উচ্চ আদালতে ডেথ রেফারেন্স মামলার জট

কনডেম সেলে ২ হাজার আসামি, শুনানির অপেক্ষায় ৯ শতাধিক মামলা

উচ্চ আদালতে (হাইকোর্টে) ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন) মামলার জট বাড়ছে। পেপারবুক (মামলার বৃত্তান্ত) তৈরীতে বিলম্ব, বেঞ্চের অপ্রতুলতা ও বারবার শুনানি মূলতবিই এর অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ফলে বিচারিক আদালতের মৃত্যুদণ্ডাদেশ মাথায় নিয়ে দেশের কারাগারগুলোর কনডেম সেলে অনিশ্চয়তায়তার মধ্যে দিন কাটছে আসামিদের।

আইন মন্ত্রণালয় ও সুপ্রিম কোর্টের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, হাইকোর্টে প্রায় ৯ শতাধিক ডেথ রেফারেন্স মামলা শুনানির জন্য অপেক্ষায় রয়েছে। এসব মামলায় প্রায় দুই হাজার ১৬২ জন আসামি কনডেম সেলে মৃত্যুর প্রহর গুনছেন। এর মধ্যে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগ সভাপতি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ওপর গ্রেনেড হামলা মামলা ও গুলশানে হলি আর্টিজেন বেকারী হত্যা মামলা উল্লেখযোগ্য। এর সাথে আরও কিছু হত্যা মামলার ডেথ রেফারেন্স ও আপিল সহ চাঞ্চল্যকর মামলার রায়ের নথি যুক্ত হয়েছে।

এদিকে সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ি, ২০১০ সাল থেকে ২০২২ সালের ১৬ অক্টোবর পর্যন্ত হাইকোর্টে ডেথ রেফারেন্স আসে ১ হাজার ৫৪৫টি। আর নিষ্পত্তি হয়েছে ১ হাজার ১৫১টি। এর মধ্যে সর্বোচ্চ নিষ্পত্তি হয়েছে ২০১২ সালে। ওই বছর ১৪৫টি নিষ্পত্তি হয়েছে। আর ২০২২ সালের ১৬ অক্টোবর পর্যন্ত নিষ্পত্তি হয়েছে ১২৫টি মামলা। বর্তমানে বিচারের অপেক্ষায় রয়েছে প্রায় ৯০০টি ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন) মামলা। এর মধ্যে প্রায় ৬০০ মামলা আছে পেপারবুক প্রস্তুতের জন্য। আর এসব মামলায় দুই হাজারেরও বেশি মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত আসামি বর্তমানে দেশের বিভিন্ন কারাগারে কনডেম সেলে বন্দি আছেন।

ডেথ রেফারেন্স শাখার সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বর্তমানে ২০১৮ সালের ডেথ রেফারেন্স ও আপিল শুনানি শুরু হয়েছে। রমনা বটমূলে বর্ষবরণের অনুষ্ঠানে বোমা হামলার ঘটনায় করা হত্যা মামলা ও চট্টগ্রামের চাঞ্চল্যকর ১০ ট্রাক অস্ত্র চোরাচালান মামলার শুনানিও অব্যাহত আছে। ২০১৭ সালের ১৫৩ মামলার পর ২০১৮ সালের ১৪৭ টি ডেথ রেফারেন্স মামলার শুনানি হবে। এছাড়া, ২০১৯ সালের ১৭৪, ২০২০ সালের ১৪৭, ২০২১ সালের ১৫৬ ও ২০২২ সালের আগস্ট পর্যন্ত ১২৩টি ডেথ রেফারেন্স শুনানির অপেক্ষায় আছে। এর সাথে চলতি বছরের ৩১ জুলাই পর্যন্ত শুনানির জন্য আরও কিছু মামলা যুক্ত হয়েছে।

ডেথ রেফারেন্স মামলার পেপারবুক তৈরি করতে অনেক সময় লেগে যায়। পেপারবুক তৈরীর পর হাইকোর্টে শুনানি ও নিষ্পত্তির পর আপীল বিভাগে আসে। এ সমস্ত ধাপ পেড়িয়ে আসতে দীর্ঘ সময় পেরিয়ে যায়। যার কারনে বছরের পর বছর কারাগারের সেলে থাকা আসামিদের দুর্বিসহ যন্ত্রনায় থাকতে হয়। অন্যদিকে মামলার বাদীপক্ষকেও হতাশায় ভুগতে হয়।

বিচারিক আদালতে মৃত্যুদণ্ডাদেশ ঘোষণার পর তাৎক্ষণিক সাজা কার্যকর করার আইনগত কোনো বিধান নেই। মৃত্যুদণ্ডাদেশ কার্যকর করতে কয়েকটি আবশ্যকীয় আইনগত ধাপ অতিক্রম করতে হয়। এর মধ্যে ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৭৪ ধারা মতে মৃত্যুদন্ড কার্যকর করতে হাইকোর্ট বিভাগের অনুমোদন নিতে হয়, যা ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন) মামলা হিসেবে পরিচিত। নিয়ম অনুসারে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের ডেথ রেফারেন্স অনুমোদনের জন্য বিচারিক আদালতের রায় ও নথিপত্র হাইকোর্টে পাঠানো হয়। ফৌজদারি কার্যবিধির ৪১০ ধারা অনুযায়ী হাইকোর্ট বিভাগে আপিল দায়েরের বিধান রয়েছে আসামিদের। এতে হাইকোর্ট বিভাগ মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখলে সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তি সাংবিধানিক অধিকার বলে আপিল বিভাগে সরাসরি আপিল করতে পারেন।

এরপর সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১০৫ অনুযায়ী আপিলের রায়ের বিরুদ্ধে রিভিউ আবেদনের আইনগত সুযোগ রয়েছে। সর্বোপরি মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত আসামি সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৪৯ এর অধীন রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা (প্রাণ ভিক্ষা) চাইতে পারেন। রাষ্ট্রপতি উক্ত ক্ষমার আবেদন নামঞ্জুর করলে তখন মৃত্যুদন্ড কার্যকর করার আইনগত বৈধতা লাভ করে। কিন্তু বাংলাদেশে বিচারিক আদালতে মৃত্যুদণ্ড ঘোষণার পরই সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে নির্জন কনডেম সেলে মৃত্যুদন্ডাদেশপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে বন্দি রাখা হয়। বছরের পর বছর কনডেম সেলে রাখাটাকেই অনৈতিক বলে উল্লেখ করেছেন মানবাধিকার কর্মীরা।

এ প্রসঙ্গে মানবাধিকারকর্মী ও সুপ্রিম কোর্টের প্রবীণ আইনজীবী জেড. আই. খান পান্না দেশ বর্তমানকে বলেন, ডেথ রেফারেন্স ও আসামিদের আপিল শুনানি দ্রুত হওয়া প্রয়োজন। কারণ আসামিদের থাকতে হয় কনডেম সেলে। সেখানে বছরের পর বছর মানবেতর জীবনযাপন করতে হয় তাদের। বিচারিক আদালতে মৃত্যুদণ্ডের রায়ের পর ডেথ রেফারেন্স ও আপিল দ্রুত নিষ্পত্তি না হওয়ায় আসামির অনিশ্চয়তার মধ্যে কনডেম সেলে দিন কাটাতে হয়। এমনও আসামি আছেন ১৫/২০ বছর কনডেম সেলে কাটিয়ে সর্বোচ্চ আদালত থেকে নির্দোষ প্রমানিত হয়ে সেল থেকে মুক্তি পেয়েছেন। মামলা বিচারাধীন অবস্থায় কনডেম সেলে থাকা ৬০ বছরের উর্ধ্বে এমন নারী-পুরুষ, অসুস্থ যে কোনো আসামির জামিনের ব্যবস্থা রাখা উচিত। পৃথিবীর অনেক দেশে এমন ব্যবস্থা রয়েছে।

চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে আসামিদের বছরের পর বছর কনডেম সেলে রাখা অনৈতিক উল্লেখ করে তিনি বলেন, দুর্বিসহ জীবন কাটাতে হয় আসামিদের। কারণ চূড়ান্ত নিষ্পত্তির আগ পর্যন্ত যেহেতু শাস্তি দেওয়া যায়না, সেহেতু কনডেম সেলে রেখে শারীরিক ও মানসিক শাস্তি দেওয়া অনুচিত। বৃটিশ আমলের এই কনসেপশন পরিবর্তন হওয়া আবশ্যাক।

জনাব পান্না বলেন, কোনো কোনো ক্ষেত্রে মিথ্যা সাক্ষীর কারণে বিচারকদের অদুরদর্শিতায় দোষি নয় এমন ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়। পরবর্তীতে তাদের কেউ আপিলে নির্দোষ প্রমাণিত হয়ে বের হওয়ার পর তখন জীবন থেকে অনেকটা বছর শেষ হয়ে যায়। এর জন্য দায়ী কে? কনডেম সেলে কাটানো সেই সময়টুকু তাকে কে ফিরিয়ে দেবে প্রশ্ন রাখেন তিনি।

ডেথ পেনাল্টি দিয়ে অপরাধ কমানো কোনো ভাইবেই সম্ভব নয় উল্লেখ করে মানবাধিকারকর্মী এই আইনজীবী বলেন, ফাঁসির মাধ্যমে কখনোই কোনো অপরাধ নির্মূল করা যায়নি। কেবলমাত্র সংশোধনের মাধ্যমেই সমাজে অপরাধ নির্মূল করা গেছে। নেদারল্যান্ডস সহ বিশ্বের অনেক দেশেই মৃত্যুদণ্ডের বিধান নেই। তাই ডেথ পেনালটি থাকাই উচিত নয় বলেও তিনি মনে করেন।

রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন বলেন, এখানে চাঞ্চল্যকর বা অগ্রাধিকারের কোনো বিষয় নেই। ২০১৮ সালের ডেথ রেফারেন্স মামলার বিচার শুরু হয়েছে। সিরিয়াল অনুযায়ী আদালত শুনছেন।

সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ পেপারবুক তৈরীতে বিলম্ব হওয়াই ডেথ রেফারেন্স মামলা জটের অন্যতম কারণ উল্লেখ করে বলেন, ডেথ রেফারেন্স মামলা শুনানির জন্য প্রথমত পেপারবুক তৈরী করতে হয়। সেই পেপারবুক সরকারি ছাপাখানায় (বিজি প্রেসে) ছাপা হয়। কিন্তু এই প্রেসে সরকারি কাজ করার কারণে পেপারবুক তৈরীতে দেরি হয়ে যায়। ফলে ডেথ রেফারেন্স মামলা শুনতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। তাই এ ব্যাপারে সরকারের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। আর সুপ্রিম কোর্টের জন্য আলাদা প্রিন্টিং প্রেস স্থাপন করলে দ্রুত পেপারবুক তৈরী সম্ভব হবে। এতে ডেথ রেফারেন্স মামলা দ্রুত শুনানি গ্রহণে সহায়ক হবে পাশাপাশি জট অনেকাংশে কমে আসবে।

দেশ বর্তমান/এআই