‘এই ৩০ লাখ টাকা দে, নইলি তোর জামাইরে মারি ফেলায়্যুম’, ‘বেশি বেশকম গইল্লি তোরে তুলি লই যাইমগু, তোর পঙ্গু পোয়ারেও মারি ফেলাইয়্যুম’, (প্রমিত বাংলায় যা- ‘এই ৩০ লাখ টাকা দাও, না হয় তোর স্বামীকে হত্যা করব’, ‘কোনো ধরনের চালাকি করলে তোকে উঠিয়ে নিয়ে যাব, তোর পঙ্গু ছেলেকেও হত্যা করব’। প্রথমটি দিদার এবং পরেরটি জোবাইরের কথা। এভাবে হুমকি দিয়ে জান্নাতুল ফেরদৌস নামে এক প্রবাসীর স্ত্রী থেকে চক্রের প্রবাসে থাকা সদস্যদের সহায়তায় প্রবাসী স্বামীকে জিম্মি করে জোর করে ৭টি স্বাক্ষরসহ খালি চেক এবং ৩টি ননজুডিশিয়াল স্ট্যাম্প নিয়ে চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ঘটিয়েছে দিদারুল ইসলাম ও তার সহযোগীরা। নিজেকে শিক্ষানবীশ আইনজীবী হিসেবে বিভিন্ন জায়গায় পরিচয় দিলেও খবর নিয়ে জানা গেছে, তিনি ফুলকলি অটোমোবাইলসের হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা। চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার ৭নং জিরি ইউনিয়নের ২নং ওয়ার্ডের মকবুল হাজীর বাড়ির মো. এখলাছুর রহমানের ছেলে দিদারুল ইসলাম।
খবর নিয়ে জানা যায়, মামলা দায়েরের ১দিন পর নিজেকে শিক্ষানবীশ আইনজীবী ও চাকুরিজীবী দেখিয়ে আদালত থেকে জামিনে বের হন। পরে মামলা তুলে না নিলে প্রাণনাশের হুমকি দিতে থাকে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগী গৃহিনীর। পাশাপাশি জোর করে নেওয়া ৫টি খালি চেক ও অলিখিত স্ট্যাম্প দিয়ে সর্বশান্ত করার হুমকিও দিচ্ছে। এ ঘটনায় করা মামলায় চাঁদাবাজী ও প্রতারণার সত্যতা পেয়েছে চান্দগাঁও থানা পুলিশ।
সর্বশেষ আসামি দিদারের ভাই আনিসের পক্ষে দুটো হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর থেকে মামলা তুলে নিতে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ায় গত মঙ্গলবার (১৯ সেপ্টেম্বর) দিবাগত রাতে চান্দগাঁও থানায় সাধারণ ডায়েরি করে প্রবাসীর স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস।
ভুক্তভোগী জান্নাতুল ফেরদৌস দৈনিক দেশ বর্তমানকে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে দিদারসহ একটি চক্র আমার বাসায় এসে আমার প্রবাসী স্বামীর কাছ থেকে ৩০ লাখ টাকা পান দাবি করে টাকা দিতে বলে। টাকা না দিলে প্রবাসী স্বামী ও ছেলেকে প্রাণনাশের হুমকি দেন। বিভিন্ন সন্ত্রাসীদের দিয়ে আমাকে হুমকি দিতে থাকে। কিন্তু আমার স্বামী সংযুক্ত আরব আমিরাত প্রবাসী শাহ আলম তার সাথে থাকা প্রবাসী গিয়াস উদ্দিন (পাসপোর্ট নং এ০০৬৮২০৫৬) থেকে ১ লাখের বেশি দিরহাম (সংযুক্ত আরব আমিরাতের মুদ্রা) পান। বেশ কয়েকজন প্রবাসীর উপস্থিতিতে সমঝোতায় সাদা কাগজে লিখিত দেন ৭০ হাজার দিরহাম পরিশোধ করবে। মূলত ওই টাকা পরিশোধ না করতে প্রবাস থেকে আনিছসহ একটি চক্র দিদারকে ভাড়াটিয়া সন্ত্রাসী হিসাবে ব্যবহার করে আমার উপর চাঁদাবাজি ও অত্যাচার করছে। ওরা আমাকে বেশি কথা না বলতে এবং আইনের আশ্রয় না নিতে হুমকি দিতে থাকে। সর্বশেষ প্রবাসে আমার স্বামীকে চক্রটি জিম্মি করে সারারাত মারধর করে। ১৯ মে ভোর ৫টায় মোবাইলে ফোন করে দিদার আমাকে জোর করে খালি চেক ও স্বাক্ষরযুক্ত খালি স্ট্যাম্প আনতে বলে, না হয় স্বামীকে মেরে ফেলবে বলে। আমি ভয় পেয়ে স্বামীকে বাঁচাতে তাদেরকে বাসায় এসে চেক নিয়ে যেতে বলি। সন্ত্রাসী দিদার ও চক্রটি তা মানতে রাজি হয়নি। তারা বহদ্দারহাট এসে খালি চেক দিতে বলে। বহদ্দারহাট আসার পর দিদারুল ইসলাম, আসামি জুবাইর প্রকাশ জোবায়েদসহ একটি চক্র আমার কাছ থেকে জোর করে স্বাক্ষরিত সিটি ব্যাংক কালুরঘাট শাখার ২টি খালি চেক এবং ইউসিবি ব্যাংক বহদ্দারহাট শাখার ৫টি খালি চেক আদায় করে। একই তারিখে সকাল সাড়ে দশটায় আবারও ফোন করে ১নং আসামি আমার কাছ থেকে ৩টি ননজুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর আদায় করেন। তাদের বিরুদ্ধে মামলা করলে ভিডিও ফুটেজ, ছবি দেখে এবং ফোনকল ট্রেক করলে পুলিশ ঘটনার সত্যতা পেয়ে আসামিদের গ্রেফতার করে। পরে আদালতে মিথ্যা তথ্য দিয়ে জামিনে এসে মামলা তুলে নেওয়ার হুমকিসহ সর্বশান্ত করে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছে। আমি একজন প্রবাসীর স্ত্রী হয়ে সন্ত্রাসীদের বিচার চাই পাশাপাশি আমার থেকে জোর করে নেওয়া চেক ও স্ট্যাম্প পুলিশের মাধ্যমে ফেরত চাই।
ভুক্তভোগীর স্বজন মো. আলাউদ্দিন আক্ষেপ করে বলেন, কোন দেশে বসবাস করছি আমরা। একজন সন্ত্রাসী নিজেকে শিক্ষানবীশ আইনজীবী পরিচয়ে চাঁদাবাজি ও প্রতারণা করছে। চার্জশিটে নাম ও অভিযোগ প্রমাণ হওয়ার পরও জামিনে এসে আমার বোনকে (ভুক্তভোগীকে) মামলা তুলে নেওয়ার জন্য হুমকি দিচ্ছে। সন্ত্রাসী লেলিয়ে দিয়ে প্রাণনাশের হুমকি দিচ্ছে। এটার সঠিক বিচার চাই আমি।
এর আগে গত ১৯ মে সকাল ৮টার দিকে নগরীর চান্দগাঁও বহদ্দারহাট এলাকায় প্রবাসী স্বামীকে মেরে ফেলার ভয় দেখিয়ে জোর করে সন্ত্রাসী কায়দায় সিটি ব্যাংক ও ইউসিবি ব্যাংকের ৫টি খালি চেক এবং অলিখিক স্ট্যাম্প নেওয়ার ঘটনায় ২৬ মে চান্দগাঁও থানায় মামলা হয়। এই মামলায় ৩১ আগস্ট অভিযোগপত্র দেন থানা পুলিশ। অভিযোগপত্রে চাঁদাবাজি ও জোর করে খালি চেক এবং খালি স্ট্যাম্প নেওয়ার প্রমাণ পায় পুলিশ।
বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে চান্দগাঁও থানার অফিসার ইনচার্জ খায়রুল ইসলাম দৈনিক দেশ বর্তমানকে বলেন, বিষয়টি জানার সঙ্গে সঙ্গে আমরা মামলা নিয়ে আসামিদের গ্রেফতার করে আদালতে সোপর্দ করি। তদন্ত করে চাঁদাবাজি ও জোর করে নেওয়া চেক ও স্ট্যাম্প নেওয়ার কথা আসামিরা আমাদের কাছে স্বীকার করে এবং ঘটনার সত্যতা পেয়ে অভিযোগপত্র দিয়েছি। এখন শুনছি আসামি জামিনে এসে বাদীকে হুমকিসহ ভয়ভীতি দেখাচ্ছে বলে অভিযোগ করায় আমরা সাধারণ ডায়েরি করেছেন। তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেব।
অভিযোগ পত্রে লেখা আছে, আসামিরা খুবই চতুর। বাদীর স্বামী প্রবাসে থাকায় আসামিরা তার কাছ থেকে প্রায়সময় চাঁদা দাবি করে আসছিল।
এদিকে গত সোমবার দুপুরে অপরাধ সিন্ডিকেট চক্রের সদস্য কথিত অ্যাডভোকেট পরিচয়ধারী ও শিক্ষানবীশ আইনজীবী দেখিয়ে জামিনে আসা দিদারুল ইসলামের বিরুদ্ধে চাঁদার দাবিতে প্রকাশ্যে প্রাণ নাশের হুমকিসহ জোর করে চেক ও স্ট্যাম্প নেওয়া এবং বেআইনি ও সন্ত্রাসীমূলক কর্মকাণ্ড করায় ব্যবস্থা নিতে চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক বরাবর লিখিত অভিযোগ করেন ভুক্তভোগী।
অভিযোগের বিষয়ে বুধবার বিকালে চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট নাজিম উদ্দিন চৌধুরী দৈনিক দেশ বর্তমানকে বলেন, অভিযোগটি তদন্ত করে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অভিযোগ পত্রে চাঁদাবাজির সত্যতা পাওয়া এবং জামিনে এসে মামলা তুলে নিতে হুমকি দেওয়ার কথা জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে সে যদি এটা করে থাকে তাহলে জামিনের শর্ত ভঙ্গ করেছে। অভিযোগকারীর সন্দেহ সেই শিক্ষানবীশ আইনজীবী নয় বরং মিথ্যা তথ্য দিয়ে আইনজীবী সেজে প্রতারণা করছে এমন প্রশ্ন করলে সভাপতি বলেন, যদি তা হয় তাহলে সে বড় অপরাধ করছে এতে তার কঠিন বিচার হবে বলেও উল্লেখ করেন চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি।
বিষয়টি বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশন বিএইচআরএফ-এর মহাসচিব অ্যাডভোকেট জিয়া হাবীব আহসানের নজরে আনলে তিনি দৈনিক দেশ বর্তমানকে বলেন, রেমিটেন্স যোদ্ধা খ্যাত প্রবাসীর স্ত্রীকে তার স্বামীকে হত্যার হুমকি দিয়ে জোর করে চেক ও স্ট্যাম্প নেওয়ার মামলার চার্জশিটে চাঁদাবাজি ও প্রতারণার সত্যতা মিলেছে। যদিও মামলার আলামত পুলিশ জব্দ করতে পারিনি। এখন মামলার চার্জশিট দেওয়ার পরে দেখা যাচ্ছে বিভিন্ন ব্যক্তি অবৈধভাবে আলমতগুলো ব্যবহার করছে। আলামতগুলো উদ্ধার এবং ব্যবহারকারীদের আইনের আওতায় আনা উচিত। নতুন মামলা নিয়ে তাদের গ্রেফতার করে দ্রুত জোর করে নেওয়া চেকগুলো উদ্ধার করা উচিত। না হয় প্রবাসীর পরিবার নিরাপত্তাহীনতায় ভুগবে। আজকে যদি রেমিটেন্স যোদ্ধারা টাকা না পাঠাত তা হলে আমাদের অর্থনীতির চাকা পিছনে ঘুরতো। তাই প্রবাসীর পরিবারে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। পাশাপাশি ন্যায় বিচার পাওয়াও তার মৌলিক অধিকার।
এ বিষয়ে জানতে অভিযুক্ত দিদারুল ইসলামকে একাধিকবার মোবাইল ফোনে কল দেয়া হলেও তিনি রিসিভ করেননি। ভুক্তভোগীর পরিচিত মানবাধিকারকর্মী কে এম আলী আকবর জানান, রক্ষক ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে উকিল সেজে চাঁদাবাজিতে লিপ্ত হওয়া আমাদের দেশের জন্য অশনি সংকেত। জামিনের জন্য আইনজীবী সমিতিকে ব্যবহার করে পুলিশ রিমান্ড চাইবার আগে, ৩৮৫ ধারা চাঁদাবাজির মামলায় শিক্ষানবীশ আইনজীবীর সার্টিফিকেট দিয়ে যাচাই-বাছাই ছাড়া এক দিনে জামিন দেওয়াতে পুনরায় বাদী হুমকির মুখে পড়েছে। জামিন বাতিল করে চাঁদাবাজদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি।
দেশ বর্তমান/এআই