অবৈধ অস্ত্র আসছে বিশেষ অভিযান!

# নেয়া হবে ইসির পরামর্শ # তফসিল ঘোষণার পর থেকে শুরু # বৈধ অস্ত্র নিয়ন্ত্রণেও থাকছে নির্দেশনা

হাসান শাফি

আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠু করার সবরকম প্রস্তুতি নিয়েছে সরকার ও নির্বাচন কমিশন। বিষয়টি নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থার সঙ্গে এরই মধ্যে কয়েক দফা বৈঠক করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সরকারের তরফ থেকে নির্বাচনকে শতভাগ সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ করার লক্ষ্যে সবরকম অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে দেশব্যাপী সাঁড়াশি অভিযানের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

একই সঙ্গে চিহ্নিত সন্ত্রাসী, অবৈধ অস্ত্র ব্যবসায়ী ও অস্ত্র কারবারীদের আইনের আওতায় আনারও নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোর মাঠের আন্দোলন-সমাবেশের নামে যাতে জনগণের জানমালের ক্ষতিসাধন করতে না পারে, সেদিকে কড়া নজর থাকবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর। একইভাবে কড়া নজরদারিতে রয়েছে মাদক কারবারি, পাচারকারীরা।

সূত্র জানায়, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সহিংসতার আশঙ্কা সব সময় থেকেই যায়। নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে তাই বাড়ছে অবৈধ অস্ত্র নিয়ে উদ্বেগ। পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবিসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে প্রায়ই অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করছে। নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে কথা বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিশেষ অভিযানও শুরু করবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তাছাড়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়মিত অভিযানও জোরদার করা হয়েছে। উদ্ধার হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের অবৈধ অস্ত্র।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নির্বাচনের সময়, নির্বাচনের আগে ও পরে অবৈধ অস্ত্র ব্যবহারের কারণে খুনোখুনি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এজন্য অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে সারা দেশে বিশেষ অভিযানের পরিকল্পনা করছেন নীতিনির্ধারকরা। পুলিশ সদর দপ্তরের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলেছেন, অবৈধ অস্ত্রের বিরুদ্ধে সারা দেশে নিয়মিত অভিযান চলমান। তবে নির্বাচনকেন্দ্রিক বিশেষ অভিযানের প্রস্তুতি শুরু করা হয়েছে। জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হলেই অবৈধ অস্ত্রের বিরুদ্ধে সারা দেশে সাঁড়াশি অভিযান শুরু করা হবে।

পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের চেয়ে এবার মিয়ানমার থেকে অবৈধ অস্ত্রের জোগান বেশি দেয়া হতে পারে। সে আশঙ্কা ও গোপন তথ্য থেকে কক্সবাজারে রোহিঙ্গা ক্যাম্পসহ সীমান্তের কিছু এলাকায় নিয়মিত অভিযান চলছে। এছাড়া বিভিন্ন বাহিনীর অভিযানে প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন স্থানে নানা ধরনের আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধারের খবর দেখা যাচ্ছে গণমাধ্যমগুলোতে। পুলিশ, এপিবিএন ও র‌্যাবের অভিযান চলমান বলেও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত ডিআইজি (অপারেশনস) নাসিয়ান ওয়াজেদ বলেন, নির্বাচনের আগে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে বিশেষ অভিযানের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি বৈধ অস্ত্রগুলো কোথায় আছে, তার হিসাব মেলানো হবে এবং জমা দেয়ার নির্দেশও দেয়া হবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, সম্প্রতি দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা বেড়ে গেছে। এই সুযোগে একটি মহল দেশে সহিংসতা করে ফায়দা লুটতে চাচ্ছে। একটি মহল সীমান্ত দিয়ে অস্ত্র আনছে বলে পুলিশের একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে। সম্প্রতি সীমান্ত দিয়ে অস্ত্র আনা হচ্ছে মর্মে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের বক্তব্যে নড়েচড়ে বসেন গোয়েন্দারা। তারা ব্যাপক অনুসন্ধান করে এর সত্যতা পান। এরই পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশের গোয়েন্দারা বিশেষ অভিযানের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে সরকারের ঊর্ধ্বতনদের জানান। এ বিষয়ে এরই মধ্যে যাচাই-বাছাই শেষ হয়েছে। এখন যে কোনো মুহূর্তে বিশেষ অভিযান চালানোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে।

বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) দেয়া তথ্যমতে, জুলাই মাসে একটি পিস্তল, একটি এয়ার পিস্তল, একটি বন্দুক, ৯৫ কেজি সালফার ও ৪৩৯ রাউন্ড গুলি উদ্ধার হয়েছে। জুন মাসে একটি পিস্তল, দুটি ম্যাগাজিন, একটি মর্টার শেল, ১৬ রাউন্ড গুলি ও ১০ কেজি পেট্রোল বোমা তৈরির পাউডার উদ্ধার হয়েছে। গত মে মাসে সীমান্ত এলাকায় চলতি বছরের সর্বোচ্চ আটটি পিস্তল জব্দ করা হয়। সঙ্গে ছিল ৪০ রাউন্ড গুলি ও আটটি ম্যাগাজিন, যা গত কয়েক মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। এছাড়াও উদ্ধার করা হয়েছে ১০০ কেজি সালফার, সাতটি ডেটোনেটর ও চারটি বিস্ফোরক স্টিক। চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে সীমান্তে ৬২টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে একটি সাবমেশিনগানও (এসএমজি) রয়েছে। এর আগের ১০ বছরে মাত্র একটি এসএমজি উদ্ধার হয়েছিল। এ বছর এখন পর্যন্ত ৬৯৫ রাউন্ড গোলাবারুদ ও ২০টি ম্যাগাজিন উদ্ধার করেছে সীমান্তরক্ষী বাহিনী। গোয়েন্দাদের ধারণা সামনে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এসব অস্ত্র ও গোলাবারুদ আনা হচ্ছে। আর এসব অস্ত্র বাহকদের বেশির ভাগই স্থানীয় সাধারণ মানুষ। আর বড় অংশই হাতবদল হয়ে চলে যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সীমান্ত এলাকা থেকে অবৈধ অস্ত্র রাজধানীতে প্রবেশ করছে। সাম্প্রতিক সময়ে কয়েক জনকে গ্রেপ্তারের পর এমনই তথ্য বেরিয়ে এসেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের শিক্ষক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, নির্বাচন ঘিরে সহিংসতার শঙ্কা থাকে। বড় দলের প্রার্থীরা মাঠ দখলে রাখতে চান। কেন্দ্র দখল করে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার প্রবণতা থাকে। সেক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তারের বড় উপায় অবৈধ অস্ত্র। এ কারণে নির্বাচনের আগে অস্ত্রের চোরাচালান বেড়ে যায়। সীমান্তরক্ষী বাহিনী বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সব চালান ধরতে পারে না। ফলে নানা কৌশলে তা অপরাধীদের কাছে পৌঁছে যায়। তিনি বলেন, অস্ত্র কারা আনছে, কারা ব্যবহার করছে, যোগানদাতা কারা- সেসব খুঁজে বের করতে হবে। সীমান্তপথে এক পক্ষ অস্ত্র হস্তান্তর করছে, আরেক পক্ষ গ্রহণ করছে, সারা দেশে ছড়িয়ে দিচ্ছে। শুধু সমতল নয়, পাহাড়েও এখন সন্ত্রাসী ও জঙ্গিগোষ্ঠীর কাছে অস্ত্র যাচ্ছে। তারা এসব অস্ত্র দিয়ে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। এই প্রশিক্ষিত জঙ্গিরা যে আগামী নির্বাচনি কোনো পক্ষের হয়ে ব্যবহৃত হবে না, সেটাও বলা যায় না। তাই অবৈধ অস্ত্রের কারবারিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।