চট্টগ্রামে হঠাৎ বেড়েছে খুন

চট্টগ্রামে হঠাৎ করেই বেড়েছে খুনের মতো মারাত্মক অপরাধ। অপরাধীদের টার্গেটে পরিণত হচ্ছে, কলেজ ছাত্র, কিশোর-কিশোরী, যুবকরা। বাদ যায়নি শিশুসহ বয়োবৃদ্ধরাও। শুধুু চলতি সেপ্টেম্বর মাসের গত ১৭ দিনে চট্টগ্রামে খুন হয়েছে ১০ জন। খুনের দায়ে আটক হয়েছে ১৫ জন। খুনের সংস্কৃতি থেকে বের হতে হলে সমাজে সহনশীলতা, সংযম ও নীতি নৈতিকতার চর্চা বাড়ানোর উপর জোর দিচ্ছেন সমাজ বিজ্ঞানী।

সমাজ বিজ্ঞানী ও চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয়ের সিনেট সদস্য ড. মঞ্জুরুল আমিন চৌধুরী দৈনিক দেশ বর্তমানকে বলেন, খুন-ছিনতাই এসব সমাজে অপরাধ প্রবণতার হার বাড়ার পরিচায়ক এবং অস্থিরতারও বহিঃপ্রকাশ। সমাজে সহনশীলতা, সংযম ও নীতি নৈতিকতার চর্চা বাড়াতে হবে বলেও মনে করেন এই সমাজ বিজ্ঞানী।

এদিকে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) আ স ম মাহতাব উদ্দিন মনে করেন- এ ধরনের অপরাধ ঠেকাতে পুলিশের পাশাপাশি পরিবার ও সমাজকে এগিয়ে আসতে হবে। তাহলেই অপরাধ দমন ও নিয়ন্ত্রণ পুলিশের জন্য সহজ হবে।

অপরদিকে চট্টগ্রামের সিনিয়র আইনজীবী, জেলা পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট শেখ ইফতেখার সাইমুল চৌধুরী বলেন, খুন বন্ধে সামাজিক প্রতিরোধ ও আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি সমাজ থেকে অপরাধীদের বিচ্ছিন্ন করে দিতে হবে। যখন সমাজ অপরাধীদের পক্ষে অবস্থান নেবে না, তখন অন্য অপরাধীরা অপরাধ করতে আর সাহস পাবে না।

সর্বশেষ গতকাল রবিবার সকালে নগরীর চান্দগাঁও থানার মৌলভী পুকুর পাড় এলাকায় হাত-পা বেঁধে ধর্ষণের পর গলাটিপে হত্যা করেছে তানহা আক্তার মারিয়া নামের এক ৭ বছরের কন্যা শিশুকে। চান্দগাঁও থানার অফিসার ইনচার্জ খায়রুল ইসলাম জানান, শিশুটির বাবা পেশায় একজন রিকশাচালক এবং মা পোশাক শ্রমিক। বাবা-মা বাইরে থাকায় শিশুটি বাসায় একা থাকত। আজ সকালেও শিশুটির বাবা-মা কাজে চলে যান। পরে শিশুটির ফুফু ঘরের দরজা বন্ধ করতে গিয়ে দেখতে পান ঘরের মধ্যে এক ভবঘুরে ছেলেকে। একইসঙ্গে শিশুটির হাত-পা বাঁধা এবং পরনের প্যান্ট নেই। লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়। এ সময় এলাকায় তল্লাশি করে মুন্না নামের অভিযুক্ত যুবককে গ্রেফতার করা হয়। তিনি আরো বলেন, শিশুটিকে গলা টিপে হত্যা করা হয়েছে। গলার দুই পাশে কালো দাগ আছে। এছাড়া আলামত দেখে আমরা প্রায় নিশ্চিত যে শিশুটিকে ধর্ষণ করা হয়েছিল।

এর আগের দিন শনিবার সকালে নিখোঁজের তিনদিন পর পটিয়া উপজেলার বড়লিয়া ইউনিয়নের একটি দিঘি থেকে থেকে ভাসমান অবস্থায় রিপন মল্লিক নামে এক যুবকের মরদেহ উদ্ধার করেছে পটিয়া থানা পুলিশ। রিপন মল্লিক ওই এলাকার মৃত মৃনাল মল্লিকের ছেলে। জানা গেছে রহস্য উদঘাটনে কাজ করছে পুলিশ।

একইদিন শনিবার সকালে বাঁশখালীতে জমি নিয়ে বিরোধের জের ধরে হামলায় আহত দুলা মিয়া (৬০) নামের এক প্রবাসীর মৃত্যু হয়। সম্প্রতি দেশে ফেরা নিহত প্রবাসী গত ৮ সেপ্টেম্বর বাঁশখালী উপজেলার বাহারছড়া ইউনিয়নের মধ্যম চাঁপাছড়ি গ্রামে বিরোধের জেরে হামলায় আহত হয়ে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিল। এ হামলায় মোট ৪ জন আহত হন। বাঁশখালীর বাহারছড়া পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এস আই মুজিবুর রহমান জানান, এক সপ্তাহ আগে জমি বিরোধের জের ধরে দুইপক্ষের মধ্যে মারামারিতে আহত একজনের মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় উভয়পক্ষ পাল্টাপাল্টি মামলা দায়ের করেছে। মামলাগুলোতে আসামিরা জামিনে আছেন।

এর আগের দিন শুক্রবার সন্ধ্যায় নগরের খুলশী থানার সেগুনবাগান এলাকায় পূর্বশত্রুতার জেরে জেরে ছুরিকাঘাতে নিহত হয়েছে আব্দুর রহমান সুজন নামের এক যুবক। তার বাড়ি নোয়াখালীর সেনবাগ উপজেলায়। শনিবার সকালে এ ঘটনায় হত্যায় ব্যবহৃত ছোরাসহ মামলার ৭ আসামিকে গ্রেফতার করে খুলশী থানা পুলিশ। গ্রেফতারকৃতরা হলেনÑ হাবীব হোসেন মুন্না (১৯), রাকিব হাসান (১৯), সজিব (২৫), হৃদয় (২১) ও ঘটনায় জড়িত কিশোর বাদশা (১৬), তানজিদ মো. ইসমাইল (১৬), ও মেহেদী হাসান।

বৃহস্পতিবার (১৪ সেপ্টেম্বর) রাত সাড়ে ১০টার দিকে পটিয়ার ধলঘাট-পাঁচরিয়া রাস্তার পাশে পড়ে থাকা এক অজ্ঞাত আদিবাসী তরুণীর মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। ধারণা করা হচ্ছে, তাকে গণধর্ষণের পর হত্যা করে ফেলে গেছে দুর্বৃত্তরা।

সোমবার (১১ সেপ্টেম্বর) সকালে রাউজান উপজেলার কদলপুর ইউনিয়নের সর্বপূর্বে রাঙামাটির কাউখালী উপজেলার একটি পাহাড় থেকে দেহাবশেষ হিসেবে মাথার খুলি, হাঁড়গোড় উদ্ধার করে রাউজান থানা পুলিশ। অপহরণের ১৪ দিন পর দেহাবশেষ পাওয়া নিহত হৃদয় কদলপুর স্কুল অ্যান্ড কলেজের এইচএসসি দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ও উপজেলার কদলপুর ইউনিয়নের ৯নং ওয়ার্ডের রওশান আলী বাড়ির মুহাম্মদ শফির ছেলে। এই ঘটনায় মামলার ৫ জন আসামিকে গ্রেফতার করা হয়। তৎমধ্যে গণপিটুনিতে নিহত মামলার প্রধান আসামি উমং চিং মারমা। সে রাঙামাটি উপজেলার বেতবুনিয়া ইউনিয়নের রঙ্গিপাড়া গ্রামের উথোয়াইমং মারমার ছেলে। এই ঘটনায় আহত হয় ওসি সহ ৬ পুলিশ। এদিকে মঙ্গলবার বাকী ৪ জনের মধ্যে ২ জন স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিয়েছে আদালতে। গত বৃহস্পতিবার মামলার অন্যতম আসামী অংথাই চিং মারমা প্রকাশ অংথোই চিং মারমা বাবু মারমা স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিয়েছে বলে জানান পুলিশ।

গত রোববার (১০ সেপ্টেম্বর) দুপুরে নগরীর পাহাড়তলী থানার সরাইপাড়া হাজি আশরাফ আলী সড়কে মান্নাকে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করা হয়। মান্না ওই এলাকার বাসিন্দা। তিনি নগরের ১২ নম্বর সরাইপাড়া ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ছিলেন। মামলার প্রধান আসামি জসিম উদ্দিন ও মামলার ৩ নম্বর আসামি তার ছেলে মোহাম্মদ রাহাত। পাহাড়তলী থানার মো. হোসেন মান্না হত্যা মামলার আসামি জসিম উদ্দিন এবং তার ছেলে মোহাম্মদ রাহাতকে কিশোরগঞ্জ জেলার ভৈরব এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয়।

একইদিন রোববার (১০ সেপ্টেম্বর) নগরীর বন্দর থানার কলসীদীঘি রোডে গোলাম মোহাম্মদ চৌধুরীর বিল্ডিংয়ের ৪র্থ তলায় ৯ নম্বর রুমে পারিবারিক কলহের জেরে বালিশ চাপা দিয়ে শ্বাসরোধ করে শাশুড়ি রুমা আক্তার প্রকাশ মঞ্জুরা বেগমকে (৫০) হত্যার অভিযোগে মেয়ের জামাই মো. আজিমকে গ্রেফতার করে বন্দর থানা পুলিশ। গ্রেফতার মো. আজিম (৫৩), কর্ণফুলী থানার শিকলবাহা জামালপাড়ার মৃত মো. আলী জোহারের ছেলে।

শুক্রবার (১ সেপ্টেম্বর) ভোর ছয়টার দিকে বাঁশখালী পুঁইছড়ি ইউনিয়নের পূর্ব পুঁইছড়ি মাইজপাড়া এলাকার নিজ বাড়ির শয়নকক্ষে এক ডেকোরেটর ব্যবসায়ীকে খুন করা হয়েছে। ওই ব্যবসায়ীর নাম মোহাম্মদ বাদশা (৫৬)। উপজেলার বাড়ি থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

খুনের বিষয় নিয়ে সমাজ বিজ্ঞানী ও চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয়ের সিনেট সদস্য ড. মঞ্জুরুল আমিন চৌধুরী দৈনিক দেশ বর্তমানকে বলেন, নির্বাচনের টাকার ভাগ নিয়ে খুন, অপহরণের পর খুনের রকম কয়েকটি ঘটনা খুলশী, বন্দর, রাউজান, বাঁশখালী, পটিয়ায় সম্প্রতি সংঘটিত হয়েছে। এগুলো সমাজে অপরাধ প্রবণতার হার বাড়ার পরিচায়ক এবং অস্থিরতারও বহিঃপ্রকাশ। এ সব নিরোধে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সজাগ দৃষ্টি, অপরাধীকে আইনের আওতায় আনার ক্ষেত্রে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করতে হবে যেন আইনের ফাঁক ফোকরে অপরাধী পার পেয়ে না যায়।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) আ স ম মাহতাব উদ্দিন বলেন, অপরাধীদের ধরতে আমরা সদা তৎপর। বেশ কয়েকটি খুনের ঘটনায় আমরা কম সময়ের মধ্যে অপরাধীদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনতে সক্ষম হয়েছি। নগর পুলিশ অপরাধ থামাতে সবসময় সোচ্চার।

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম জেলা পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট শেখ ইফতেখার সাইমুল চৌধুরী দৈনিক দেশ বর্তমানকে বলেন, বর্তমান সময়ে খুনের মতো জগন্য অপরাধ করেও বীরদর্পে ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়। যা বিচারিক দীর্ঘসূত্রতার কারণে হয়ে থাকে। এ জন্যই অপরাধ দমনে রাষ্ট্রের পাশাপাশি সামাজিক আন্দোলনের বিকল্প নেই।

তিনি আরও বলেন, অন্যদিকে ফরেনসিক মর্গ, পুলিশ, চিকিৎসক, আইনজীবীসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে অপরাধ ও অপরাধী নির্ণয়ে আন্তরিক ও দ্রুততার সাথে কাজ শেষ করতে হবে। যাতে দ্রুত সময়ে অপরাধী তার শাস্তি ভোগ করেন।

দেশ বর্তমান/এআই