। আত্মসামাজিক অবস্থার উন্নতি হবে, দেশকে আমরা এগিয়ে নিয়ে যাবো। একটা রাষ্ট্রকে সকলে মিলে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করতে পারি। মনে রাখতে হবে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় কোনোরকম যেন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না হয়। মানুষের কল্যাণ যেন আমরা করে যেতে পারি। সেটাই আমাদের লক্ষ্য। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, আমরা চাই, আইনজীবী সমিতির ভবন কেবল বড় বড় শহরে না, অন্যান্য শহরেও হবে।
বিচারকদের আবাসন সমস্যা দূর করতে কাকরাইলে ২০তলা বিশিষ্ট বিচারপতি ভবন করার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজিমপুরে ২০তলা বিশিষ্ট জাজেস কোয়ার্টার করে দেওয়া হয়েছে। আইনজীবী সমিতির ভবন করে দেওয়া হয়েছে ঢাকা-চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জেলায়। আমি জানি, আইনজীবী ভবন করে দেওয়ার একটি দাবি আছে। তবে আর্থিকভাবে যত সচ্ছলতা আসবে পর্যায়ক্রমে সেটি করে দিতে পারবো। তবে একটা শর্ত আছে। তিনি বলেন, ‘সব জেলায় যারা সরকারি আইন কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োজিত রয়েছেন, তাদের মাসিক রিটেইন ফি চার-পাঁচ গুণ বৃদ্ধি করা হয়েছে। মামলার শুনানির জন্য দৈনিক ফি এবং ভেলুয়েশন ফি বাড়ানো হয়েছে।’
এর আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রাজধানীতে ১৩৮ কোটি টাকা ব্যয়ে নবনির্মিত অত্যাধুনিক সুযোগ সুবিথা সম্বলিত ১৫ তলা বিশিষ্ট বাংলাদেশ বার কাউন্সিল ভবন উদ্বোধন করেছেন। তিনি প্রধান অতিথি হিসেবে হাইকোর্ট সংলগ্ন স্থানে নির্মিত উদ্বোধনী ফলক উন্মোচন শেষে ভবনের উদ্বোধন করেন। প্রধানমন্ত্রী ভবনের বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখেন।
এরআগে অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছালে প্রধানমন্ত্রীকে ফুলের তোড়া দিয়ে স্বাগত জানান প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান এবং আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী আনিসুল হক। ভবনটিতে প্রশস্ত অফিস স্পেস, মিটিং রুম, দু’টি কনফারেন্স রুম, রেকর্ড রুম, স্টোর রুম, ওয়েটিং এরিয়া, ক্যাফেটেরিয়া, ডে-কেয়ার সেন্টার, প্রদর্শনী স্থান, রেজিস্ট্রেশন রুম, ব্যাঙ্ক, অ্যাকাউন্টস বিভাগ, আইটি বিভাগসহ অন্যান্য সুবিধা রয়েছে। আইন ও বিচার বিভাগের তত্ত্বাবধানে নির্মিত এবং স্থাপত্য বিভাগের নকশাকৃত ভবনটিতে পাঁচটি ট্রাইব্যুনাল কক্ষ, মাল্টিপারপাস হল এবং পৃথক প্রার্থনা কক্ষ রয়েছে। টিভি লাউঞ্জ, রান্নাঘর এবং ডাইনিং হলসহ বার ভবনে শতাধিক আইনজীবী থাকার ব্যবস্থা রয়েছে।