মিজান-নেসারের ব্যতিক্রম ‘অতিথিশালা’

অতিথিশালা। নামটি শুনলেই যে কারও মনে হবে এটি একটি রেস্ট হাউজ বা আবাসিক হোটেল, নয়তো অতিথিদের থাকার স্থান। কিন্তু এই অতিথিশালা কোনো আবাসিক হোটেল কিংবা বাণিজ্যিক রেস্টা হাউজ নয়। এটি অসহায় রোগীদের জন্য একটি ব্যতিক্রম উদ্যোগ। যেখানে বিনামূল্যে রাত্রিযাপন এবং খাবার খেতে পারেন অসহায় রোগীরা।

চট্টগ্রাম শহরে চিকিৎসা নিতে এসে আর্থিক সংকটের কারণে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালের বারান্দায় রাত্রিযাপন কিংবা অনিরাপদ জায়গায় অবস্থান নিয়ে অনেকেই টাকা-পয়সাসহ মূল্যবান জিনিসপত্র খুইয়ে অসহায় হয়ে পড়েন। মূলত সেসব রোগী ও স্বজনদের জন্য বিনামূল্যে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে এই অতিথিশালায়।

চট্টগ্রাম নগরীর পাচঁলাইশ থানাধীন প্রবর্তক পল্লী আবাসিক এলাকায় দুই তলা ভবনটি ভাড়ায় নিয়ে চলছে এমন মানবিক সেবা। বিশেষ করে ফেনীর ছাগলনাইয়া, ফুলগাজী, পরশুরামের বিভিন্ন ওয়ার্ড ও ইউনিয়ন থেকে চট্টগ্রাম শহরে চিকিৎসা নিতে আসা অসহায় ও আর্থিক অসচ্ছল রোগী ও স্বজনরা এ মানবিক সেবার আওতায় আছে।

অজ্ঞাত রোগীদের স্বজন খ্যাত সাইফুল ইসলাম নেসারের সহযোগিতায় প্রতিষ্ঠানটির প্রধান পৃষ্ঠপোষকতা করছেন মানবিক ব্যবসায়ী মিজানুর রহমান মজুমদার। গত নয় মাস আগে চালু হওয়া এই অতিথিশালায় এখন পর্যন্ত ৩৫০ জন রোগী ও স্বজনকে এ সেবা দেওয়া হয়েছে। আর এতে ব্যয় হয়েছে প্রায় সাড়ে ১৫ লাখ টাকা।

সম্প্রতি গণমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া স্ত্রী-শ্বাশুড়ির নির্যাতনে সবকিছু হারানো নারায়নগঞ্জের বাসিন্দা চিকিৎসক কবির হোসেনকে আশ্রয় দিয়ে আলোচনায় আসে এই অতিথিশালা।

জানা গেছে, অসহায় চিকিৎসক কবির হোসেন মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ঘুরছিলেন। গণমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর কবির হোসেনকে চট্টগ্রামে নিয়ে এসে অতিথিশালায় আশ্রয় দেওয়া হয়।

অতিথিশালায় আশ্রয় পাওয়া ডাক্তার কবির দৈনিক দেশ বর্তমানকে বলেন, এতদিন আমি রাস্তায় ছিলাম। পরনে ভালো কাপড় ছিল না। বৃষ্টিতে ভিজেছি, রোদে পুড়েছি। ছেঁড়া কাপড় ও বস্তা বিছিয়ে ফুটপাতে ফুটপাতে ঘুমিয়েছি। অনেকেই ভয়ে রাস্তার পাগল মনে করে কাছে আসত না। আলহামদুলিল্লাহ, এখন অনেক শান্তিতে আছি। অতিথিশালায় থেকে কিছুটা মানসিক সুস্থ হওয়ার পর বন্ধুদের সাথে সিলেটে বেড়াচ্ছি। আবার অতিথিশালায় ফিরব।

এর আগে ছাগলনাইয়া উপজেলার দক্ষিণ ধর্মপুর এলাকার বাসিন্দা ব্রেন টিউমারে আক্রান্ত লাকি আকতারকে আর্থিক সহায়তা দিয়ে অপারেশন করান অতিথিশালার প্রধান উদ্যোক্তা মিজানুর রহমান মজুমদার।

একইভাবে চট্টগ্রামে চিকিৎসা নিতে আসা ছাগলনাইয়ার চাঁদগাজী স্কুলের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী তানজিন আক্তাররের মা, ভাই-বোনকে অতিথিশালায় আশ্রয় দেওয়াসহ যাতায়াতের ভাড়াও প্রদান করা হয়েছে। আর্থিক সংকটের কারণে ভালো চিকিৎসকের কাছে যেতে না পারা ছাগলনাইয়ার কাশিপুর গ্রামের বাসিন্দা তাসনিমা ও তার পরিবারকে অতিথিশালায় রেখে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়।
ছাগলনাইয়ার চাঁদগাজীর বাসিন্দা মোশারফ হোসেন ছিলেন শ্রবণপ্রতিবন্ধী। তার বড় মেয়ে শারীরিক প্রতিবন্ধী। স্ট্রোক করে অসুস্থ হয়ে পড়ে থাকা মোশারফকে হার্টে রিং প্রতিস্থাপনসহ চিকিৎসা সেবায় আর্থিক সহযোগিতা করেন অতিথিশালার এই উদ্যোক্তা। একইভাবে ফেনী এলাকার পরপর দুবার স্ট্রোক করা হত দরিদ্র মহিব উদ্দিনের স্ত্রীকে নগদ অর্থ দিয়ে জটিল অস্ত্রপাচারসহ চিকিৎসা সহায়তা করা হয়।

ছাগলনাইয়ার নিজপানুয়া গ্রামের হতদরিদ্র পরিবারের ২ বছর বয়সী শিশু আয়ান জন্মের সময় মলত্যাগের কোন পথ ছিলো না। মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করে গত ২৭ জুন মা ও শিশু হাসপাতালে জটিল ২টি অপারেশন করে মুত্রপথ করার জন্যও আর্থিক সব খরচ বহন করেন অতিথিশালা।

শুধু চিকিৎসক কবির, লাকি আকতার, তানজিন আক্তার, তাসনিমা, মোশারফ হোসেন কিংবা আয়ান নয়, ফেনী থেকে আসা অনেক দরিদ্র, অসহায় রোগীর অপারেশনসহ চিকিৎসা সহয়তা দিয়েছে অতিথিশালা প্রতিষ্ঠাতা ব্যবসায়ী মিজানুর রহমান মজুমদার।

মিজানুর রহমান মজুমদার দৈনিক দেশ বর্তমানকে বলেন, সড়ক দুর্ঘটনায় আহত অথবা জটিল রোগে আক্রান্ত রোগীরা দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল অথবা বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি থাকতে হয়। এতে করে রোগীর পরিবার আর্থিক সংকটে পড়েন। অনেক রোগীর স্বজনকে দেখা যায় আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে হাসপাতালের বারান্দায় রাত্রিযাপন করতে। এতে করে অনেক রোগীর টাকা পয়সা, মানিব্যাগ, মোবাইলসহ মূল্যবান জিনিসপত্র চুরি হয়ে যায়। তাই এসকল অসহায়, আর্থিক অসচ্ছল ফেনীর ছাগলনাইয়া, ফুলগাজী, পরশুরাম মানুষের কথা চিন্তা করে ব্যতিক্রমধর্মী এই সেবাটি চালু করি। ফেনী তথা ছাগলনাইয়া বাসীর জন্য কিছু করতে পারাটা আমার জন্য আনন্দের। যারা সুবিধা বঞ্চিত মানুষ তাদের সেবা করার মধ্যে আনন্দ খুঁজে পাই। হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও রোগীর স্বজনরা অতিথিশালায় প্রয়োজনমত থাকতে পারবেন।

অসচ্ছল রোগীদের আর্থিক সহায়তাসহ সবধরণের সহযোগিতা করতে অতিথিশালা প্রস্তুত বলেও জানান এই ব্যবসায়ী।

অতিথিশালা’র মূল ব্যবস্থাপক সাইফুল ইসলাম নেসার দৈনিক দেশ বর্তমানকে বলেন, ২০০৭ সালে আমার বাবা চিকিৎসার অভাবে মারা যাওয়ার পর থেকে সুবিধাবঞ্চিত, পরিচয়হীন মানুষের পাশে থাকার চেষ্টা করি। তারই অংশ হিসাবে অসচ্ছল রোগীদের আর্থিক সহায়তাসহ সবধরণের সহযোগিতা করতে এগিয়ে আসে অতিথিশালা তথা মিজানুর রহমান মজুমদার। এতে আমি ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করছি। ফেনীবাসির সহযোগিতায় আর্থিক অসচ্ছল রোগীদের জন্য এই প্রতিষ্ঠানটি ভরসাস্থল হয়ে উঠেছে বলেও দাবি করেন নেসার।

প্রতিষ্ঠানটির পাবলিক রিলেশন অফিসার আলাউদ্দিন বলেন, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে চিকিৎসা নিতে আসা প্রায় রোগী মেডিসিন দোকানের দালাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টারের দালাল এবং প্রাইভেট হাসপাতালের দালালের ক্ষপ্পরে পড়ে। এতে অনেক রোগী এবং স্বজনরা সর্বস্ব হারিয়ে ফেলেন। তাই তাদের সঠিক গাইড লাইন দেওয়ার জন্য একাধিক টিম প্রস্তুত রেখেছেন মিজানুর রহমান মজুমদার। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আসলে কিভাবে হয়রানির শিকার থেকে বাঁচা যায় এবং সেবা নেওয়া যায় তা মনিটরিং করার জন্য গাইড লাইন দেওয়া হয় অতিথিশালা থেকে। চট্টগ্রামে চিকিৎসা নিতে আসা ফেনীর ছাগলনাইয়া, ফুলগাজী, পরশুরামবাসীর জন্য এটি অত্যন্ত খুশির খবর বলেও জানা তিনি।

বিষয়টি নিয়ে কথা হয় বিশিষ্ট সমাজবিজ্ঞানী ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট সদস্য ড. মঞ্জুরুল আমিন চৌধুরীর সাথে। তিনি দৈনিক দেশ বর্তমানকে বলেন, এই উদ্যোগ অত্যন্ত মানবিক। এমন উদ্যোগ দেশের প্রতিটি জেলা ও উপজেলার ব্যবসায়ী কিংবা বিত্তবানরা গ্রহণ করলে অসচ্ছল রোগী-স্বজনরদের জন্য দারুণ সহায়ক ও মানবিক হবে বলে জানান তিনি।

দেশ বর্তমান/এআই