আইএমএফের শর্তযুক্ত ঋণ, ঝুঁকিতে দ্বিতীয় কিস্তি

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ)’র দেওয়া ৪৭০ কোটি ডলার ঋণের শর্ত বাস্তবায়ন ও বাংলাদেশের সার্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে আজ (৪ অক্টোবর) ঢাকায় আসছে আইএমএফের একটি মিশন। এ মিশন আগামী ১৯ অক্টোবর পর্যন্ত ঢাকায় সরকারের বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে বৈঠক করবে। সংস্থাগুলো হচ্ছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি), বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগ, বাংলাদেশ ব্যাংক ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র এসব তথ্য জানিয়েছে।

আইএমএফ চলতি বছরের ৩০ জানুয়ারি বাংলাদেশের জন্য ৪৭০ কোটি ডলার ঋণপ্রস্তাব অনুমোদন করে। এর তিন দিন পর প্রথম কিস্তিতে ছাড় করে ৪৭ কোটি ৬২ লাখ ৭০ হাজার ডলার। আগামী নভেম্বরে দ্বিতীয় কিস্তির প্রায় ৭০ কোটি ডলার ছাড় করার কথা রয়েছে। ঋণের দ্বিতীয় কিস্তির অর্থ ছাড়ের আগে তাদের দেওয়া শর্ত বাস্তবায়নের অর্থগতি পর্যবেক্ষণেই ঢাকায় আসছে আইএমএফ মিশন।

বাংলাদেশকে ৪৭০ কোটি ডলার ঋণ দিতে অন্যতম শর্ত হিসেবে ন্যূনতম রিজার্ভ (এনআইআর) ধরে রাখার একটি রোডম্যাপ ঘোষণা করে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। সে অনুযায়ী সেপ্টেম্বরের মধ্যে ন্যূনতম রিজার্ভ রাখার শর্ত ছিল ২৫ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু সেপ্টেম্বর শেষে দেশের রিজার্ভের পরিমাণ নিচে রয়েছে। ফলে সংস্থাটির ঋণের দ্বিতীয় কিস্তি পেতে জটিলতার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। আগামী নভেম্বরের মধ্যে এই কিস্তির অর্থছাড়ের কথা রয়েছে। গত জানুয়ারিতে বাংলাদেশের অনুকূলে ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণপ্রস্তাব অনুমোদন করে আইএমএফ। এর জন্য বেশ কিছু শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়, যার অন্যতম ছিল দাতা সংস্থাটির প্রস্তাবিত বিপিএম-৬ ম্যানুয়াল অনুযায়ী রিজার্ভের হিসাবায়ন এবং তাদের দেওয়া রোডম্যাপ অনুযায়ী, ন্যূনতম রিজার্ভ রাখার সিলিংয়ের শর্তপূরণ। গত ফেব্রুয়ারিতে এই ঋণের প্রথম কিস্তির ৪৭ কোটি ৬২ লাখ ৭০ হাজার ডলার ছাড় করা হয়। আইএমএফের শর্ত মেনে রিজার্ভ ধরে রাখতে আমদানি নিয়ন্ত্রণসহ নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তার পরও প্রতিদিন কমে যাচ্ছে রিজার্ভ। সর্বশেষ সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম ২৬ দিনে রিজার্ভ কমেছে প্রায় ১৯২ কোটি ডলার। আইএমএফের হিসাব পদ্ধতি বিপিএম-৬ অনুযায়ী, গত ২৬ সেপ্টেম্বর শেষে দেশের রিজার্ভ নেমে এসেছে ২১ দশমিক ১৫ বিলিয়ন ডলারে।

শর্ত বাস্তবায়নে অনেক দূর এগিয়েছে বাংলাদেশ। আইএমএফের কাছ থেকে ৪৭০ কোটি ডলার ঋণ পেতে তাদের বেঁধে দেওয়া শর্ত মোতাবেক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভের লক্ষ্য পূরণ হয়নি ঠিক। তবে অন্যান্য ক্ষেত্রে শর্ত বাস্তবায়নে অনেক দূর এগিয়েছে সরকার। ঋণের সুদহার ও মুদ্রাবিনিময় হারে সংস্কার করা হয়েছে। তবে সমস্যা হলো, রিজার্ভের লক্ষ্য পূরণ না হওয়া। অন্যান্য ক্ষেত্রে ছাড় দিলেও আইএমএফ এ ক্ষেত্রে ছাড় দিতে চায় না। এছাড়া প্রায় প্রতিনিয়তই রিজার্ভ কমছে। অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

২০২৬ সাল পর্যন্ত সাড়ে তিন বছরে মোট সাত কিস্তিতে পুরো অর্থ দেওয়ার কথা আইএমএফের। এই ঋণ নিতে ছোট-বড় ৩৮টি শর্ত পূরণ করতে হবে বাংলাদেশকে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আগামী ডিসেম্বরে ২৬ দশমিক ৮১ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে উল্লেখ করা হয়েছে। আইএমএফের ঋণের শর্ত অনুযায়ী গত জুনের শেষে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার নিট রিজার্ভ ২৪ দশমিক ৪৬ বিলিয়ন ডলার থাকার কথা ছিল। জুনে নিট রিজার্ভ ছিল ২০ দশমিক ৪৭ বিলিয়ন ডলার।

একই সঙ্গে ২০২২-২৩ অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ৩ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করে আইএমএফ। এ ক্ষেত্রে এনবিআর রাজস্ব আহরণ করেছে ৩ লাখ ৩১ হাজার ৫০২ কোটি টাকা। বৈদেশিক মুদ্রার নিট রিজার্ভ ও রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হওয়া বাংলাদেশের জন্য দুশ্চিন্তার কারণ বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

আইএমএফের ঋণের শর্ত অনুযায়ী দেশের বৈদেশিক মুদ্রার নিট রিজার্ভে পিছিয়ে থাকার কারণ হিসেবে তারা উল্লেখ করেছে, জ্বালানি, সার ও খাদ্যদ্রব্য আমদানির জন্য সরকারকে রিজার্ভ থেকে ডলার দিতে হয়েছে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের অন্যান্য প্রতিশ্রুতি যেমন- সুদের হার নির্ধারণে করিডোর সিস্টেম চালু, আইএমএফের ব্যালান্স অব পেমেন্ট ম্যানুয়াল-৬ অনুসারে রিজার্ভের হিসাব প্রকাশ করা হচ্ছে। এ ছাড়া মুদ্রাবিনিময় হার বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি কর্মপরিকল্পনা শেষ করে ব্যাংকগুলোর আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে। সংস্কারমূলক কার্যক্রম আগামীতে রিজার্ভ বাড়াতে সহায়ক হবে বলেও জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

তবে অন্যান্য ক্ষেত্রে অনেক ভালো অগ্রগতি করেছে বাংলাদেশ। শর্ত অনুযায়ী এ বছরের শুরুতেই শ্রমশক্তি জরিপেরও ত্রৈমাসিক হিসাব শুরু করেছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। এ ছাড়াও ২০২৩ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে জিডিপি গণনার শর্ত দিয়েছিল আইএমএফ। গত সপ্তাহে ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে জিডিপির হিসাব প্রকাশ করতে শুরু করেছে বিবিএস। প্রথম দফায় ২০১৫-১৬ থেকে ২০২১-২২ অর্থবছর পর্যন্ত ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে জিডিপি প্রকাশ করেছে।

আইএমএফের দেওয়া আরেকটি শর্ত ছিল, ২০২৩ সালের ডিসেম্বর মাসের মধ্যে শুল্ক ও ভ্যাট বিভাগে ঝুঁকি ব্যবস্থা ইউনিট গড়ে তুলতে হবে। এই শর্ত পূরণে শুল্ক বিভাগের জন্য পৃথক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ইউনিট গঠন করা হয়েছে। এ বিষযটি আইএমএফের যে মিশনটি আসছে সে মিশনটি দ্বিতীয় পর্যালোচনার সময় আলোচনায় আনবে বলে জানা গেছে।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি), বাংলাদেশ পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ড (পিডিবি) ও ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) লোকসানের তথ্য চাওয়া হয়েছে আইএমএফ’র পক্ষ থেকে। এই তিন সংস্থাকে বাজেট থেকে কী ধরনের সহায়তা দেওয়া হচ্ছে সেটি জানতে চাওয়া হয়। এছাড়া বিদেশি ঋণ, জ্বালানি আমদানি ব্যয়, করোনা পরিস্থিতি থেকে বের হওয়ার পদক্ষেপ নিয়ে আবারও আলোচনা হতে পারে বলে জানা গেছে।

বিষয়টি নিয়ে আইএমএফের সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আলোচনা করবে বলে জানান বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই কর্মকর্তা বলেন, এটা নিয়ে আইএমএফের সঙ্গে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের আলোচনা হবে। এসব আলোচনায় কেন আমরা রিজার্ভ ধরে রাখতে পারিনি সেসব যুক্তি তুলে ধরা হবে। যুক্তিতে সন্তুষ্ট হলে শর্ত শিথিল করে ঋণ ছাড় করবে দাতা সংস্থাটি। তবে সব কিছু তাদের বিবেচনার বিষয়। কারণ চাহিদা অনুযায়ী শর্তপূরণ আমরা করতে পারিনি।

আইএমএফের নিয়মানুযায়ী, এনআইআর হিসাবে আগামী ৬০ দিনে পরিশোধ করতে হবে এমন দায়ও রিজার্ভ থেকে বাদ দিয়ে দেখাতে হয়। এসব দায়ের মধ্যে আছে- এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের (আকু) পাওনা, ফরেন কারেন্সি ক্লিয়ারিং অ্যাকাউন্ট, এসডিআর অ্যালোকেশন, আইএমফের ট্রাস্ট ফান্ড (ইসিএফ) ও জাপানের ডেট রিলিভ গ্যারান্টের অর্থ।

এসব দায়বাবদ বর্তমানে সাড়ে ৩ বিলিয়নের মতো ঋণ রয়েছে। বিবিএম-৬ ম্যানুয়াল অনুযায়ী, এখন যে রিজার্ভ দেখানো হচ্ছে, সেটি থেকে এই সাড়ে ৩ বিলিয়ন ডলারও বাদ দিয়ে দেখাতে হবে।