দেশের যেকোনো নাগরিকের জন্য পাসপোর্ট একটি অতীব প্রয়োজনীয় উপাদান। বিদেশ ভ্রমণ, চাকরি, উচ্চ শিক্ষা, চিকিৎসা, হজ্ব কিংবা ওমরা করতে পাসপোর্টের বিকল্প নেই। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাসপোর্ট জাতীয় পরিচয় বহন করে। পাসপোর্ট করতে প্রতিদিনই ভিড় লেগে থাকে আঞ্চলিক ও বিভাগীয় পাসপোর্ট অফিসে। যেখানে দীর্ঘসূত্রতার সুযোগ নিচ্ছে দালাল চক্র। অতিরিক্ত টাকার বিনিময়ে তারা দ্রুত ফরম জমা, ফিঙ্গার প্রিন্টের শিডিউলসহ পাসপোর্ট করিয়ে দিচ্ছে, অনেক জটিলতাও এড়ানো যাচ্ছে দালালের সাহায্যে। চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস ঘিরে তৎপর দালালচক্রের সদস্যরা। অফিসের সামনের রাস্তা দিয়ে কেউ হেঁটে গেলেই ডাকাডাকি করেন যুবক ও মধ্যবয়সী কিছু ব্যক্তি। মূলত তারাই অতিরিক্ত টাকা নিয়ে সংঘবদ্ধভাবে এ কাজ করেন।
গত জুলাইয়ে নিজের পাসপোর্ট করতে অনলাইনে আবেদন করেছিলেন শামসুল আলম। তিনি জানান, জুলাইয়ের ১০ তারিখ আবেদন করলেও তার আঙ্গুলের ছাপ নেয়ার তারিখ দেয়া হয় ১১ সেপ্টেম্বর। তিনি বলেন, দুই মাস ধরে অপেক্ষা করছি। ১১ সেপ্টম্বের শিডিউল ডেট দিয়েছে। এটা খুবই ঝামেলার। কখন পাসপোর্ট হবে, আর কখন বিদেশ যাওয়ার প্রসেসিং করবো বুঝতে পারছি না।
বাশঁখালীতে থেকে আসা মো. আনিছুর রহমান দৈনিক বর্তমানকে বলেন, শুধু পাসপোর্টের জন্য ১২ হাজার ৫০০ টাকা দিয়েছি দালালকে। পাশাপাশি হোটেলে থাকা ও খাবারের জন্য এখন পর্যন্ত ১৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। অথচ সরকারি খরচ ৮ হাজার ১০০ টাকা।
লোহাগাড়া উপজেলার বাসিন্দা মো. ইসমাঈল নামের ওমান প্রবাসী বলেন, রিনিউ করতেও নানা রকম ঝামেলা পোহাতে হয়। গত মাসের (আগস্ট) ৮ তারিখ আসতে বললেও সেদিন পাইনি। আজ (২৯ আগস্ট) পাসপোর্ট হাতে পেলাম।
কর্ণফুলী উপজেলার বাসিন্দা মোহাম্মদ সাদেক আহম্মদও ৮ হাজার টাকা দিয়ে দালালের মাধ্যেমে পাসপোর্টে আবেদন করেন। কিন্তু গত মাসের (জুলাই) পাওয়ার কথা থাকলেও পেয়েছে ২৯ আগস্ট। তিনি বলেন, পারিবারিক অবস্থা খারাপ দেখে বিদেশে যাওয়ার জন্য এত কষ্ট করতে হচ্ছে।
এভাবে গত ২৯ আগস্ট সরেজমিনে কথা হয় অন্তত ২২-২৫ জন সেবা নিতে আসা গ্রাহকের সাথে। কেউ কেউ বিড়ম্ববনার ভয়ে কথা বলতে না চাইলেও বেশিরভাগ সেবা গ্রহীতার দাবি, সরাসরি পাসপোর্ট করতে গেলে নানা ঝামেলা মোকাবিলা করতে হয়। কোন ট্রাভেল এজেন্ট কিংবা দালালদের তিন থেকে পাঁচ হাজার টাকা বাড়তি দিলে পাসর্পোট অনায়াসে হয়ে যায়। তাই তাদের বেশিরভাগেই দালালের মাধ্যমে পাসপোর্ট করেছেন।
সরাসরি না করে দালাল ধরে কাজ করলেই ভালো বলে জানান শওকত আলী। নগরীর খাজা রোডের বাসিন্দা শওকত পুলিশ ভেরিফিকেশন বাদে ৮ হাজার টাকা দিয়ে পাসপোর্ট বানান। পুলিশ ভেরিফিকেশনের জন্য দিয়েছেন অতিরিক্ত ৫০০ টাকা। তিনি বলেন, সরাসরি করলে হয়রানির শিকার হতে হয়। যেমন- এটা ঠিক নেই, ওটা শর্ট আছে বলে ভোগান্তিতে পড়তে হয়। বিদেশের যাওয়ার জন্যই ঝামেলা ছাড়া দালালকে দিয়ে এই কাজটি করিয়েছি।
চক্রের এক সদস্যের সঙ্গে গ্রাহক সেজে পরিচয় গোপন করে আলাপ হয় দৈনিক দেশ বর্তমানের এই প্রতিবেদকের। আলাপের শুরুতে দিলেন একটি ভিজিটিং কার্ড। ভিজিটিং কার্ডে নাম সাহাব উদ্দিন, পদবিতে লেখা আছে আল-সারা ইন্টারন্যাশনাল ট্রাভেল এজেন্টের পরিচালক। চকবাজারের একটি মার্কেটে তার অফিস।
শুরুতেই সাহাব উদ্দিন বলেন, আমি যে ফাইল করে দেব, সেটাকে নিয়ে অফিস কাউন্টারে কোন প্রশ্ন করবে না। যেখানে মনছুরাবাদে ফটোকপির ওপর সিল দেব আর এখানে ব্যাংক ভাউচারের ফটোকপিতে আরেকটি সিল দেব। দায়িত্বর কর্মকর্তারা দেখলেই বুঝে নেবেন ফাইলটি কার। না হয় বাড়ি ও ঠিকানাসহ নানান প্রশ্ন করবেন তারা। সিল থাকলে আর কোনো হয়রানির শিকার হতে হবে না আপনাকে। পুলিশ রিপোর্টে দেড় হাজার টাকা, ব্যাংকের চালান ৮১০০, যেখানে চালান ৫০ টাকা ও ভ্যাট ৫০ টাকা অন্তর্ভূক্ত হবে। আমাকে মোট ১১ হাজার ৫০০ টাকা দিতে হবে, এটা ১০ বছরের জন্য আর্জেন্ট । নরমাল পুলিশ ভেরিফিকেশনসহ ১০ হাজার ৫০০ টাকা দিতে হবে।
পুলিশকে টাকা না দিলে ভেরিফিকেশন হবে না কেন প্রশ্ন করলে এই দালাল বলেন, রিপোর্টতো দিবেই না বরং নানান ঝামেলা সৃষ্টি করবে। তিনি আরও বলেন, আমার হাতের লেখা কাগজ এই পাসপোর্ট অফিসে ১০০ রিম আছে। এখানে আমার মতো অভিজ্ঞ আরও ৪/৫ জন আছে।
পাসপোর্ট অফিসের দালালদের নিবন্ধিত সমিতি আছে বলেও জানান তিনি। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আগে ৭৯ জন সদস্য ছিল পাসপোর্ট ফরম লেখক বহুমুখী সমবায় সমিতিতে। যার নিবন্ধন নম্বর ৯০৩৪। যেখানে আমার সদস্য নং ৩২। এক সময় ১০ টাকা করে চাঁদা দিতাম এই সমিতিতে। সেখানে ২৫ লাখ টাকা জমেছিল। পরে এই টাকা সবাইকে লোন দেওয়ার নামে মাল্টিপারপাসের কথা বলে নয়ছয় করার অভিযোগ তুলেন সাবেক সভাপতি আবুল কালাম আজাদ ও সাধারণ সম্পাদক রায়হানের বিরুদ্ধে।
এই সমিতির বর্তমান ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক সাহাব উদ্দিন আরও বলেন, এখন আগের মতো ব্যবসা কিংবা গ্রাহক নেই।
শুধু ফরম জমা কিংবা ফিঙ্গার প্রিন্টের ঝামেলা নয়, আছে পুলিশ তদন্তে হয়রানিও। এ সময় কথা হয় ই-পাসপোর্ট পুনঃতদন্তে দিতে আসা মো. আবদুল মান্নানের সাথে। তিনি বলেন, চলতি বছরের ১৫ মে পাসপোর্টের জন্য আবেদন করেছিলাম। যার নথি নং-৪১০২-০০০২৬০৪৫৮। মামলা আছে বলে বিপক্ষে রিপোর্ট দেন তদন্তকারী পুলিশ কর্মকর্তা। কিন্তু ২০১৪ সালে পটিয়া থানায় জি আর (২২১/১৪) মামলাটি আপোষ হওয়ায় ২০১৬ সালে ৯ অক্টোবর মামলা থেকে খালাস পাই আমি। সেই সময়ের আবেদনে একটি সার্টিফাইড কপি দেওয়ার পরও পুলিশ নেগেটিভ রিপোর্ট দেওয়ায়, আবার আড়াই হাজার টাকা খরচ করে সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট পটিয়া-চট্টগ্রাম আদালত থেকে স্বাক্ষর ও সিলযুক্ত মামলা থেকে খালাস পাওয়ার সার্টিফাইড কপি জমা দিয়ে উপ-পরিচালক আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস বরাবর পুনঃতদন্তের আবেদন করি। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, সব ঠিক থাকার পরও হয়রানি মেনে নেওয়া যায় না। তবুও বারবার এসে পাসপোটর্টি করতে হচ্ছে।
পুলিশ ভেরিফিকেশনে হয়রানি ও উৎকোচ নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার আমিনুল ইসলাম দৈনিক দেশ বর্তমানকে বলেন, পুলিশ ভেরিফিকেশনে কোনো টাকা নেওয়ার নিয়ম নেই। যদি কেউ অনিয়মের সাথে জড়িয়ে পড়ে অভিযোগ পেলে আমরা তদন্ত করে ব্যবস্থা নেব।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে উপপরিচালক তারিক সোলায়মান দৈনিক দেশ বর্তমানকে বলেন, নামের সংশোধনসহ তথ্য সংশোধনে আমাদের একটু সময় লাগে, সব ঠিকঠাক থাকলে নিয়মমাফিক পাসপোর্ট পেয়ে যাচ্ছে। দালাল চক্র নিয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, আমাদের অফিসে দুপুর ২টা পর্যন্ত ফরম জমা নিই। এখানে দালাল চক্রের কারসাজি হতে পারে না। কারণ টাকা জমা নেওয়া হয় ব্যাংকের মাধ্যমে, এতে কারসাজি হওয়ার কথা নয়। কেউ যদি ফরম জমা দিতে না পারে তাহলে আমি এবং অন্যান্য কর্মকর্তাদের জানালে আমরা সহজেই জমা দিতে সহযোগিতা করি। এভাবে আমরা সবসময় গ্রাহকদের সহযোগিতা করে আসছি। তবুও কেউ যদি অভিযোগ নিয়ে আসে, তদন্ত করে আমরা ব্যবস্থা নেব। ২০২০ সালের জুন মাস থেকে এমআরপি চালু হয়েছে, আমাদের এখানে প্রায় ৩ বছরে ৩ লাখের বেশি পাসপোর্ট নিবন্ধন হয়েছে বলেও জানান উপপরিচালক।
প্রসঙ্গত, দালালচক্রের সদস্যরা পাসপোর্টের জন্য সরকারি খরচের বিভিন্ন হিসাব দিলেও পাসপোর্টভেদে এই হার নির্ধারিত।
পাঁচ বছরের জন্য ৪৮ পৃষ্ঠার নিয়মিত পাসপোর্ট বাবদ ব্যাংকে জমা দিতে হয় ৪ হাজার ২২৫ টাকা। ১০ বছরের জন্য দিতে হয় ৫ হাজার ৭৫০ টাকা, যা ২১ দিনে পাওয়া সম্ভব বলে জানানো হয়েছে পাসপোর্ট অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে।
জরুরি ক্যাটাগরিতে পাঁচ বছরের জন্য ৪৮ পৃষ্ঠার পাসপোর্ট বাবদ জমা দিতে হয় ৬ হাজার ৩২৫ টাকা। ১০ বছরের জন্য পরিশোধ করতে হয় ৮ হাজার ৫০ টাকা, যা ১০ দিনের মধ্যে পাওয়ার কথা।
অন্যদিকে অতিজরুরি ক্যাটাগরিতে পাঁচ বছরের জন্য ৪৮ পৃষ্ঠার পাসপোর্টের জন্য পরিশোধ করতে হয় ৮ হাজার ৬২৫ টাকা। ১০ বছরের জন্য ১০ হাজার ৩৫০ টাকা, যা মাত্র দুদিনে এই সেবা পাওয়া যায়।
পাঁচ বছরের জন্য ৬৪ পৃষ্ঠার নিয়মিত পাসপোর্ট বাবদ জমা দিতে হয় ৬ হাজার ৩২৫ টাকা। ১০ বছরের জন্য ৮ হাজার ৫০ টাকা, যা ২১ দিনের মধ্যে আবেদনকারীর হাতে পাওয়ার কথা। জরুরি ক্যাটাগরিতে পাঁচ বছরের জন্য ৬৪ পৃষ্ঠার পাসপোর্ট বাবদ জমা দিতে হয় ৮ হাজার ৬২৫ টাকা। আর ১০ বছরের জন্য পরিশোধ করতে হয় ১০ হাজার ৩৫০ টাকা, যা ১০ দিনের মধ্যে পাওয়ার কথা।
অতিজরুরি ক্যাটাগরিতে পাঁচ বছরের জন্য ৬৪ পৃষ্ঠার পাসপোর্টের জন্য জমা দিতে হবে ১২ হাজার ৭৫ টাকা। ১০ বছরের জন্য সেবাপ্রত্যাশীকে পরিশোধ করতে হয় ১৩ হাজার ৮০০ টাকা। এ ছাড়া ই-পাসপোর্ট আবেদন ফির সঙ্গে ১৫ শতাংশ ভ্যাট সংযোজিত হবে।
দেশ বর্তমান/এআই