যেভাবে ভাঙে বিদেশগামীর স্বপ্ন

রাকিব উদ্দিন তোহেল একজন দোকান শ্রমিক। সাতকানিয়া উপজেলার এঁওচিয়া ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ডের আলীনগর এলাকার বাসিন্দা আবদুস সাত্তারের ছেলে। বর্তমানে টেরিবাজারে একটি কাপড়ের দোকানে সেলসম্যান হিসাবে কাজ করছেন। নিম্নবিত্ত পরিবারের ছেলে হওয়ায় ভাগ্যপরিবর্তনে বিদেশ যাওয়ার স্বপ্ন ছিল দীর্ঘদিনের। ভাগ্য বিধাতার বদলৌতে বন্ধুর সহযোগিতায় সৌদি আরবে শ্রমিক ভিসায় যাওয়ার ব্যবস্থা হয়। ৮৫০০ টাকায় মধ্যপ্রাচ্য গামীদের নির্দিষ্ট সেন্টার নগরীর আগ্রাবাদের আইআইইউসি টাওয়ারে মেডিকেয়ার মেডিকেল চেক-আপ সেন্টারে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করান তিনি। পরীক্ষার ফলাফলে প্রথমে ক্রিটিনাইনে সমস্যা (কিডনি) আছে বলে জানান। পরে আবারও ৮০০ টাকা নিয়ে দ্বিতীয়বার ক্রিটিনাইন করান একই সেন্টারে।

এবার অফিস থেকে বলা হল এন্টি এইচসিভি পজেটিভ এবং করে দেন আনফিট। চোখের সামনে স্বপ্নের মৃত্যু হতে দেখে ভেঙে পড়েন তোহেল। নিজের স্বাস্থ্য ঠিক আছে কিনা দেখতে একই পরীক্ষা (ক্রিটিনাইন ও এন্টি এইচএসসিভি) নগরীর শেভরন ক্লিনিক্যাল ল্যাবরেটরি (প্রা) লি. ও ইসলামী ব্যাংক হসপিটাল আগ্রাবাদ চট্টগ্রাম-এ করালে ফলাফল আসে অন্যটি অর্থাৎ কিডনি ভাল আছে এবং তিনি ফিট। পরে বাইরে করা পরীক্ষা নিয়ে যোগাযোগ করলে তারা জানান শেভরণ ও ইসলামী ব্যাংকের হসপিটালের মেশিনে সমস্যা আছে। পরে তাদের ভুলের কথা প্রকারন্তরে স্বীকার করেন।

অতিরিক্ত টাকা আদায়ের জন্য ফাঁদে ফেলে ওরা আনফিট বাণিজ্য করছে বলে মন্তব্য করেন চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন।

এদিকে, তোহেল স্বাস্থ্য পরীক্ষায় ফলাফল নিয়ে ঘুরছেন পরিচিতজনদের দুয়ারে দুয়ারে, যেন বিদেশ যেতে সহযোগিতা পান।

ভুক্তভোগী রাকিব উদ্দিন তোহেল দৈনিক দেশ বর্তমানকে বলেন, বিদেশ যাওয়ার অনেক স্বপ্ন ছিল। দরিদ্র পরিবারের সন্তান হওয়ায় এতদিন কোনো কূল-কিনারা পাইনি। অধীর আগ্রহ দেখায় এক বন্ধু নিজ খরচে শ্রমিক ভিসায় সৌদি আরব নিতে রাজি হয়, সে হিসাবে ভিসা ম্যানেজ করে। এতে আমার পরিবারে খুশির বন্যা বয়ে যায়, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত মেডিকেয়ার মেডিকেল চেক-আপ সেন্টার ভুল রিপোর্ট দিয়ে আমাকে আনফিট করে দেন। এখন তারা বলছে আরও দু’মাস অপেক্ষা করতে। এতদিনের টাকা খরচ ও অপেক্ষার প্রহর দুটোই শেষ করে দিল এই সেন্টারটি। অথচ আমি শেভরনে পরীক্ষা করিয়ে দেখি এন্টিএইচসিভি নেগেটিভ। তারা কেন পজেটিভ দিয়ে এমন করল বুঝলাম না। এভাবে হয়তো কত জনের স্বপ্ন নষ্ট করছে আমার জানা নেই। এখন আমি কি করব বুঝতে পারছি না। ওরা আমার এবং আমার পরিবারের অনেক ক্ষতি করে দিল।

গত ১৯ আগস্ট স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য ব্লাড, ইউরিন ও স্টুল (রক্ত, প্রশাব ও মল) সেম্পল দেন তোহেল। গত ৪ সেপ্টেম্বর পাওয়া ফলাফলে দেখা যায়, রক্তের গ্রুপ ও পজেটিভ, ম্যালেরিয়া অনুপস্থিত, আরবিএস ও ক্রিটিনাইন নরমাল, এন্টিএইচআইভি নেগেটিভ, এন্টিএইচসিভি পজেটিভ, ইউরিন সুগার নেগেটিভ, স্টুলে জীবাণু অনুপস্থিত এবং সময়মতো ঠিকাদান সম্পন্ন। কিন্তু এন্টিএইচসিভি পজেটিভ থাকায় রিমার্কস নোটে লেখা হয় ‘রকিব উদ্দিন তোহেল হু ইজ আনফিট ফর দ্য এভব ম্যানশনড জব অ্যকর্ডিং টু দ্য জি সি সি ক্রাইটোরিয়া’। অর্থাৎ তিনি জিসিসি শর্তানুযায়ী ফিট নন। যেখানে ডা. মোহাম্মদ জোবায়রুল হক চৌধুরীর (রেজি নং- এ-১০৪৮৩৫) স্বাক্ষর রয়েছে।

এদিকে রিপোর্ট পাওয়ার পর গত ৪ আগস্ট একইদিনে কিডনিতে সমস্যা অর্থাৎ ক্রিটিনাইনে সমস্যা আছে কিনা দেখতে নগরীর শেভরন ক্লিনিক্যাল ল্যাবটরি (প্রা:) লিমিটেডের ইনভয়েস নং ৪২৭৬৫৯১ যার পেশেন্ট আইডি নং- কিউ সেভেন ওয়ান। ওখানে ক্রিটিনাইনের ফলাফল আসে ওয়ান পয়েন্ট জিরো অর্থাৎ নরমাল। স্বাক্ষর করেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের সহযোগী অধ্যাপক ডা. নাঈমা তাসনীম। একই পরীক্ষাটি ইসলামী ব্যাংক হসপিটাল আগ্রাবাদ চট্টগ্রামে করলে ফলাফল আসে ওয়ান পয়েন্ট জিরো অর্থাৎ নরমাল। যেখানে ইনভয়েস নং ছিল ৫২০২৬০। স্বাক্ষর করেন ইসলামী ব্যাংক হসপিটাল আগ্রাবাদের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. জাহাঙ্গীর খান।

একইভাবে শেভরন ক্লিনিক্যাল ল্যাবটরি (প্রা:) লিমিটেডে এন্টিএইচসিভি রিপোর্ট আসে নেগেটিভ। যার ইনভয়েস নং ৪২৭৭৯৮০ এবং পেশেন্ট আইডি কে ওয়ান থ্রি। রিপোর্টে স্বাক্ষর করেন প্যাথলজির ওপর এমফিল করা প্যাথলজিস্ট কনসালটেন্ট ডা. শামীমা ইসরাত জাহান।

জানতে চাইলে, মেডিকেয়ার মেডিকেল চেক-আপ সেন্টারের টেকনোলজিস্ট মো. শামছুদ্দিন দৈনিক দেশ বর্তমানকে বলেন, আমরা যেনতেন ভাবে পরীক্ষা করি না, কারণ আমরা এখানে যেটা করব সেটা আবার বাইরের দেশে ভুল হলে দেড় লাখ টাকা জরিমানা করবে। তাই আমরা সরাসরি নেগেটিভ দেইনি।

শেভরনের রিপোর্ট নেগেটিভ জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা যেভাবে রোগ নির্ণয় ডিটেক্ট করি শেভরণ ওভাবে করে না। কারণ শেভরণ পজেটিভ দেওয়ার পর অন্য ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নেগেটিভ দিলে তাদের মান নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। আর আমরা ভুল দিলে জরিমানার পাশাপাশি আমাদের অনুমোদন বাতিল করে দেবে, তাই আমরা রিস্ক নিই না।

শেভরনের রিপোর্ট ভুল কিনা জানতে চাইলে ইনিয়ে বিনিয়ে বলেন, আমরা যেভাবে করি তারা সেভাবে করে না। তাছাড়া এই রিপোর্ট যদি অনলাইনে আপলোড না হতো, আমরা আবার সেম্পল নিয়ে পুনর্বার করতাম কিন্তু আপলোড হয়ে যাওয়ায় ওনাকে এটা নিয়ে আরও দু’মাস অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নাই।

বিষয়টি বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) চট্টগ্রাম শাখার সাধারণ সম্পাদক ডা. মো. ফয়সাল ইকবাল চৌধুরীর নজরে আনলে তিনি দৈনিক দেশ বর্তমানকে বলেন, এসব সেন্টারদের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ ভুরি-ভুরি। তারা প্রথমে ভুল রিপোর্ট দিয়ে রোগীদের জিম্মি করে অতিরিক্ত টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ প্রায় শুনি। প্রবাসগামীদের জন্য এমন অনিয়ম অন্যায়। তিনি পরামর্শ দিয়ে বলেন, শেভরনের রিপোর্ট ভুল হওয়ার সম্ভবনা খুবই কম, তবুও অন্য আরেকটি ল্যাবে করালে ভুলটা কোথায় জানা যাবে। প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে এসমস্ত প্রতিষ্ঠান অন্যায় কাজগুলো করে যাচ্ছে।

এদের বিরুদ্ধে মৌখিক অভিযোগ অনেক বলে জানান চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ ইলিয়াছ চৌধুরী। তিনি দেশ বর্তমানকে বলেন, বেশীর ভাগ অভিযোগ বিদেশগামীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষায় প্রথম দিকে আনফিট করে, পরে ৫/৭ হাজার টাকা নিয়ে ফিট করে দেন, যা চরম অন্যায়। যারা ওখানে মিড লেবেলে কাজ করে সাধারণত তারা এ কাজ করে থাকেন। এ বিষয়ে আমাদের কাছে লিখিত অভিযোগ দিলে আমরা তদন্ত করে ব্যবস্থা নেব। পরবর্তীতে জেলা প্রশাসন ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে পাঠিয়ে অনিয়মের জন্য তাদের বিরুদ্ধে অনুমোদন বাতিলসহ কঠিন শাস্তির সুপারিশ করব।

এআই