সাধারণত বৃষ্টিপাত হলে বায়ু পরিস্থিতি পরিচ্ছন্ন হয়ে ওঠে। তবে এবার দেখা গেছে ভিন্ন অবস্থা। টানা বৃষ্টিতে প্রাকৃতিক পরিবেশ অস্বাভাবিক ছিল। এবার বৃষ্টিতেও কমেনি দেশের বায়ুদূষণ। শুনতে অসামঞ্জস্য মনে হলেও এর কারণ হিসেবে ‘ফিটনেসবিহীন গাড়িকে’ দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। স্বাভাবিকভাবে বৃষ্টিতে বায়ুদূষণ কমে আসার কথা থাকলেও এবার বৃষ্টিতেও দেশের বায়ুর স্বাস্থ্য ভালো ছিল না।
গত দুই সপ্তাহে দেশে টানা দু থেকে তিন দিন পর্যন্ত বৃষ্টি হয়েছে অঞ্চল ভেদে। পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে ওই সময়ের বায়ুর মান পরীক্ষা করে বলা হচ্ছে, দেশের সাত জায়গার বায়ু বৃষ্টিতেও অস্বাস্থ্যকর ছিল। বায়ুদূষণের উৎসের পরিবর্তন ঘটার কারণেই এমনটা হয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স (একিউআই) অনুযায়ী, বায়ুর মানমাত্রা শূন্য থেকে ৫০-এর মধ্যে থাকলে সেটিকে ভালো হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ৫১ থেকে ১০০-এর মধ্যে হলে সেটি মধ্যম মানের বায়ু, ১০১ থেকে ১৫০ হলে বায়ুর মানে সাবধানতা বা সতর্কীকরণ করা হয়। বায়ুর মান ১৫১ থেকে ২০০-এর মধ্যে হলে অস্বাস্থ্যকর হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ২০১ থেকে ৩০০-এর মধ্যে হলে বায়ু খুব অস্বাস্থ্যকর এবং ৩০১-এর বেশি হলে অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, তারা প্রতিদিন দেশের ১৩টি স্থানে বায়ুর মান পরীক্ষা করে। শিল্প-কারখানার আধিক্য থাকা এলাকাগুলোর বায়ুর মান পরীক্ষায় বেশি জোর দেওয়া হয়েছে। দেশের যে সাত জেলায় বায়ুর মানকে অস্বাস্থ্যকর বলে বিবেচনা করা হচ্ছে, এরমধ্যে সবার ওপরে রয়েছে ময়মনসিংহের নাম।
একিউআই অনুযায়ী, ময়মনসিংহের বায়ুর মান ১৭৫। এরপর রয়েছে সাভারের নাম, যেখানে একিউআই অনুযায়ী বায়ুর মান ১৬৭। এরপরই রয়েছে গাজীপুরের নাম। এ জেলায় একিউআই অনুযায়ী বায়ুর মান ১৬১। গাজীপুরের পরপরই ঢাকার একিউআই অনুযায়ী বায়ুর মান ১৫৮। খুব কাছাকাছি বায়ুর মান ১৫৬ নিয়ে কুমিল্লা, ১৫৪ নিয়ে নরসিংদী, ১৫১ নিয়ে রংপুর রয়েছে পরের অবস্থানে। এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জে ১৫০, রাজশাহীতে ১০৫, খুলনা ১১৭, চট্টগ্রামে ৮২, বরিশালে ৭৩ নিয়ে বায়ুমান ইনডেক্সে রয়েছে নগরীগুলো।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স (একিউআই) অনুযায়ী, গত বুধবার (১৬ আগস্ট) দিনভর বৃষ্টি থাকলেও কমেনি বায়ুদূষণ। সন্ধ্যায় রাজধানী ঢাকা ছিল দূষণের দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে, মাত্রা ছিল ১৫২, যা রাত ১০টায় উঠে আসে প্রথম অবস্থানে। এ সময় মাত্রা ছিল ১৬৬।
বায়ুদূষণের চরিত্র বদল প্রসঙ্গে জানতে চাইলে স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটির পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, আগে বায়ুদূষণের উৎসগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল ইটভাটা, রাস্তার নির্মাণ কাজ বড় উৎস। এর বাইরে যানবাহনের অংশটি ছিল। ইটভাটাগুলো বৃষ্টির সময় বন্ধ রাখা হয়। নির্মাণ কাজও বন্ধ থাকে সে সময়টাতে । কিন্তু বর্তমানে সবচেয়ে বড় দূষণের কারণ হয়ে দেখা দিয়েছে যানবাহনের দূষণ। এই দূষণের কারণে এখন বৃষ্টির দিনগুলোতেও অধিক পরিমানে দূষিত থাকে দেশের, বিশেষ করে ঢাকার বায়ু।
অধ্যাপক কামরুজ্জামানের মতে, বর্তমানে ঢাকায় প্রায় ১৫ লাখ ফিটনেসবিহীন গাড়ি চলাচল করছে। এরমধ্যে বেশিরভাগ গণপরিবহন। এসব গাড়ির দূষণই ঢাকার জন্য কাল হয়ে দেখা দিয়েছে। এ ছাড়া ফ্লাইওভারে ওঠার সময় এসব গাড়ির ইঞ্জিন দুর্বল বলে উঠতে গিয়েই দূষিত কালো ধোঁয়া ছাড়ছে। প্রতি মুহূর্তে এই ধোঁয়া ছাড়া হচ্ছে।
ইদানীং রাস্তায় কালো ধোঁয়াযুক্ত গাড়ি অহরহই চোখে পড়ে। এসব কারণে বৃষ্টি হলেও কমছে না বায়ুদূষণ। প্রতিকার করতে হলে ফিটনেসবিহীন গাড়ি বাদ দেওয়াও উদ্যোগ নেওয়া জরুরি বলে তিনি মনে করেন।
দেশ বর্তমান/এআই