নিষিদ্ধ পলিথিনে সয়লাব দেশ। মুদি দোকান থেকে শুরু করে বাজারে মাছ, মাংস, ডিম, শাক-সবজি, ফলমূল যে কোনো পণ্য বিক্রিতে সঙ্গে দেয়া হচ্ছে পলিলিথিনের ব্যাগ। এর উৎপাদন, বিপণন ও ব্যবহার বেড়েই চলেছে। ফলে দূষিত হচ্ছে পরিবেশ, ক্ষতি হচ্ছে কৃষি জমির। পাশাপাশি হুমকির মুখে পড়ছে জনস্বাস্থ্য। এছাড়া পলিথিনে তলদেশ ভরাট হয়ে নদী হারাচ্ছে তার স্বাভাবিক প্রবাহ।
আইনি দুর্বলতার সুযোগে পরিবেশ বিপর্যয়ের এই উপাদান এখন রাজধানীসহ সারাদেশেই সহজলভ্য। অপচনশীল সর্বনাশা পলিথিনের যত্রতত্র ব্যবহারের ফলে ভরাট হচ্ছে নগর-মহানগরের পয়ঃনিষ্কাশনের নালা-নর্দমা। ভেঙ্গে পড়ছে ড্রেনেজ ব্যবস্থা। পলিথিন বর্জ্যের কারণে উর্বরতা হারাচ্ছে মাটি। ভরাট হচ্ছে খাল-বিল-নদী, দূষিত হচ্ছে পানি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, রাজধানীর কোতোয়ালি, সূত্রাপুর, বেগমগঞ্জ, চকবাজার, মৌলভীবাজার, চানখাঁরপুল, ইসলামবাগ, লালবাগ, ইমামগঞ্জ, আরমানিটোলা, দেবীদাস লেন, সোয়ারিঘাট, মিরপুর, তেজগাঁও, কামরাঙ্গীরচর, জিঞ্জিরা ও টঙ্গীতে পলিথিন কারখানা রয়েছে। এছাড়া নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামসহ দেশের অন্যান্য এলাকায়ও পলিথিন উৎপাদন হয়।
সূত্র জানায়, সারাদেশে এখনও এক হাজারের বেশি পলিথিন কারখানা রয়েছে। এর মধ্যে খোদ রাজধানী ঢাকা ও এর আশপাশেই রয়েছে প্রায় ৫শ’ পলিথিন উৎপাদনের কারখানা। পরিবেশ অধিদফতর ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পলিথিনের উৎপাদন, বিপণন ও ব্যবহার বন্ধে মাঝে মাঝে অভিযান চালিয়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের জরিমানা করে ও কারাদন্ডও দেয়। তবুও পলিথিন ব্যবহার বন্ধ হয় না। আইনের কঠোর প্রয়োগ না করায় অভিযানের ক’দিন পরই আবারও স্বাভাবিকভাবেই চলে উৎপাদন, বিপণন ও ব্যবহার।
পরিবেশ সংরক্ষণের স্বার্থে ২০০২ সালে পলিথিন শপিং ব্যাগের ব্যবহার নিষিদ্ধ করে সরকার। এছাড়া পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী পলিথিনে তৈরি সব ধরণের শপিং ব্যাগ উৎপাদন আমদানি, বাজারজাত, বিক্রি ও বিক্রির জন্য প্রদর্শন, মজুত-বিতরণ নিষিদ্ধ। এর ব্যত্যয় হলে জেল জরিমানার বিধান রয়েছে। অথচ এ আইন লঙ্ঘন করেই প্রশাসনের নাকের ডগায় বাজারগুলোতে অবলীলায় বিক্রি হচ্ছে পলিথিন ব্যাগ।
পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, সারাদেশে নিষিদ্ধ পলিথিন তৈরির কারখানা রয়েছে কমপক্ষে ১৫০০ টি। এরমধ্যে পুরান ঢাকা এবং বুড়িগঙ্গার তীর ঘেঁষে রয়েছে কমপক্ষে ৫ শতাধিক কারখানা। রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে প্রতিদিন কোটি কোটি পলিথিন ব্যাগ ব্যবহার শেষে ফেলে দেয়া হয়। ফেলে দেয়া পলিথিন ব্যাগের একটা বিরাট অংশ কোনো না কোনোভাবে নদীতে গিয়ে পড়ছে। দীর্ঘদিন ধরে নদীর তলদেশে পলিথিনের পুরুস্তর জমেছে। এতে নদী তার স্বাভাবিক প্রবাহ হারিয়ে মৃত্যুর দিকে ধাবিত হচ্ছে।
(পবা) তথ্য বলছে, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় ২০১৭ সালে ধান, চাল, ভুট্টা, সার, চিনিসহ ১৯টি পণ্যের মোড়ক হিসেবে প্লাস্টিক বা পলিথিন ব্যবহার নিষিদ্ধ করে। তখন কিছু অভিযানও চালানো হয়। পরে সেই উদ্যোগের আর সুফল মেলেনি। আণবিক শক্তি কমিশনের সাবেক মহাপরিচালক মোবারক আহমদ খান ২০১৬ সালে ‘সোনালি ব্যাগ’ উদ্ভাবন করেন। তাঁর এ আবিষ্কার ব্যাপক সাড়া ফেলায় ব্যাগটি বাজারজাত করতে ২০১৮ সালে একটি পরীক্ষামূলক প্রকল্প নেওয়া হয়। তবে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও বাণিজ্যিকভাবে বাজারে আনা যায়নি সোনালি ব্যাগ।
পরিবেশবাদিরা বলছেন, অনেক দেশ আইন করে প্লাস্টিক নিষিদ্ধ করেছে। কিন্তু আমাদের দেশে স্থলের পর এবার নদী-সাগরকে বিষিয়ে তুলেছে বিষাক্ত পলিথিন ও প্লাস্টিক। তারপরও সচেতনতা বাড়ছে না। মানুষ, প্রাণি ও পরিবেশকে রক্ষা করতে পলিথিন ও ওয়ান টাইম প্লাস্টিকের ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। তারা বলছেন, পলিথিন নিষিদ্ধ হওয়ার পরও সারাদেশে চলছে এর অবাধ ব্যবহার। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সামনেই রাজধানীসহ সারাদেশেই চলছে পলিথিন ব্যাগ ব্যবহার। আবার পুরানো পলিথিন পুড়িয়ে তৈরি করা হচ্ছে নতুন পলিথিন। এতে মারাত্মকভাবে বায়ু দূষণ হচ্ছে। পলিথিন পোড়ালে কার্বন মনো-অক্সাইড তৈরি হয়ে বাতাস দূষিত করে। এদিকে পলিথিনের জন্য সমুদ্রের জীববৈচিত্রও পড়েছে ঝুঁকির মুখে।
এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোস্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের (এসডো) এক জরিপে দেখা গেছে, প্রতি বছর ৮৭ হাজার টন, ওয়ান টাইম পলিথিন ও প্লাস্টিক বাংলাদেশে ব্যবহৃত হয়। একবার ব্যবরহারযোগ্য প্লাস্টিকের মধ্যে রয়েছে প্লস্টিক স্ট্র, কটনবাড, ফুড প্যাকেজিং, ফুড কনটেইনার, বোতল, প্লেট, প্লাস্টিক চামচ, কাপ, প্লাস্টিক ব্যাগ, পেস্ট, শ্যাম্পুর প্যাকেট ইত্যাদি। মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার ও বর্জ্য অব্যবস্থাপনার কারণে এসব প্লাস্টিক কৃষিজমি, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা, নদী-নালা, খাল-বিল ও সমুদ্রে পতিত হয়ে পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি করছে।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, করোনা শুরুর পর পরিচ্ছন্নতা সামগ্রীর কারণে প্লাস্টিক বর্জ্যের পরিমাণ বেড়েছে। দেশে বছরে এখন ৮ লাখ ২১ হাজার ২৫০ টন প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপন্ন হয়। এর ৪০ শতাংশ, অর্থাৎ ২ লাখ ২৮ হাজার টনের মতো পুনর্ব্যবহার (রিসাইকেল) হয়। বাকি বর্জ্য পরিবেশে পড়ে থাকে। রাজধানীতে বছরে প্রায় আড়াই লাখ টন, অর্থাৎ দিনে ৬৮১ টনের মতো বর্জ্য উৎপন্ন হয়। সারাদেশে দিনে এর পরিমাণ ২ হাজার ২৫০ টন। মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী সারাদেশের মানুষ বছরে মাথাপিছু ৯ কেজি বর্জ্য উৎপন্ন করলেও রাজধানীতে এটি দ্বিগুণ অর্থাৎ ১৮ কেজি।
ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রাজধানীর ড্রেনেজ সিস্টেমে জ্যাম লাগিয়ে রাখা আবর্জনাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় সমস্যার কারণ পলিথিন। পলিথিনের কারণে অন্য সব আবর্জনাও জট পাকিয়ে থাকে। তাই নগরবাসী যখন অপচনশীল পলিথিন রাস্তায় ফেলছেন, তা বহুবছর কোন না কোন ড্রেনে আটকে থাকে কিংবা বুড়িগঙ্গানদীসহ আশপাশের কোন জলাশয়ে গিয়ে জমে থাকে। এ কারণেই পলিথিন বর্জ্যে বুড়িগঙ্গাসহ ঢাকার চারপাশের জলাশয়গুলো ভয়াবহ দূষণের শিকার হয়েছে।
বৈশ্বিক মোট প্লাস্টিক দূষণের ২ দশমিক ৪৭ শতাংশ বাংলাদেশে হয় উল্লেখ করে সম্প্রতি এক বিবৃতিতে টিআইবি নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, পলিথিন ব্যবহার নিষিদ্ধ করে আইন করা হলেও কার্যকর প্রয়োগের অভাবে প্লাস্টিক থেকে পরিবেশদূষণ শুধ অব্যাহতই নয়, বরং উদ্বেগজনভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
তিনি বলেন, প্লাস্টিক বর্জ্যসহ ব্যাপকভাবে বর্জ্য ফেলার কারণে বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু, শীতলক্ষ্যা ও কর্ণফুলী নদী বাংলাদেশের অন্যতম দূষিত নদীতে পরিণত হয়েছে। প্লাস্টিক দূষণের কারণে আমাদের বাস্তুতন্ত্র এবং ভূমির ব্যাপক দূষণ ঘটায় গাছপালা ও অন্যান্য প্রাণীর অস্তিত্ব আজ হুমকির সম্মুখীন।
সুপ্রিম কোর্টের সংশ্লিষ্ট এক তথ্য অনুযায়ী, সব মিলিয়ে তিনটি পরিবেশ আদালতে বর্তমানে ৩৬৫ মামলা বিচারাধীন। এর মধ্যে ঢাকায় ১১৩ ও চট্টগ্রামে রয়েছে ২৪৩ মামলা। পরিবেশ আপিল আদালতে বিচারাধীন ৯টি মামলা। পরিবেশ-সংক্রান্ত মামলার সংখ্যা কম থাকায় ঢাকা ও চট্টগ্রামের ওই দুটি পরিবেশ আদালতে অন্য আইনে করা মামলারও বিচার চলছে। প্রায় আড়াই হাজার মামলা বিচারাধীন ওই দুই আদালতে।
পরিবেশ আদালত ছাড়াও স্পেশাল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত পরিবেশ-সংক্রান্ত মামলার বিচার করে। পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী দেশের আট বিভাগীয় স্পেশাল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে বর্তমানে বিচারাধীন ৬৬৯ মামলা। অন্যদিকে উচ্চ আদালতে পরিবেশ-সংক্রান্ত ১ হাজার ৩৫৪টি রিট বিচারাধীন। অবশ্য বিচারিক আদালতের বাইরে পরিবেশ অধিদপ্তর থেকেও ভ্রাম্যমাণ (মোবাইল) আদালতের মাধ্যমে পরিবেশ সুরক্ষায় অভিযোগ নিষ্পত্তি করা হয়। তবে এসব উদ্যোগের পরও পরিবেশদূষণ কোনোভাবেই কমছে না।
জানা গেছে, পরিবেশ অধিদপ্তরে এমনিতেই নাগরিকের অভিযোগের সংখ্যা কম। এর মধ্যে যেসব অভিযোগ জমা পড়ে, তা যাচাই-বাছাই করে আদালতে পাঠানো হয়। এর সংখ্যা আরও কম। এ-সংক্রান্ত গত ফেব্রুয়ারির একটি প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ওই মাসে পরিবেশ আদালতে ১৭ মামলা নথিভুক্ত হয়েছে।
এ ব্যাপারে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেছেন, পরিবেশ আদালতে মামলা না হওয়ার কয়েকটি কারণ আছে। এর মধ্যে প্রধান কারণ, এই আদালতের এখতিয়ার স্পষ্ট নয়। এই আদালতকে শুধু পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের আওতায় দায়ের হওয়া মামলা বিচার করার এখতিয়ার দেওয়া হয়েছে। ফলে অনেক অপরাধ এই আদালতের এখতিয়ারের বাইরে থাকে। দ্বিতীয়ত, এখানে মামলা করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তরকে। এ ক্ষেত্রে পরিবেশ অধিদপ্তর মামলা করার ক্ষেত্রে আগ্রহ দেখায় না।
তিনি বলেন, অধস্তন আদালতে পরিবেশ আদালত গঠন না করে এটি যদি উচ্চ আদালতে স্থাপন করা হয়, তাহলে এটি ভারতের ন্যাশনাল গ্রিন ট্রাইব্যুনাল বা কেনিয়ার পরিবেশ আদালতের মতো কার্যকর হতো। কারণ, বিদ্যমান ব্যবস্থায় কেউ যদি অধস্তন আদালতে কোনো মামলায় রায় পান, তাহলেও সেটি উচ্চ আদালতের নানা পর্যায়ে নিষ্পত্তির জন্য যাবে। সাধারণত পরিবেশদূষণকারীরা অনেক বেশি শক্তিশালী হয়। তাদের বিরুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের এত দীর্ঘ সময় মামলা পরিচালনা করা মুশকিল। এ ছাড়া আরেকটি বিষয় হলো পরিবেশ আদালতের সংশ্লিষ্ট বিচারকদের পরিবেশ-সংক্রান্ত বিশেষায়িত জ্ঞান না থাকা। এ জন্য উচ্চ আদালতে বিচারপতির পাশাপাশি পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে যদি পরিবেশ-সংক্রান্ত মামলা নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করা হয়, তাহলে মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির পাশাপাশি যুগান্তকারী অনেক রায় পাওয়া যেত।
এমএইচএফ