আফগানিস্তানকে ছয় উইকেটে হারিয়ে দুই ম্যাচের টি-টোয়েন্টি সিরিজ জিতলো বাংলাদেশ। হোয়াইটওয়াশ করার মাধ্যমে চলতি বছরে টানা তিনটি টি-টোয়েন্টি সিরিজ জয়ের কৃতীত্ব গড়লো বাংলাদেশ।
রবিবার (১৬ জুলাই) টস হেরে সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে বৃষ্টি বিঘ্নিত ম্যাচে ১৭ ওভারে ৭ উইকেটে ১১৬ রান তোলে আফগানিস্তান। এতেই বৃষ্টি আইনে বাংলাদেশের লক্ষ্য দাঁড়ায় ১১৯ রানের।
আফগানিস্তনের পক্ষে ২১ বলে ২৫ রান করেছেন ওমরজাই। আর বাংলাদেশের হয়ে ৩৩ রানে ৩ উইকেট শিকার করে ইনিংসের সেরা বোলার ছিলেন তাসকিন। জবাবে খেলতে নেমে ১৬ ওভার ১ বলে ৪ উইকেট হারিয়ে জয়ের বন্দরে পৌঁছে যায় বাংলাদেশ। দলের হয়ে সর্বোচ্চ ৩৫ রান করেছেন লিটন।
১১৯ রানে টার্গেটে খেরতে নেমে রনি তালুকদারের পরিবর্তে এদিন একাদশে বড় পরিবর্তন আসে বাংলাদেশের উদ্বোধনী জুটিতে। উদ্বোধনী জুটিতে লিটন দাসের সঙ্গী করে আফিফ হোসেন ধ্রুবকে পাঠায় বাংলাদেশ। আর পাওয়ার প্লে’তে এই দুই ব্যাটার মিলে দারুণ শুরু এনে দিয়েছে বাংলাদেশকে। খেলার শুরুর দুই বল ডট দেয় বাংলাদেশ। পরের দুই বলে দুটি বাউন্ডারি হাজান লিটন দাস। প্রথম ওভার থেকে আসে ৯ রান। দ্বিতীয় ওভারে বল হাতে আসেন অভিষিক্ত ওফাদার। তার করা প্রথম তিন বলেই বাউন্ডারি হাঁকান লিটন।
তৃতীয় ওভারে বল হাতে আসেন ভয়ংকর মুজিব উর রহমান। ওই ভোয়ার থেকে মাত্র ৫ রান নিতে পারে বাংলাদেশ। এতেই ৩ ওভার শেষে দাঁড়ায় ৩৩ রানের সংগ্রহ।
৪ রান আসে চতুর্থ ওভার থেকে। ফজল হক ফারুকিকে খেলতে বেশ বেগ পোহাতে হয়েছে লিটন দাসকে। তবে মুজিবের করা পরের ওভার থেকে ১৩ রান তুলে পাওয়ার প্লে’র ৫ ওভার থেকে বিনা উইকেটে ৫০ রান তুলে নেয় বাংলাদেশ।
পাওয়ার প্লে শেষেও দুই ওপেনার দেখে শুনেই খেলতে থাকেন। রশিদ খানের ওভার থেকে মাত্র ৪ রান নেন এই দুই ব্যাটার। এরপর এই দুই ওপেনার লিটন দাস ও আফিফ হোসেন মিলে উদ্বোধনী জুটিতেই তোলে ৬৭ রান। এরপরেই ছন্দ পতন টাইগারদের। এক ওভারে দুই ওপেনারের বিদায়ে চাপে বাংলাদেশ।
লিটন ও আফিফের উদ্বোধনী জুটি পাওয়ার প্লে’র ৫ ওভার থেকেই তুলে নেয় ৫০ রান। পাওয়ার প্লে শেষে কিছুটা ধীর গতিতে ব্যাট করতে থাকে এই দুই ব্যাটার। তবে সঠিক কক্ষপথেই ছিল বাংলাদেশ। তবে ১০ ওভারে এসে পা হড়কাল টাইগাররা। মুজিব উর রহমানের করা ওভারে দুই ওপেনার এবং উইকেটে থিতু ব্যাটার লিটন ও আফিফ উইকেট বিলিয়ে দিয়ে এলেন।
মুজিবের করা ১০ম ওভারের প্রথম বল ড্রাইভ করতে চেয়েছিলেন লিটন। তবে কভারে থাকা রশিদ খান নিজের ডান দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে দুর্দান্ত এক ক্যাচ লুফে নেন। এতেই ভাঙে বাংলাদেশের উদ্বোধনী জুটি। লিটন ফেরেন ৩৬ বলে ৬টি চারে ৩৫ রান করে। ৬৭ রানে বাংলাদেশ প্রথম উইকেট হারায়।
লিটন ফেরার পর আর উইকেটে টিকতে পারেননি আফিফ হোসেনও। ওই ওভারের তৃতীয় বলে ডিপ মিডউইকেটে উড়িয়ে মারতে চেয়েছিলেন আফিফ। তবে সেখানে থাকা করিম জানাতের হাতে ধরা পড়েন আফিফ। বাংলাদেশ মাত্র ১ রানের ব্যবধানে হারায় দুই ওপেনারকে। আফিফ ফেরেন ২০ বলে দুটি ছক্কায় ২৪ রান করে।
তিনে ব্যাট করতে নামা নাজমুল হোসেন শান্তকে তখন নতুন করে ইনিংসের হাল ধরতে হয়েছে। কিন্তু বেশি সময় উইকেটে টিকতে পারেননি তিনিও। আজমতউল্লাহ ওমরজাইয়ের করা ১১তম ওভারের শেষ বলে বোল্ড হয়ে ফেরেন তিনিও। এতেই ৭৬ রানে তৃতীয় উইকেট হারায় বাংলাদেশ।
এরপর দলের হাল ধরলেন অধিনায়ক সাকিব এবং তাওহিদ হৃদয়। চতুর্থ উইকেটে সাকিব এবং হৃদয় মিলে গড়েন ৩১ রানের জুটি। এতেই চাপ কাটিয়ে আবারও জয়ের পথে ফেরে টাইগাররা। তাওহিদ হৃদয় ১৫তম ওভারে ওমরজাইকে লং অনের ওপর দিয়ে উড়িয়ে মারতে গিয়ে মোহাম্মদ নবির তালুবন্দি হন। ১০৭ রানে ৪র্থ উইকেট হারায় বাংলাদেশ। এরপর আর পথ হারায়নি টাইগাররা। শামিম হোসেন এবং সাকিব আল হাসান মিলে বাকি কাজটা সারেন। ৫ বল হাতে রেখে ৬ উইকেটের জয় তুলে নেয় টাইগাররা। সাকিব ১১ বলে ১টি চার ও ছয়ে ১৮, শামিম ৭ বলে ১টি চারে ৭ রানে অপরাজিত থাকেন।
এর আগে টস হেরে ব্যাটিং করতে নেমে ইনিংসের শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক মেজাজে ছিলেন রহমানুল্লাহ গুরবাজ। ইনিংসের চতুর্থ বলে ডাউন দ্য উইকেট এগিয়ে এসে তাসকিনকে ছক্কা হাঁকিয়েছিলেন এই ওপেনার। পরের বলে শর্ট লেংথ থেকে আবার তুলে মেরেছিলেন গুরবাজ, এবার বল ওঠে খাড়া ওপরে। অফ সাইড থেকে আরও তিন জন ফিল্ডার ছুটে আসতে চাইলেও তাসকিন না করে দেন, নিজের বলে নিজেই ধরেছেন ক্যাচ।
গুরবাজকে ফিরিয়ে একটা মাইলফলকও স্পর্শ করেছেন তাসকিন। আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে উইকেটের ফিফটি পূর্ণ করেছেন এই পেসার। তার আগে এই মাইলফলক স্পর্শ করেছেন বাংলাদেশের আরও দুই বোলার। এই তালিকায় আছেন সাকিব ও মুস্তাফিজ।
প্রথম ওভারে তাসকিনকে তেড়ে-ফুরে খেলতে গিয়ে উইকেট বিলিয়ে এসেছিলেন গুরবাজ। পরের ওভারে আবারও এই পেসারের ওপর চড়াও হন আফগান ব্যাটাররা। এবার চার হাঁকিয়ে তাসকিনের ওভার শুরু করেন জাজাই। কিন্তু এই ওপেনারও তাড়া-হুড়া করে নিজের বিপদই ডেকে এনেছেন বৈকি। ওভারের চতুর্থ বলটি অফ স্টাম্পের বাইরে গুডলেংথ থেকে লাফিয়ে ওঠে, হজরতউল্লাহ জাজাই খেলবেন না ছাড়বেন করতে গিয়ে খোঁচা দিলেন। উইকেটের পেছনে বাকি কাজটি করেছেন লিটন দাস। তাতে নিজের টানা দুই ওভারে দুই ওপেনারকে ফেরান তাসকিন।
পাওয়ার প্লে শেষ হলেও এই চাপের বৃত্ত ভাঙতে পারেনি সফরকারী ব্যাটাররা। তাদের এমন চাপে রেখে যখন ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নেয় বাংলাদেশ, ঠিক তখনই বৃষ্টির হানা। মিনিট ত্রিশেক পর থামে বৃষ্টি। এরপর দুই দফায় আম্পায়াররা মাঠ পর্যবেক্ষণ করার পর ওভার কাটার সিদ্ধান্ত নেন। ১৭ ওভারে নেমে আসা ম্যাচ পুনরায় শুরু হয় ৮-১৫ মিনিটে।
বৃষ্টির পর নবম ওভারে প্রথমবার বোলিংয়ে আসেন নাসুম। তার এই ওভারে দুইবার জীবন পান নবি। চতুর্থ বলে কভারে ক্যাচ ফেলেছেন সাকিব। পরের বলেই আবারও এই ব্যাটারকে পরাস্ত করেন নাসুম। নবির ব্যাটের কানা ছুঁয়ে বল উইকেটের পেছনে গেলেও তা গ্লাভসে জমাতে ব্যর্থ হন লিটন। টানা দুই বলে দুই জীবন পেয়েও বেশিদূর এগোতে পারলেন না এই অলরাউন্ডার। পরের ওভারে মুস্তাফিজের লেগ স্টাম্পের বাইরের শর্ট বলে ব্যাট চালিয়ে টাইমিং করতে পারেননি, এজ হয়ে উইকেটের পেছনে ধরা পড়েছেন এই অভিজ্ঞ অলরাউন্ডার।
১১তম ওভার সাকিব শুরু করেছিলেন উইকেট দিয়ে, শেষও করলেন উইকেট দিয়ে। প্রথম বলে সাকিবকে উড়িয়ে মারতে গিয়ে লং অনে আফিফের হাতে ধরা পড়েন ইব্রাহিম জাদরান। আর শেষ বলে নজিবুল্লাহ জাদরানকে বোল্ড করেছেন সাকিব। অফ স্টাম্পের বাইরের গুড ল্যান্থের বলে কাট করতে গিয়ে স্টাম্প উপড়ে গেছে তার। এভাবে বল স্টাম্পে আঘাত হানবে তা কিছুতেই যেন বিশ্বাস করতে পারছিলেন না এই ব্যাটার। পরে আম্পায়ারের রিভিওতে দেখা যায়, বলের আঘাতেই স্টাম্প ভেঙেছে।
বৃষ্টির পর দ্রুত ৩ উইকেট হারালেও আজমতউল্লাহ ওমরজাই ও করিম জানাতের জুটি একটা লাফ দেওয়ার চেষ্টা করছিল, সর্বশেষ ম্যাচে যেটি করেছিল নবি ও ওমরজাইয়ের জুটি। তবে শেষ দিকে দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ। শেষ পর্যন্ত ১৭ ওভারে আফগানিস্তান তুলে ১১৬ রান।