চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ থেকে ভবনের নকশা অনুমোদনের ফরমের সাথে জমা দেওয়া এনওসি বাবদ এক হাজার, নকশা বাবদ দুই হাজার এবং সিডিএ কর্মচারী কল্যাণ ফান্ডের জন্য ২০ টাকার স্লিপে সীল-স্বাক্ষর জাল করে টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) করা অভিযানের পর থেকে সিডিএ’র অথরাইজেশন ও পরিকল্পনা বিভাগের সকল কার্যক্রম আনঅফিসিয়ালি (অনানুষ্ঠানিক) স্থগিত রয়েছে। অনিয়ম তদন্তে করছে সিডিএ, দুদক এবং মন্ত্রাণালয় গঠিত ৩টি পৃথক তদন্ত কমিটি। এদের তদন্তে সহায়তায় ব্যস্ত এই দুই বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারিরাও। ফলে গ্রাহকদের এনওসি জমা, প্লান জমা ও ডেলিভারি বন্ধ থাকায় ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ গ্রাহকরা। তবে জালিয়াতি ও টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠায় ম্যানুয়ালি (সরাসরি অফিসে গিয়ে) আবেদন বন্ধ করে দিয়ে, অনলাইনে আবেদন করার প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে বলে জানান সিডিএর প্রধান প্রকৌশলী। এদিকে আবেদন ফি সরকার অনুমোদিত বিভিন্ন আর্থিক কোম্পানির অ্যাপসের মাধ্যমে জমা নিয়ে অনলাইনে আবেদন নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে সিডিএ।
গতকাল বুধবার দুপুরে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ কার্যালয়ে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কর্মকর্তা-কর্মচারিরা তদন্ত কমিটির কার্যক্রমে সহযোগিতা করতে পুরাতন ফাইল সংগ্রহের কাজে ব্যস্ত।
অভিযোগে জালিয়াতির মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎকারী ও অনিয়মে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করতে সুনির্দিষ্ট তথ্য প্রমাণসহ গঠিত তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক ও নির্বাহী প্রকোশলী এ জি এম সেলিম অফিসের বাইরে থাকায় সরাসরি এবং পরে মুঠোফোনে ফোনকল করেও তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। এ সময় সিডিএর উপ-প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো. আবু ঈসা আনছারী ব্যস্ত থাকায় সাক্ষাতের অনুমতি পাওয়া যায়নি। পরে মুঠোফোনে ফোনকল দিয়েও সাড়া পাওয়া যায়নি। তবে ওই সময় অফিসে উপস্থিত এস্টেট অফিসার মো. আলমগীর খান আনঅফিসিয়ালি (অনানুষ্ঠানিক) গ্রাহকদের কাজ বিঘ্নিত হওয়ার কথা স্বীকার করেন। তিনি বলেন, তদন্ত কমিটিকে সহযোগিতা করতে সবাই ব্যস্ত থাকায় অন্যান্য কার্যক্রম কিছুটা স্থিমিত হয়েছে। আশা করি শীঘ্রই গ্রাহকদের সেবা পুনরায় চালু হবে।
নাম প্রকাশ না করার শর্র্তে বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী দৈনিক দেশ বর্তমানকে জানান, দুদকের হঠাৎ করে অভিযান এবং ভবনের নকশা অনুমোদনের ফরমে ব্যাংকের সীল-স্বাক্ষর জাল তদন্তে তিন বছরের কাগজ চাওয়ায় তা বের করে একজায়গায় করতে সবাই হিমশিম খাচ্ছে। মূলত বেশিরভাগ কর্মকর্তা-কর্মচারী এই কাজে নিয়োজিত থাকায় আপতত গ্রাহকদের সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের আরেক কর্মকর্তা জানান, অথরাইজেশন ও পরিকল্পনা বিভাগে এনওসি জমা, ডেলিভারি ও প্লান জমা আনঅফিসিয়ালি স্থগিত রেখেছে কর্তৃপক্ষ। দালাল ও স্টাফের সংশ্লিষ্টতায় প্লান জমা দেওয়ার সময় তিন খাতে ব্যাংকে মোট তিন হাজার ২০ টাকা জমার স্লিপে দুই/তিন বছর ধরে জালিয়াতি করার কারণে এবং দুদকের অভিযানের পর তা তদন্তে সিডিএ, মন্ত্রাণলায় এবং দুদকের তিনটি তদন্ত কমিটি কাজ করছে। এদিকে সিডিএর সাথে থাকা পূবালী ব্যাংক টাকা নেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। অনলাইনে বিকাশ, নগদ, রকেটের মাধ্যমে টাকা নেওয়ার পরিকল্পনা করলেও সার্ভার আপডেট না হওয়ায় সেখানেও টাকা নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। মাস খানেক আগে পাস হওয়া প্লানও ডেলিভারি দিতে পারছে না সিডিএ।
গ্রাহকদের কাজে কিছুটা বিঘ্নিত হওয়ার কথা স্বীকার করেন চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্র্তৃপক্ষের প্রধান প্রকৌশলী কাজী হাসান বিন শামস। তিনি দৈনিক দেশ বর্তমানকে বলেন, ভবনের নকশা অনুমোদনের ফরমের সাথে থাকা ব্যাংক স্লিপে সীল-স্বাক্ষর জাল করে টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠায় তদন্ত চলছে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে এই অনিয়ম থেকে বাঁচতে ম্যানুয়েলি আবেদন বন্ধ করে দিয়ে অনলাইনে আবেদন করার প্রক্রিয়া শুরু করেছি। এখন থেকে দালাল কিংবা অসাধু কর্মচারিরা অনিয়মের সুযোগই পাবে না। সরাসরি অনলাইনে আবেদন করে গ্রাহকরা সেবা নিতে পারবেন।
অনিয়মে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ’র কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী জড়িত থাকার প্রমাণ পেলে কী ব্যবস্থা নেবেন এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, অনিয়মের সাথে জড়িত কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না সেই যেই হোক। সাময়িক গ্রাহক সেবা বিঘ্নিত হওয়ায় তিনি দুঃখ প্রকাশ করে গ্রাহকদের উদ্দেশ্য বলেন, আগামীতে অনলাইনে আবেদন করলে কোনো অসুবিধায় পড়বেন না। অনলাইনে আবেদনের পদ্ধতি সহজে বুঝতে প্রচারের ব্যবস্থা করবে বলেও জানান তিনি।
চলতি মাসের ১৩ সেপ্টেম্বর দুপুরে ভবনের নকশা অনুমোদনের ফরমে ব্যাংকের সীল-স্বাক্ষর জাল করে টাকা আত্মসাতের অভিযোগ খতিয়ে দেখতে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ’র কার্যালয়ে দুদকের উপ-পরিচালক নাজমুস সাদাতের নেতৃত্বে অভিযান চালায় ১০ সদস্যের একটি টিম। এ সময় প্রতিষ্ঠানটির বেশ কিছু নথি পর্যালোচনা করেন দুদক কর্মকর্তারা।
জানতে চাইলে ওই সময় দুদকের উপ-পরিচালক নাজমুস সাদাত ওই সময় গণমাধ্যমকে বলেন, যেহেতু এখানে অনেকগুলো নথি যাচাই বাছাইয়ের বিষয় রয়েছে, তাই আমরা প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন কাগজপত্র চেয়েছি। যা পরবর্তীতে পর্যালোচনা করে ব্যাংক হিসাবের সঙ্গে কোনো অমিল আছে কিনা তা খতিয়ে দেখা হবে।
প্রাথমিকভাবে কোনো অনিয়ম পাওয়া গেছে কি-না জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা প্রায় ২ ঘণ্টার মতো সিডিএ-তে ছিলাম। এ অল্প সময়ে বিশাল ফাইল দেখার সুযোগ নেই। তবে কয়েকটি ফাইল দেখেছি। এর মধ্যে কিছু ফাইলে অনিয়মের সত্যতা পাওয়া গেছে।
সিডিএ’র চেয়ারম্যান এম জহিরুল আলম দোভাষ ওই দিন গণমাধ্যমকে বলেন, আমরা বিষয়টি জানার পর পরই তিন সদস্যের কমিটি গঠন করেছি। আজ দুদকের টিম এসেছিল। তারা আমাদের কাছে কিছু কাগজপত্র চেয়েছে, আমরা তা তাদের হাতে দেব।
দেশ বর্তমান/এআই