প্রধান দুই রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি এক দফা ঘোষণা করে নিজেদের অনড় অবস্থানকেই ঘোষণা করলো।
বুধবার (১২ জুলাই) রাজধানীতে দেড় কিলোমিটার দূরত্বে হাজার হাজার নেতাকর্মী ও সমর্থকদের জড়ো করে বিশাল সমাবেশের ডাক আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। সমাবেশ থেকে বিএনপি বলেছে বর্তমান সরকার প্রধান শেখ হাসিনাকে পদত্যাগ করে নির্বাচনের আয়োজন করতে হবে। সরকারী দল আওয়ামী লীগও পাল্টা বলেছে শেখ হাসিনার অধীনে সংবিধান মেনে নির্বাচন হতে হবে। শেখ হাসিনা ছাড়া কোন নির্বাচন নয়।
কিন্তু ছয় মাস ধরে দুই পক্ষের নানা বক্তব্যে কখনো কখনো মনে হয়েছে তারা সংলাপে বসে রাজনৈতিক সমস্যর সমাধানে এগিয়ে আসবেন। কিন্তু তাদের অনমনীয় মনোভাবে নানা জল্পনা কল্পনা শুরু হয়েছে। কেউ কেউ বলছেন, আবারও ২০০৬ সালের পরিস্থিতির মুখোমুখো হতে যাচ্ছে দেশ ? আবার হানাহানি জ্বালাও পোড়াও রাজনীতির দিকেই ধাবিত হচ্ছে দেশ? বিদেশি কূটনীতিকদের উপস্থিতিতে যদি পাল্টাপাল্টি সমাবেশ করতে পারে তাহলে তাদের দ্বারা কিছুই অসম্ভব নয়।
দুদলের এ অনড় অবস্থানের কারণে জনমনে বাড়ছে উদ্বেগ উৎকণ্ঠা। ‘পয়েন্ট অব নো রির্টান’এর দিকেই যেনো এগিয়ে যাচ্ছে পরিস্থিতি। এখন দেখার বিষয় কূটনৈতিকরা কি কৌশল বা জাদুবলে দুই পক্ষকে এক করে দ্বাদশ নির্বাচনের আয়োজন করে।
বুধবারের সমাবেশ থেকে বিএনপি আগামী ১৮ জুলাই সারাদেশে মহানগর ও জেলায় জেলায় পদযাত্রা এবং ১৯ জুলাই শুধুমাত্র ঢাকায় পদযাত্রার কর্মসূচী পালন করবে সরকার পতনের এক দফার দাবিতে। সেদিন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নেতাকর্মীদের আগামী দিনের সংগ্রামের প্রস্তুতি নেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
এক দফা ঘোষণার আগে ফখরুল আরও বলেন, ‘এই সংগ্রাম অস্তিত্বের সংগ্রাম। এই সংগ্রাম ১৮ কোটি মানুষের সংগ্রাম। ভোট দিতে চাই। যাকে খুশি তাকে দেবো। সব রাজনৈতিক দল, যারা যৌথভাবে আন্দোলন করছি, সর্বসম্মতভাবে আমরা যৌথ ঘোষণা দেবো যার যার জায়গা থেকে। প্রায় ৩৪টির মতো দল ও জোট সিদ্ধান্ত নিয়েছি সর্বসম্মতভাবে।’
‘আসুন, দুর্ভেদ্য উত্তাল আন্দোলনের মধ্য দিয়ে লুটেরা ফ্যাসিবাদী সরকারকে সরিয়ে সত্যিকার অর্থে জনগণের রাষ্ট্র নির্মাণ করি।’ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের প্রতি এ কথা বলেন ফখরুল।
এদিকে গতকাল বৃহস্পতিবার দলের গুলশান কায্যালয়ে সাংবাদিক সম্মেলনে ৩১ দফা ঘোষণা করা হয়েছে। এ সময় মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, সংবিধান ও রাষ্ট্র ব্যবস্থার গণতান্ত্রিক সংস্কারের মাধ্যমে জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তি, ভোটাধিকার ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ৩১ রূপরেখা ঘোষণা করা হলো।
তিনি বলেন, সরকার পরিবর্তন বা নির্বাচনের জন্য নয়, রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের জন্য এই রূপরেখা দেওয়া হয়েছে। জনগণের চাহিদা পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিএনপিকে জনকল্যাণমূলক সংগঠন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে রূপরেখা চূড়ান্ত করা হয়েছে।
মির্জা ফখরুল বলেন, বিভিন্ন দল, জনগণ, গণমাধ্যমের প্রস্তাবনা বিবেচনায় রূপরেখা তৈরি করা হয়েছে। বিএনপি ক্ষমতায় গেলে আন্দোলনে থাকা দলগুলো থেকে জাতীয় ঐকমত্যের সরকার গঠন করা হবে।
বিএনপির নীতিনিধারণী নেতাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, তাদের পিট দেয়ালে ঠেকে গেছে। ্এবার সমানে এগিয়ে যাবার পালা। সরকারকে রাজপথে একঘরে করা হবে। নিরপেক্ষ সরকারের কোন বিকল্প নেই। এ দাবি আদায়ে বিএনপি ও সমমনা রাজনৈতিক দলগুলো রাজপথে আরো সক্রিয় হয়ে উঠবে। সরকারকে পদত্যাগ বাধ্য করা হবে, শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের মাধ্যমেই দাবি আদায় করা হবে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির একজন নেতা দেশ বর্তমানকে বলেন, রাজপথে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করবে বিএনপি। কেউ গায়ে পড়ে সংঘাত সৃষ্টি করলে দায় তাদের। তিনি বলেন, সরকার বার বার উস্কানি দিচ্ছে, বিএনপি সর্তক রয়েছে। এবার আর বিএনপিকে বলতে পারবে না জ্বালাও পোড়াও করছে। সরকারই চেষ্টা করছে বিএনপির আন্দোলনকে বানচাল করতে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহলের মতে, বুধবারের শান্তিপূর্ণ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হওয়ার পেছনে কূটনীতিকদের চাপ ছিল। কোন পক্ষই অন্য পক্ষের মিছিল সমাবেশে হামলা বা সমাবেশে যোগ দানের সময় বাধা সৃষ্টির করতে পারবে না। কেউ কারো প্রতি উস্কানি দিতে পারবে না। কূটনীতিকদের এ চাপে দুই পক্ষই কোন ধরনের বিশৃঙ্খলা ছাড়া শান্তিপূর্ণ সমাবেশ করে নজির স্থাপন করেছে। এখন দ্বাদশ নির্বাচন অনুষ্ঠানে কূটনীতিকরা কি ভূমিকা রাখেন তার দিকে সবাই তাকিয়ে আছে।
বর্তমানে গণতন্ত্র ও মানবাধিকারবিষয়ক মার্কিন আন্ডার সেক্রেটারি উজরা জেয়া চার দিনের সফরে বাংলাদেশে অবস্থান করছেন। তার সফরসঙ্গীদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লুও রয়েছেন। এই সফরে বাংলাদেশে শ্রম অধিকার, মানবাধিকার, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন, মানব পাচার ও রোহিঙ্গা-সংকট নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা।
উজরা জেয়ার সফরের তৃতীয় দিনে গতকাল বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে যান। সেখানে আইনমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন সংশোধন করা হবে বলে আজরা জেয়াকে জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক।
পরে আইনমন্ত্রী সাংবাদিকদের জানান, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন সেপ্টেম্বরের মধ্যে সংশোধিত হবে, এই কথা সফররত যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদলকে জানানো হয়েছে।
আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে কথা হয়েছে। এই আইন নিয়ে তিনি আগেও যা বলেছেন, ঠিক সেই কথাগুলো যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদলকে বলেছেন।
আইনমন্ত্রী আনিসুল হক আরও বলেন, তারা বলেছেন, তারা সব দেশেই অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন দেখতে চান। গত বুধবার আইন ও বিচার বিভাগের সচিব ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিদলকেও বলেছেন, নির্বাচন অবাধ ও নিরপেক্ষ করার জন্য কাঠামো (আইনি কাঠামো) দেশে আছে। সেসব সহায়ক আইনের কথা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদলের কাছেও উল্লেখ করা হয়েছে বলে জানান আইনমন্ত্রী।
এদিকে গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে সাক্ষাৎ করে যুক্তরাষ্ট্র নতুন ভিসানীতি ঘোষণা করেছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশে সফররত যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও বেসামরিক নিরাপত্তা বিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি উজরা জেয়া।
তিনি বলেছেন,অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অঙ্গীকারকে সহায়তা করতে নতুন ভিসানীতি ঘোষণা করা হয়েছে।
বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিম সাংবাদিকদের এ বিষয়ে ব্রিফ করেন।এ সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানে তার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।
তিনি বলেন, ‘আমরা সবসময়ই দেশে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্যে লড়াই করেছি এবং ইতোমধ্যে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন করেছি।’
উজরা জেয়া বলেন, ‘অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অঙ্গীকারকে সহায়তা করতে তাঁর দেশ নতুন ভিসানীতি ঘোষণা করেছে।’
তিনি বলেন, ‘কোনও দলের প্রতি আমাদের কোনও পক্ষপাতিত্ব নেই। আমরা একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন চাই।’
শেখ হাসিনা বলেছেন, তিনি ব্যক্তিগতভাবে ছাত্রজীবন থেকে এবং এমনকি বঙ্গবন্ধু পরিবার ও আওয়ামী লীগ জনগণের অধিকারের জন্যে সবসময়ই লড়াই করেছে।
সরকারপ্রধান বলেন, ‘আমরা সবসময়ই জনগণের প্রতিনিধি নির্বাচনের অধিকারের জন্যে লড়াই করেছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘বিএনপিই দেশে ভোট কারচুপি শুরু করেছিল, যা বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার পরিবর্তন করেছে।’ এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘নির্বাচনের জন্যে স্বচ্ছ ব্যালট বাক্স চালু করা হয়েছে।’
এদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিদলের সফর আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য সহায়ক হবে বলে মন্তব্য করেছেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ।
তিনি বলেন, ‘ইইউ প্রতিনিধিদল এসেছে নির্বাচন কমিশনের আমন্ত্রণে। তারা স্বপ্রণোদিত হয়ে এসেছে, তা নয়। তারা যে এসেছে, এটি আগামী নির্বাচনের জন্য সহায়ক। নির্বাচন কমিশনের আমন্ত্রণেই তারা এসেছে, তারা পর্যবেক্ষক পাঠানোর প্রস্তুতি হিসেবে এ সফরে এসেছেন। সুতরাং সেটি নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য সহায়ক হবে।’
তথ্যমন্ত্রী গতকাল বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে তথ্য অধিদপ্তরের (পিআইডি) সম্মেলনকক্ষে ‘গন্তব্য: স্মার্ট বাংলাদেশ’ সংকলন গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন করেন। পরে তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। এ সময় ইইউ ও মার্কিন প্রতিনিধিদলের বাংলাদেশ সফর নিয়ে সরকার কোনো চাপ অনুভব করছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী উপরোক্ত কথাগুলো বলেন।
একদফা আন্দোলনের ওপর ভিত্তি করে নতুন কিছু কর্মসূচি দিয়েছে বিএনপি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের এ যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বলেন, তারা মাঝেমধ্যেই এমন কর্মসূচি দেন। গত বছর একবার একদফা ঘোষণা করে বলেছিল যে, খালেদা জিয়া মুক্ত হয়ে এসে সভায় যোগ দেবেন। তারেক জিয়া উড়ে এসে সভায় বক্তব্য রাখবেন। কীভাবে উড়ে আসবে, সেই ব্যাখ্যা দেননি। আমরা ধরে নিয়েছিলাম, সম্ভবত বোরাকে চড়ে আসবে বা অন্য কোনোভাবে আসবে। এসে তারপর যোগ দেবে। এরকম আরও অনেক কথা বলেছিল। কিন্তু সেই আন্দোলন গরুর হাটে মারা গেছে।
তিনি বলেন, ২০১৮ সালে বেগম জিয়ার শাস্তি যাখন নিশ্চিত হয়, তখনো এক দফা ঘোষণা করেছিল। কিন্তু সেটি হালে পানি পায়নি। আবার বেগম জিয়াকে মাঝেমধ্যে খুব অসুস্থ বানিয়ে, জীবন সংকটাপন্ন বলে মানুষের সহানুভূতি আদায়ের চেষ্টা করেছে। সেগুলোও হালে পানি পায়নি। গতকাল তারা পুরোনো কথাই নতুন করে বলেছেন, সেটি সরকারের পদত্যাগ। এটি নতুন কিছু নয়।