খেলাপি ঋণের বৃত্ত থেকে বের হতে পারছে না দেশের ব্যাংকিং খাত। উদ্বেগের বিষয় হল, এর ফলে দেশের শিল্প খাত বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে। দেখা যাচ্ছে, ব্যাংকিং খাতে বিতরণ করা ঋণের বড় একটি অংশ ইতিমধ্যে খেলাপি হয়ে গেছে।
শুক্রবার দৈনিক দেশ বর্তমান-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, এ তালিকায় রয়েছে দেশি-বিদেশি ৫৯টি ব্যাংক। নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে অনেকেই পাড়ি জমিয়েছেন বিদেশে।
জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রীর দেয়া তথ্য অনুযায়ী দেশে মোট ঋণ খেলাপির সংখ্যা সাত লাখ ৮৬ হাজার ৬৫ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান। ঋণ পরিশোধ না করায় বছরের পর বছর এসব খেলাপিদের কাছ থেকে টাকা আদায় করতে পারছে ব্যাংকগুলো। ব্যাংকিং খাতে ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ১৫ লাখ কোটি টাকা, খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ২ লাখ কোটি টাকা।
ব্যাংক খাত নিয়ন্ত্রণ সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে ব্যাংক কর্তৃপক্ষগুলোর অপরিণামদর্শী সিদ্ধান্তের কারণে ৫৬ বাণিজ্যিক ব্যাংকে এসব শীর্ষ খেলাপি সৃষ্টি হয়েছে। ঋণ নবায়ন থেকে শুরু করে খেলাপি ঋণের তথ্য প্রদর্শনসহ নানা ধরনের জালিয়াতির আশ্রয় নেয় এসব ব্যাংক। যদিও কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে রাষ্ট্রায়ত্ত ও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর শীর্ষ নির্বাহীদের প্রতি খেলাপি ঋণ আদায় বাড়ানোর কঠোর নির্দেশনা রয়েছে। একই সঙ্গে ঋণ কার্যক্রমে অধিকতর সতর্কতা অবলম্বনের পাশাপাশি বড় ঋণ কমিয়ে ছোট ছোট ঋণ অর্থাৎ এসএমই এবং কৃষি ঋণ বেশি হারে বিতরণ করতে বলা হয়েছে।
গত এক দশকে ব্যাংক ঋণ পরিশোধ না করে লাপাত্তা হয়েছেন চট্টগ্রামের অর্ধশতাধিক ব্যবসায়ী। তাদের মধ্যে অন্তত ৩৩ জন দেশ ছেড়েছেন খেলাপি ঋণের দায় নিয়ে। এসব ব্যবসায়ীদের কাছে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৫০ হাজার কোটি টাকারও বেশি। অর্থঋণ আদালত ও নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্ট (এনআই) অ্যাক্টে তাদের বিরুদ্ধে রয়েছে একাধিক মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ানা।
২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল খেলাপি ঋণ আদায়ে উদ্যোগী হয়েছিলেন, যা দেশের আর্থিক খাতের জন্য একটি ইতিবাচক বার্তা বহন করেছিল। কিন্তু পরবর্তীতে সে বিষয়ে তৎপরতা না থাকায় খুব বেশি কার্যকর হয়নি। বরং ২০১৮ সালের পর থেকে এখন পর্যন্ত খেলাপি ঋণের পরিমাণ আরও বেড়েছে।
দুশ্চিন্তার বিষয় হল, খেলাপি ঋণের পরিমাণ ক্রমাগত বাড়তে থাকায় ব্যাংকগুলোর অবস্থা খুবই নাজুক হয়ে পড়েছে। বলার অপেক্ষা রাখে না, ব্যাপক দুর্নীতি ও অনিয়ম, ঋণ বিতরণে রাজনৈতিক প্রভাব, সুশাসনের অভাব এবং সরকারি ব্যাংকগুলোর ওপর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ অনেকটা শিথিল হওয়ায় খেলাপি ঋণের পরিমাণ না কমে বরং দিন দিন বাড়ছে।
ব্যাংকিং খাতে অসৎ কর্মকর্তাদের দাপট ও আধিপত্য রোধের বিষয়ে নজর দেয়া উচিত। অসৎ ব্যাংক কর্মকর্তাদের অনিয়ম ও দুর্নীতি খেলাপি ঋণের প্রসার ঘটায়।
এ জন্য অনিয়ম ও দুর্নীতিমুুক্ত ব্যাংকিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। ব্যাংকিং খাতে দুর্নীতি ও অনিয়মের অবসান ঘটাতে হলে রাঘববোয়ালদের আইনের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। সরকার এ ব্যাপারে কঠোর হবে- এটাই প্রত্যাশা।