বহুল প্রতীক্ষিত চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেলের কাজ প্রায় শেষ। বঙ্গবন্ধু টানেল চালু হলে চীনের সাংহাইয়ের আদলে ‘ওয়ান সিটি টু টাউন’ মডেলে কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মিত টানেলটি যুক্ত করবে দক্ষিণ চট্টগ্রাম আর বন্দরনগরীকে। দক্ষিণ এশিয়ায় নদীর নিচ দিয়ে এই ধরনের টানেল এটাই প্রথম।
আগামী ২৮ অক্টোবর স্বপ্নের এই টানেলটির উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সোমবার (১৪ আগস্ট) দুপরে উদ্বোধনের বিষয়টি গনমাধ্যমে নিশ্চিত করেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। টানেলটির নবযাত্রায় অর্থনীতিতে আশার আলো দেখছেন ব্যবসায়ী নেতারা। তাঁরা বলছেন উদ্বোধন হলে অর্থনীতিতে উম্মোচিত হবে সম্ভাবনার নতুন দ্বার।
বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে গতকাল সোমবার রাতে বিজিএমইএ’র প্রথম সহসভাপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম দৈনিক দেশ বর্তমানকে বলেন, বঙ্গবন্ধু টানেল দক্ষিণ চট্টগ্রামের জন্য বিরাট সুফল বয়ে আনবে। সাথে সাথে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে অনন্য ভূমিকা রাখবে, কারণ সরকার দেশে অর্থনীতির গতি বাড়ানোর জন্য ডীপ সী-পোর্ট করছে। এতে ডিপ সী-পোর্টে কানিক্টিভিটি বাড়িয়ে দেবে। সেই সাথে বিশ্বের সাথে কানিক্টিভিটিও বাড়বে। পাশাপাশি চট্টগ্রাম বন্দরের যে সক্ষমতা বাড়ানোর দাবি নিয়ে আমরা যে কাজ করছি সে সক্ষমতা আরও বৃদ্ধি পাবেও বলে মনে করছেন এই ব্যবসায়ী নেতা।
চিটাগাং চেম্বার অব কর্মাস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (সিসিসিআই) সভাপতি হাজ্জাজ বিন লতিফ দেশ বর্তমানকে বলেন, কোনো আন্দোলন-সংগ্রাম ছাড়াই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু টানেল চট্টগ্রামবাসীকে উপহার দিয়েছেন। এটি শুধু চট্টগ্রাম নয় সমগ্র দেশের ব্যবসায়ীরা এটির সুফল ভোগ করবে। তাছাড়া মাতার বাড়িতে নির্মিতব্য ডিপ সী-পোর্টের সাথে সরাসরি চট্টগ্রামের কানিক্টিভিটির জন্য এই টানেল বড় অবকাঠামো। এতদিন ধরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আমাদের পণ্যে পরিবহনের শীপগুলো সিঙ্গাপুর, মালেশিয়া এবং শ্রীলংকার কলম্বো পোর্ট হয়ে আসতো তারপরে ছোট জাহাজ হয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের গভীরে বর্হিনোঙ্গর অপেক্ষা করতো, ওখান থেকে অভ্যন্তরীণ নৌযান দিয়ে আমরা খালাস করতাম। এখন থেকে এই টানেলের মাধ্যেমে আমাদের তৈরী পণ্যগুলো বহির্বিশ্বে পৌছাঁতে পারবো। পাশাপাশি আমদানী করা পণ্যেও মাতারবাড়ি হয়ে এই টানেলের মাধ্যেমে চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছাতে পারবে। ফলে এটি অর্থনীতিতে ব্যবসার নতুন দ্বার উম্মোচন হবে বলেও মনে করছেন এই চেম্বার সভাপতি।
অগ্রগতি নিয়ে প্রকল্প পরিচালক (পিডি) মো. হারুনুর রশীদ চৌধুরী গণমাধ্যমকে বলেন, মূল টানেলের ৯৯.৫ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে এবং প্রকল্পের নির্মাণকাজের সার্বিক অগ্রগতি ৯৭.৫ শতাংশ বর্তমানে টানেলের সুরক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিতের কাজ চলছে।
এশিয়ান হাইওয়ের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজারের মধ্যে একটি নতুন সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে বানানো হয়েছে এ টানেল। নির্মাণ কাজ করছে চীনা কোম্পানি ‘চায়না কমিউনিকেশন কনস্ট্রাকশন লিমিটেড’।
তিন দশমিক ৩২ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের টানেলের টিউব দুটির দৈর্ঘ্য ২ দশমিক ৪৫ কিলোমিটার। একটির সঙ্গে অপর টিউবের দূরত্ব ১২ মিটারের মত। প্রতিটি টিউবে দুটি করে মোট চারটি লেইন রয়েছে। এটির ‘সাউথ টিউব’ দিয়ে আনোয়ারা থেকে চট্টগ্রাম শহরে এবং উজানের দিকের ‘নর্থ টিউব’ দিয়ে চট্টগ্রামের নেভাল একাডেমির দিক থেকে আনোয়ারার দিকে যানবাহন চলাচল করবে। এছাড়া টানেলের পূর্ব ও পশ্চিম প্রান্তে থাকছে ৫ দশমিক ৩৫ কিলোমিটার সংযোগ সড়ক। এছাড়া ৭২৭ মিটার দৈর্ঘ্যের একটি ওভারব্রিজও রয়েছে আনোয়ারা প্রান্তে।
টানেল নির্মাণের আগে ২০১৩ সালে পরিচালিত জরিপ অনুসারে, দিনে প্রায় ১৭ হাজার ২৬০টি গাড়ি চলতে পারবে। ২০২৫ সালের মধ্যে বঙ্গবন্ধু টানেল দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ২৮ হাজার ৩০৫টি যানবাহন যাতায়াত করতে পারবে। গত ১৩ জুলাই চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেলের টোল নির্ধারণ করে প্রজ্ঞাপন জারি করে সরকার। এতে উল্লেখ করা হয়, বঙ্গবন্ধু টানেল পারাপারে সর্বনিম্ন টোল ২০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে প্রাইভেটকার ও জিপের জন্য। সর্বোচ্চ টোল দিতে হবে ট্রাক ও ট্রেইলারকে। ট্রেইলারের ক্ষেত্রে নির্ধারিত টোলের সঙ্গে প্রতিটি এক্সেলের জন্য আরও ২০০ টাকা করে বাড়তি দিতে হবে।
এছাড়া পিকআপ ২০০ টাকা, মাইক্রোবাস ২৫০ টাকা, বাস (৩১ সিটের কম) ৩০০ টাকা, বাস (৩২ আসনের বেশি) ৪০০ টাকা, বাস (৩ এক্সেল) ৫০০ টাকা, ট্রাক (৫ টন পর্যন্ত) ৪০০ টাকা, ট্রাক (৫ দশমিক ০১ থেকে ৮ টন) ৫০০ টাকা, ট্রাক (৮ দশমিক ০১ থেকে ১১ টন) ৬০০ টাকা, ট্রাক ও ট্রেইলার (৩ এক্সেল) ৮০০ টাকা, ট্রাক ও ট্রেইলার (৪ এক্সেল) ১০০০ টাকা এবং চার এক্সেলের বেশি ট্রাক ও ট্রেইলারগুলোকে ১০০০ টাকার সঙ্গে প্রতি এক্সেলের জন্য আরও ২০০ টাকা করে টোল দিতে হবে।
দেশ বর্তমান/এআই