৫০ বছর অপেক্ষা, তবুও হয়নি স্থায়ী ক্যাম্পাস
বঙ্গবন্ধু ল’ টেম্পল, চট্টগ্রাম
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অনুমতি নিয়ে ‘বঙ্গবন্ধু’ নামেই ১৯৭২ সাল থেকে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করে চট্টগ্রামের আইনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বঙ্গবন্ধু ল’ টেম্পল। অথচ গত ৫০ বছরেও বঙ্গবন্ধুর নামে দেশের প্রথম এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পায়নি স্থায়ী কোনো ক্যাম্পাস। নগরীর মিউনিসিপ্যাল সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় ছুটি হওয়ার পর লিয়াঁজো করে দুটি কক্ষে চলছে শিক্ষা কার্যক্রম এবং আরেকটিতে চলছে একাডেমিক কার্যক্রম। সান্ধ্যকালীন সময়ে অধ্যায়ন করার সুযোগ থাকায় চাকুরিজীবীসহ শিক্ষার্থীদের পছন্দের প্রতিষ্ঠানে রূপ নেয় বঙ্গবন্ধু ল’ টেম্পল।
প্রতিষ্ঠার পর থেকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত থাকলেও ১৯৯২ সাল থেকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হওয়ায় বাড়ছে ছাত্র-ছাত্রী ভর্তির প্রতিযোগিতা। প্রতিবছর আইন শিখতে ৬০০ জন শিক্ষার্থী এখানে ভর্তি হয়। লাইব্রেরিসহ পযার্প্ত ক্লাসরুম ও শিক্ষার নানা সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হওয়ায় সাবেক এবং বর্তমান শিক্ষার্থীরা স্থায়ী ক্যাম্পাসের দাবি তুলেছে। বর্তমান ডিজিটাল যুগে অ্যানালগ পদ্ধতিতে চলা এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষও শিক্ষার্থীদের স্থায়ী ক্যাম্পাসের দাবির সাথে একমত।
বুধবার (২৩ আগস্ট) বিকালে সরেজমিনে বঙ্গবন্ধু ল’ টেম্পলে গিয়ে দেখা যায়, মিউনিসিপ্যাল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়য়ের প্রাইমারি অডিটরিয়ামে চলে এলএলবি ১ম বর্ষের শিক্ষার্থীদের ক্লাস, আর চতুর্থ শ্রেণির (২০৪-পদ্মা) শ্রেণি কক্ষে চলে ২য় বর্ষের ক্লাস। অফিস কক্ষে (কক্ষ নং-১০৪) আছে ছোট একটি লাইব্রেরি, যেখানে বসেন অধ্যক্ষ, লাইব্রেরিয়ান, প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও অফিস সহকারিরা। ওই কক্ষ থেকে চলে একাডেমিক কার্যক্রমও।
অফিস কক্ষের পাশে ছাত্রসংসদ থাকলেও ছাত্র-ছাত্রীদের সুবিধার্থে নেই কোন উদ্যোগ। গত ২০০২ সালে নির্বাচিতরা এখনো দায়িত্বে রয়েছেন। ছাত্রসংসদের ভিপি ও জর্জকোটের অ্যাডভোকেট উজ্জল সরকার দৈনিক দেশ বর্তমানকে বলেন, স্থায়ী ক্যাম্পাসের দাবি নিয়ে স্টুডেন্ট প্যানেলের উদ্যোগকে স্বাগত জানায়। আমরাও এর বাস্তবায়ন চাই। বঙ্গবন্ধু ল’ টেম্পল ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মো. সোলায়মান জানান, শিক্ষার্থীদের জন্য স্থায়ী ক্যাম্পাস খুবই দরকার।
সাবেক বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, একসময় স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণের দাবিতে সাবেক শিক্ষার্থীরা বেশ সোচ্চার ছিলেন। এমনকি স্থায়ী ক্যাম্পাসের জন্য জায়গার স্ক্যাচ ম্যাপসহ সচিবালয়ে যাওয়া আসা করতো। কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় তা ভেস্তে যায়। এবার এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের নিয়ে গঠিত ‘স্টুডেন্ট প্যানেল’ স্থায়ী ক্যাম্পাসের দাবিতে সোচ্চার।
স্টুডেন্ট প্যানেলে দাবির সাথে একত্মা প্রকাশ করেছেন বঙ্গবন্ধু ল’ টেম্পলের সাবেক শিক্ষার্থী ও চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট এ এইচ এম জিয়া উদ্দিন।
তিনি দেশ বর্তমানকে বলেন, বঙ্গবন্ধু ল’ টেম্পল চট্টগ্রাম’র স্থায়ী ক্যাম্পাস এখন সময়ের দাবি। আমরা শিক্ষার্থী থাকাকালীন এটা নিয়ে তৎকালীন এমপি-মন্ত্রীদের মাধ্যেমে অনেক তদবির করছিলাম। কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় তা ভেস্তে যায়। এখনকার শিক্ষার্থীরা স্থায়ী ক্যাম্পাস নিয়ে যেভাবে স্বোচ্চার তা নিয়ে আমি আশাবাদী। কারণ, বঙ্গবন্ধুর নামে এই প্রতিষ্ঠানে এখনও নেই পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ, শিক্ষার্থীদের বসার জায়গা, পাঠাগারসহ কোনো সুযোগ সুবিধা। আছে শিক্ষক সংকটও। সব মিলিয়ে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে স্থায়ী ক্যাম্পাসের বিকল্প নেই।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে শিক্ষার্থীদের সংগঠন স্টুডেন্ট প্যানেল স্থায়ী ক্যাম্পাসের যে দাবি তুলেছেন তার সাথে আমি এবং সাবেক অন্যান্য শিক্ষার্থীরাও একমত। পাশাপাশি স্থায়ী ক্যাম্পাসের দাবি সরকারের কাছে পৌঁছাতে যা করা লাগে তাদের সাথে ঐক্যবদ্ধ হয়ে আমিও সাথে থাকবো।
চট্টগ্রামের বিশিষ্ট এই আইনজীবী আরও বলেন, এই প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠালগ্নে জড়িত ছিলেন সাবেক মেয়র আলহাজ এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী। বর্তমানে তার সুযোগ্য সন্তান ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল শিক্ষা উপমন্ত্রী। সুযোগ থাকলে তিনিই একটি স্থায়ী ক্যাম্পাসের ব্যবস্থা করে দিতে পারেন। আমরা শীঘ্রই মাননীয় শিক্ষা উপমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎ করে বিষয়টি জানাবো।
অ্যাডভোকেট এ এইচ এম জিয়া উদ্দিনের সাথে একমত পোষেণ করেন সাবেক শিক্ষার্থী ও চট্টগ্রাম মানব পাচার অপরাধ ট্রাইব্যুনালের পাবলিক প্রসিকিউটর মো. আনোয়ার হোসেন আজাদ।
তিনি দেশ বর্তমানকে বলেন, বঙ্গবন্ধু ল’ টেম্পল বর্তমানে অযত্ন অবহেলায় সান্ধ্যকালিন অফিস হিসাবে পড়ে আছে। স্টুডেন্ট প্যানেলের স্থায়ী ক্যাম্পাসের দাবি যদি বর্তমান রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনার কাছে যদি বঙ্গবন্ধুর নামে তথা তার পিতার নামে এই প্রতিষ্ঠান যথাযথভাবে উপস্থাপন করা যায় তাহলে সম্ভব বলে মনে করেন এই সিনিয়র আইনজীবী। তিনি বলেন, স্থায়ী ক্যাম্পাস হলে ক্যাম্পাসের নামের সাথে চট্টল প্রেমি ও চট্টল পাগল মহিউদ্দিন চৌধুরীর নামেও কিছু হওয়া দরকার। তাহলে বঙ্গবন্ধু ও মহিউদ্দিন চৌধুরীকে সম্মান করা হবে।
স্থায়ী ক্যাম্পাসের দাবির সাথে একমত পোষণ সাবেক শিক্ষার্থী ও জর্জ কোর্টের আইনজীবী মো. তসলিম উদ্দিন। তিনি বলেন শুধু স্থায়ী ক্যাম্পাস নয় এবি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীর নামে একটা অডিটরিয়ামও চাই।
স্থায়ী ক্যাম্পাসের দাবি নিয়ে কথা হয় বঙ্গবন্ধু ল’ টেম্পল স্টুডেন্ট প্যানেলের জে এইচ ইমন, এ এম দস্তগীর, উত্তম দে, সাদেকা খানম, আব্বাস উদ্দিন মানিক, মো. মহিউদ্দিন (রিমন), রামপদ দাস, সঞ্জয় দাস ও ফারজানা আফরোজের সাথে।
তারা দৈনিক দেশ বর্তমানকে বলেন, আমরা সকলেই গ্রাজুয়েট এবং বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করি। পার্ট টাইম আইন শিখতে বঙ্গবন্ধু ল’ টেম্পলে ভর্তি হই, কিন্তু ক্লাস করতে আসলে মনটা খারাপ হয়ে যায়। কারণ ক্লাসরুম ছাড়া বসার কোনো জায়গা নেই। অধ্যক্ষ ও অফিস সহকারীরা এক কক্ষে বসে যা খুবই বেমানান। তাছাড়া ডিজিটাল যুগে ভর্তিসহ সব কার্যক্রম অ্যানালগ পদ্ধতিতে হয়। নেই লাইব্রেরিসহ শিক্ষার কোন সুযোগ-সুবিধা। যার কারণে শিক্ষার্থীরা ক্লাস করতে অনাগ্রহী হয়ে পড়ে। বর্তমানে বঙ্গবন্ধু ল’ টেম্পল চট্টগ্রাম’র স্থায়ী ক্যাম্পাস এখন সময়ের দাবি। আমরা চাই, বঙ্গবন্ধুর নামে বাংলাদেশে প্রথম প্রতিষ্ঠিত এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি অচিরেই স্থায়ী ক্যাম্পাসে পর্দাপণ করুক। যেখানে ফিরে পাবে শিক্ষার পরিবেশসহ নানা সুযোগ-সুবিধা। আমরা শিক্ষার্থীরা দৈনিক দেশ বর্তমানের মাধ্যমে শিক্ষা উপমন্ত্রী ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল এমপির দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। যাতে শিগগির বঙ্গবন্ধু ল’ টেম্পলের স্থায়ী ক্যাম্পাসের ব্যবস্থা করেন।
শিক্ষার্থীদের দাবিকে সর্মথন জানিয়ে বঙ্গবন্ধু ল’ টেম্পলের অধ্যক্ষ এ এম আনোয়ারুল কবির দৈনিক দেশ বর্তমানকে বলেন, ফান্ডের অভাবে আমাদের স্থায়ী ক্যাম্পাস করতে পারছি না। এটি করতে প্রায় ১০ কোটি টাকা লাগবে। বর্তমানে উন্নয়নের দিক দিয়ে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। শিক্ষার্থীরা স্থায়ী ক্যাম্পাসের বিষয়টি যথাযথভাবে সরকারের নজরের আনতে পারলে হয়তো বাস্তবায়নে হয়ে যাবে। আর স্থায়ী ক্যাম্পাস হলে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকেও সম্মান জানানো হবে কেন না, ওনি জীবিত থাকতে এবং ওনার অনুমতিতে এই প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। বর্তমানে সীমাবদ্ধ পরিবেশে কোনরকম শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি। যদি স্থায়ী ক্যাম্পাস হয় তাহলে শুধু শিক্ষার্থী নয়, শিক্ষকরাও ক্লাস করতে স্বাচ্ছন্দবোধ করবেন। তখন উন্নত হবে শিক্ষার পরিবেশ, এগিয়ে যাবে শিক্ষা ব্যবস্থা।
প্রসঙ্গত, চলতি বছরের ৫ মে বিকালে নগরীর ফয়ে’স লেক সি-ওয়ার্ল্ডে বঙ্গবন্ধু ল’ টেম্পল চট্টগ্রামের ২০২০-২১ সেশনের শিক্ষার্থীদের নিয়ে গড়া স্টুডেন্ট প্যানেলের ঈদ পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে স্থায়ী ক্যাম্পাসের দাবি তোলেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকা প্রধান অতিথি, বঙ্গবন্ধু ল’ টেম্পলের সাবেক শিক্ষার্থী ও চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট এ এইচ এম জিয়াউদ্দিনও সেদিন দাবির সাথে একমত পোষণ করেন এবং দাবি আদায়ে সাথে থাকার ঘোষণা দেন।
দেশ বর্তমান/এআই