ঋণ ছাড়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-র দেয়া ছয় শর্তের মধ্যে দুটি শর্ত পুরণ করতে না পারার কারণ জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গতকাল বুধবার সকালে বাংলাদেশ ব্যাংকে এ বিষয়ক একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। তাতে আলোচনা হয়, নিট আন্তর্জাতিক রিজার্ভ (এনআইআর) ছাড়া বাংলাদেশ অন্য যে শর্ত পূরণে ব্যর্থ হয়েছে, তা হলো ন্যূনতম রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা।
গত অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) আইএমএফ নির্ধারিতে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১৪ হাজার কোটি টাকা কম আদায় করেছে। এজন্য চলতি অর্থবছর জিডিপির অনুপাতে ০ দশমিক ৫ শতাংশ বাড়তি রাজস্ব আদায় করতে হবে এনবিআরকে। আইএমএফের শর্ত অনুসারে, নতুন অর্থবছরে এনবিআরের যে স্বাভাবিক লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে, তার চেয়ে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত রাজস্ব আদায় করতে হবে। ঢাকায় অবস্থানের দ্বিতীয় দিন বুধবার রাজধানীর একটি হোটেলে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আবদুর রউফ তালুকদার ও অর্থসচিব ড. খায়রুজ্জামান মজুমদারের সঙ্গে বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন আইএমএফ কর্মকর্তারা।
পরে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র মেজবাউল হক বলেন, ‘আইএমএফের সঙ্গে বাংলাদেশের এবারের বৈঠক শুরু হয়েছে। ঋণের শর্ত অনুযায়ী যেসব সংস্কার কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়েছে সে বিষয়ে তাদেরকে অবহিত করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। যেসব শর্ত পূরণ করতে পারেনি তার কারণ ব্যাখ্যা করা হয়েছে।’
বাংলাদেশের জন্য ৪.৭ বিলিয়ন ডলার ঋণ অনুমোদন করে গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে। প্রথম কিস্তি ছাড়ের পর দ্বিতীয় কিস্তি পাওয়ার জন্য বেশ কিছু শর্ত পূরণ করতে হতো। তবে সেসব শর্ত পূরণে ব্যর্থ হয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। অনেকগুলো শর্তের মধ্যে একটি ছিল চলতি বছরের জুনের মধ্যে নিট আন্তর্জাতিক রিজার্ভ (এনআইআর) ২৪ দশমিক ৪৬ বিলিয়ন রাখা। তবে সেই শর্ত পূরণ হয়নি। এর মধ্যেই দ্বিতীয় কিস্তির আগে শর্তের অগ্রগতি নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে বৈঠক করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। এতে তাদের ধরেছে বলে জানা গেছে।
জুনের মধ্যে যেসব শর্ত বাংলাদেশ পূরণ করতে পেরেছে, তা হলো সুদের হার নির্ধারণে করিডোর ব্যবস্থা চালু করা ও আইএমএফের বিপিএম-৬ অনুযায়ী রিজার্ভের প্রতিবেদন প্রকাশ। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক গ্রস আন্তর্জাতিক রিজার্ভ (জিআইআর) এর তথ্য প্রকাশ করে, নিট আন্তর্জাতিক রিজার্ভ (এনআইআর) প্রকাশ করে না। বর্তমানে জিআইআর হিসেবে রিজার্ভ রয়েছে ২১ দশমিক ১৫ বিলিয়ন ডলার। আর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিজস্ব হিসেবে রয়েছে ২৭ দশমিক ০৫ বিলিয়ন ডলার। এছাড়া সেপ্টেম্বরের লক্ষ্যমাত্রা পূরণেও ব্যর্থ হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। শর্ত অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে এনআইআর হিসেবে ২৫ দশমিক ৩২ বিলিয়ন ডলার রাখার কথা ছিল বাংলাদেশের। কিন্তু এখানে এনআইআর হিসেবে ব্যর্থ হওয়ার পাশাপাশি জিআইআর হিসেবে ব্যর্থ। এছাড়া মুদ্রার বাজার-নির্ধারিত বিনিময় হার প্রবর্তন করা ও ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি কর্মপরিকল্পনা শেষ করার পাশাপাশি ব্যাংকগুলোর আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদন প্রকাশের শর্ত ছিল সংস্থাটির। এই দুটি শর্ত পূরণ করতে পেরেছে বাংলাদেশ।
সূত্র জানায়, ঋণ কর্মসূচির পরিমাণগত লক্ষ্যমাত্রা ও সংস্কার বাস্তবায়নের অগ্রগতি মূল্যায়নের জন্য কর্মসূচির প্রথম পর্যালোচনা শুরু করতে এরই মধ্যে ঢাকায় এসেছে আইএমএফের প্রতিনিধি দল। মিশনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন আইএমএফের এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় বিভাগের প্রধান রাহুল আনন্দ।
এছাড়া হেড অব বিএফআইইউ, চিফ ইকোনমিস্ট ও বিভিন্ন বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালকরা এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র বৈঠকে যোগ দেবেন। বিভিন্ন বিভাগের পরিচালক ও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সঙ্গে তথ্য পর্যালোচনামূলক আলোচনায় অংশ নেবে আইএমএফ প্রতিনিধিদল। ১৯ অক্টোবর পর্যন্ত ঢাকা অবস্থানকালে তারা এক ডজনের বেশি মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থার সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করবেন।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কোনো দেশ পরিমাণগত কর্মক্ষমতা মানদণ্ড (কিউপিসি) শর্ত পূরণে ব্যর্থ হওয়ার পরও আইএমএফের নির্বাহী বোর্ড যদি মনে করে যে ঋণ কর্মসূচিটি চালিয়ে নেয়া যাবে তাহলে বাকি অর্থ ছাড়ের অনুমোদন আসতে পারে। এমনটি হওয়ার সম্ভাবনা আছে। কারণ, শর্ত পূরণে ব্যর্থতা খুব গুরুতর নয় বা অস্থায়ী ছিল বা সরকার এ বিষয়ে সংশোধনমূলক উদ্যোগ নিচ্ছে। মিসড স্ট্রাকচারাল বেঞ্চমার্ক (এসবি) ও নির্দেশক লক্ষ্য (আইটি) অর্থ ছাড়ের জন্য প্রয়োজন হয় না। তবে সামগ্রিক কর্মসূচির পারফরম্যান্সের প্রেক্ষাপটে বিষয়টি মূল্যায়ন করা হয়। ন্যূনতম এনআইআর একটি কিউপিসি ও কর রাজস্ব ফ্লোর একটি নির্দেশক লক্ষ্য। বাজেট, সামাজিক ব্যয়, উন্নয়নমূলক কাজে বিনিয়োগের মূলধন ও রিজার্ভ অর্থের সর্বোচ্চ সীমার মতো পরিমাণগত লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা হয়েছে।
আইএমএফ দল বাংলাদেশ ব্যাংকে বেঁধে দেয়া সর্বনিম্ন রিজার্ভের শর্ত পূরণ, রিজার্ভ থেকে রফতানি উন্নয়ন তহবিলের (ইডিএফ) অর্থসহ যা অন্যান্য ব্যয়যোগ নয়, তা বাদ দিয়ে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের হিসাবে রিজার্ভ গণনা, বাজারভিত্তিক একক ডলার রেট বাস্তবায়ন খতিয়ে দেখবে। আর্থিক খাতের সংস্থার, মুদ্রানীতি হালনাগাদ, বাস্তবায়নের দুর্বলতা, নীতির আলোকে সামনের দিনে সম্ভাব্যতা, ট্রেজারি বিলের সুদহার, স্মার্ট সুদহার পদ্ধতি, অর্থনীতিতে নতুন সুদহারের বাস্তব চিত্র বিশ্লেষণের নজরদারি রাখার লক্ষ্য দাতা সংস্থাটির।
এদিকে, মরক্কোয় আগামী ৯ অক্টোবর শুরু হচ্ছে বিশ্বব্যাংক এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বার্ষিক সভা। এতে বিশ্বের ১৮৮ দেশের অর্থমন্ত্রী ও গভর্নর অংশগ্রহণ করবেন। তবে এবারের সভায় অংশ নিচ্ছেন না অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। তার পরিবর্তে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেবেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার। এজন্য ইতোমধ্যে ‘ম্যাক্রোইকোনমিক পারফরম্যান্স অব বাংলাদেশ’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রস্তুত করেছে অর্থ বিভাগ। সভায় সেটি উত্থাপন করবেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরের শেষ (জুন) নাগাদ দেশের বৈদেশিক মুদ্রার নিট রিজার্ভ দাঁড়াবে ৩০ বিলিয়ন ডলারে। গত সেপ্টেম্বর শেষে যার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২১ বিলিয়ন ডলার।
প্রতি মাসে রিজার্ভ থেকে কমপক্ষে ১ বিলিয়ন ডলার নিয়ে পণ্য আমদানি ব্যয় মেটাচ্ছে সরকার। এতে বিদেশি মুদ্রার সঞ্চায়ন কমছেই। গত ২ বছরে তা কমে প্রায় অর্ধেকে ঠেকেছে। তবে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রিজার্ভ বাড়াতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে ঢাকা। আমদানি পণ্যের মূল্য ও পরিমাণ পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। অন্যান্য বিষয়াদি তদারকিতে জোর দেয়া হয়েছে। এতে জানানো হয়, চলতি অর্থবছরে আরও বাজেট সহায়তা নেয়া হবে। তাতে রিজার্ভ বাড়বে। এবার এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) এবং এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক (এআইআইবি) থেকে ৪০০-৮০০ মিলিয়ন ডলার পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আগামী বছরের জুন নাগাদ বিশ্বব্যাংক থেকে পাওয়া যাবে আরও ২৫০ মিলিয়ন ডলার। এছাড়া অন্যান্য উন্নয়ন অংশীদারের কাছ থেকে বাজেট সহায়তা চাওয়া হবে। সবমিলিয়ে রিজার্ভ বৃদ্ধি পাবে। উল্লেখ্য, মরক্কোর মারাকাশ শহরে টানা ৬ দিন হবে ওই সভা। সেখানে এসব তুলে ধরা হবে।