চন্দনাইশে ছাত্রলীগ সভাপতির ভর্তি বাণিজ্য

টাকা দিয়েও শিক্ষা জীবন নষ্ট এক শিক্ষার্থীর, অভিযোগ করায় হত্যা ও অপহরণের হুমকি

মোহাম্মদ তাসিন। চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার ৬নং বৈলতলী ইউনিয়নের ৮নং জাফরাবাদ ওয়ার্ডের মৃত আব্দুস ছোবহানের ছেলে। দুই বছর আগে এসএসসি পাশ করেন। পরিচিত রিদুয়ান বিন সাঈদ প্রকাশ ইমন ওমরগণি এমইএস কলেজে ভর্তি করে দিয়ে কলেজ প্রদত্ত সব সুযোগ-সুবিধা নিয়ে দেওয়ার আশ্বাস দেন এবং অন্য কলেজে ভর্তি না হতে অনুরোধ করেন। কিন্তু আশ্বাস দিয়ে টাকা নিলেও ভর্তি না করিয়ে উল্টা অপহরণ ও হত্যার হুমকি দিচ্ছে বলে অভিযোগ তুলেছেন তাসিন ও তাঁর পরিবার। দৈনিক দেশ বর্তমানের হাতে আসা ম্যাসেঞ্জারে কথোপকথনের স্ক্রিনশটে টাকা নেওয়ার কথা স্বীকার করেন ছাত্রলীগ নেতা ইমন। এদিকে, প্রতারণা বিষয়ে তদন্ত করে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেবেন বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মো. আবু তাহের।

গত বৃহস্পতিবার বিকেলে ভুক্তভোগী মো. তাসিন দৈনিক দেশ বর্তমানকে বলেন, ২০২১ সালে এসএসএসি পাশ করার পর এলাকার পরিচিত রিদুয়ান বিন সাঈদ প্রকাশ ইমন ওমরগণি এমইএস কলেজে ছাত্র সংসদের মাধ্যমে ভর্তি করিয়ে দেওয়ার আশ্বাস দেন। ভর্তি করিয়ে দেওয়ার নামে ৮,৫০০ টাকা নেন তিনি। পরামর্শ দেন ছাত্র সংসদের রাজনীতির সাথে নিয়মিত সম্পৃক্ত থাকতে। কিন্তু গড়িমসি করে মাসের পর মাস গেলেও ভর্তির কোনো কাগজপত্র নিয়ে দিতে পারেননি। ওনার (ইমন) উপর বিশ্বাস রেখে একাদশে ভর্তি না হয়েও ক্লাস করেছি। এমনকি তাঁর সরবরাহ করা ভুয়া প্রবেশপত্র দিয়ে পরীক্ষাও দিয়েছি।

ভুয়া প্রবেশপত্র

 

তিনি আরও বলেন, ভর্তিসহ কলেজের ছাত্রত্বের কাগজপত্র জোগাড় করে দিতে চাপ দিলে নানা অজুহাত দেখিয়ে পরবর্তীতে ফরম ফিলাপের নামে মূল কাগজপত্রসহ আবারও ৫০০০ টাকা নেন। পরে বলে তুমি ভর্তি আছো এবং পরীক্ষা দিতে পারবে। এরপর ২০ দিন পর এইচএসসি দ্বিতীয় বর্ষের পরীক্ষার প্রবেশ পত্র আনতে গেলে কলেজ থেকে জানানো হয় আমি কলেজে ভর্তি নেই এবং ছাত্র নই। প্রতারিত এই কলেজ ছাত্র বলেন, যেন আকাশটা ভেঙে পড়ে মাথার ওপর। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি (ইমন) আমাকে হত্যাসহ পুরো পরিবারকে অপহরণের হুমকি দেন।

হুমকি ও প্রতারণার বিষয়ে চন্দনাইশ থানায় গত ২৮ আগস্ট অভিযোগ করেন বলেও জানান ভুক্তভোগী তাসিন। লোগো সংযুক্ত ওমরগণি এসইএস কলেজ চট্টগ্রাম ও একাদশ শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষা-২০২২ লেখা প্রবেশ পত্রে দেখা যায় মোহাম্মদ তাছিন, ক্রমিক নং ৫৮৮, ক্লাস রোল নম্বর- ১৫৭। নিচে ১৯ অক্টোবর ২০২২ আদায়কারীর সাক্ষর ও বিপরীত পার্শ্বে অধ্যক্ষের স্বাক্ষর আছে যেখানে স্বাক্ষর, নাম ও ক্রমিক নং আছে সেখানে হাতের লেখা। তবে দৈনিক দেশ বর্তমান অফিসে সংরক্ষিত প্রবেশপত্রটি দেখলেই স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে, অন্য ছাত্রের প্রবেশপত্র স্ক্যান ও প্রিন্ট করে নাম ও ক্রমিক নং বসিয়েছে।

দৈনিক দেশ বর্তমানের হাতে আসা অভিযুক্ত রিদুয়ান বিন সাঈদের ব্যবহৃত ফেসবুক ম্যাসেঞ্জার কথোপকথনের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তরে তিনবার টাকা নেওয়ার কথা স্বীকার করেন তিনি। একটিতে প্রতিউত্তরে বলেন- ‘ওকে তোর থেকে যা টাকা নিছি, এমইএসে (এমইএস কলেজে) না পারলেও অন্য জায়গা দেখি’। আরেকটিতে লিখেছেন- ‘তোর থেকে টাকা নিয়েছি যখন তুই আমার কাছের মানুষ এমইএসে (এমইএস কলেজে) না পারলে পলিটেকনিকে দেখি, ওয়েট কর’। অন্য আরেকটি বলেন- ‘ভাই আমাকে একটু টাইম দে টাকা পয়সা সব… পেইন দিস না’।

ভুক্তভোগী তাসিনের সাথে অভিযুক্ত ছাত্রলীগ নেতার কথোপকথন

 

চন্দনাইশ থানা পুলিশের কাছে করা অভিযোগ পত্রে উল্লেখ করা হয়, বিবাদী রিদুয়ান বিন সাঈদ প্রকাশ ইমন বর্তমানে ৬নং বৈলতলী ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সভাপতি পদে দায়িত্বে রয়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় একসাথে ছাত্রলীগের রাজনীতিতে জড়িত। তিনি ঠকবাজ ও প্রতারক প্রকৃতির লোক। গত দু’বছর আগে আমাকে ওমরগণি এমইএস কলেজে ভর্তি করিয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে ৮ হাজার ৫শ টাকা নেন। টাকা দেওয়ার পর ইমনের কথামত এইচএসসি ১ম বর্ষের নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিত হয়ে ক্লাস করি। ১ম বর্ষ পরীক্ষার একটি টোকেন দিয়ে শিখিয়ে দেন কোন টিচার টোকেন নিয়ে চ্যালেঞ্জ করলে দায়িত্বরদের আমি যেন বলি কলেজের বড় ভাইয়েরা দিয়েছেন। টোকেন দিয়ে পরীক্ষা শেষ করি। এইচএসসি ২য় বর্ষের ক্লাস না করতে নিষেধ করায় আমি অনুপস্থিত থাকি এবং বড় ভাইদের সাথে কলেজের রাজনীতিতে সক্রিয় থাকি। গত ৪/৫ মাস আগে ফরম ফিলাপ করে দেওয়ার কথা বলে আবারও ৫ হাজার টাকা এবং যাবতীয় মূল কাগজপত্র নেন। এর ২০ দিন পর এইচএসসি ২য় বর্ষের পরীক্ষার প্রবেশ পত্র ও রেজিস্ট্রেশন কার্ড আনতে গেলে কলেজ থেকে জানানো হয় আমি কলেজে ভর্তি হয়নি এবং কলেজের ছাত্র নই। এর আগে বিষয়টি টের পেলে অন্তত পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে ভর্তি করে দিতেও অনুরোধ করেছিলাম। পরে প্রতারণার বিষয়টি ইমনকে জানালে অপহরণ-হত্যাসহ নানা রকম হুমকি দেন।

চন্দনাইশ থানায় করা তাসিনের লিখিত অভিযোগ

 

বিষয়টি খতিয়ে দেখছেন বলে জানিয়ে চন্দনাইশ থানার অফিসার ইনচার্জ আনোয়ার হোসেন দৈনিক দেশ বর্তমানকে বলেন, হুমকির বিষয়টি তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেব।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আবু তাহের বলেন, আমরা খবর পেয়েছি অভিযুক্ত ছাত্রলীগের কর্মীকে শোকজ করা হয়েছে। শোকজের কী জবাব দিয়েছে তা আমাদের হাতে এখনও আসেনি। উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক এই বিষয়ে তদন্ত করছে। তদন্ত করে ওর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবেন বলেও জানান তিনি।

অভিযুক্ত ছাত্রলীগ নেতা রিদুয়ান বিন সাঈদকে দক্ষিণজেলা ছাত্রলীগের করা শোকজপত্র

 

এদিকে গেল ২৯ আগস্ট বাংলাদেশ ছাত্রলীগ চন্দনাইশ উপজেলা শাখার প্যাডে সভাপতি মো. আলমগীর ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক মারজাদুল ইসলাম চৌধুরী আরমান স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে দলীয় শৃঙ্খলা পরিপন্থী কার্যকলাপে জড়িত থাকার অভিযোগে রিদোয়ান বিন সাঈদের বিরুদ্ধে কেন সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না মর্মে ৩ দিনের মধ্যে লিখিত জবাব দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। প্রতিউত্তরে গত ২ সেপ্টেম্বর লিখিত জবাবে অভিযুক্ত রিদোয়ান বিন সাঈদ জানান, আমার বিরুদ্ধে এমইএস কলেজে ভর্তি করিয়ে দেওয়ার বিনিময়ে আর্থিক সুবিধা নিয়ে ব্যর্থ হয়েছি মর্মে আনা অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও উদ্দেশ্য প্রণোদিত। এটিকে বৈলতলী ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সভাপতি করাকালীন বিরোধীতাকারীদের উসকানি বলে উল্লেখ করেন। তিনি নিজেকে নির্দোষ সাজাতে গত ৮ মে মেসেঞ্জারে পলিটেকেনিকে ভর্তি করিয়ে দিতে করা অনুরোধের স্ক্রিনশট সংযুক্ত করেন। চার মাস আগে পাওয়া সভাপতি পদে থেকে কিভাবে দুই বছর আগে পদ ব্যবহার করলাম তা নোটিশ প্রদানকারীদের প্রশ্ন করতেও দেখা যায়। তবে লিখিত জবাবের শেষে লিখতে দেখা যায় অজান্তে অজ্ঞাত কারণে যদি কোনো ভুলত্রটি হয়ে থাকলে নিঃস্বার্থ (নিঃশর্ত) ক্ষমাপ্রার্থী বলে উল্লেখ করেন।

জানতে চাইলে চন্দনাইশ উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি মো. আলমগীর ইসলাম দৈনিক দেশ বর্তমানকে জানান, আমরা অভিযোগ পেয়ে তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছি, পরে তিনি জবাব দিয়েছেন। জবাবটা আমরা যাচাই বাছাই করছি। পরবর্তীতে জেলা ছাত্রলীগের নেতাদের পরামর্শ নিয়ে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেব।

তাসিন ছাত্রলীগের কর্মী কিনা জানতে চাইলে ভুক্তভোগীকে নিজেদের (ছাত্রলীগের) কর্মী বলেও স্বীকার করেন চন্দনাইশ উপজেলা ছাত্রলীগের এই সভাপতি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্ত ছাত্রলীগ নেতা ইমন অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, আমি এসব ঘটনায় সম্পৃক্ত নয়। এটা তো অনেক আগে থেকে চলে আসছে, তার পরিবারের সাথে আমার পারিবারিক ঝামেলা চলছে, তাই এসব ছড়াচ্ছে।

ম্যাসেঞ্জারে টাকা নেওয়ার কথা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ফেক মেসেঞ্জারে এসব করছে, এসবের কোনো সত্যতা নেই। এগুলো ওরা প্রমাণ করতে পারেনাই। শোকজের ব্যাপারে তিনি বলেন, আমি শোকজের জবাব দিয়েছি।

দেশ বর্তমান/এআই