চট্টগ্রামে ডেঙ্গুর মহাবিপদ

প্রতিদিন গড়ে ৫৫ জন মানুষ আক্রান্ত হচ্ছেন

চট্টগ্রামে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা। চলতি জুলাই মাসের প্রথম ১০ দিনে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন ৫৪৯ জন। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে ৫৫ জন মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হচ্ছেন। এ অবস্থায় ডেঙ্গু আতঙ্ক গ্রাস করেছে চট্টগ্রামবাসীকে।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, ডেঙ্গু থেকে রক্ষা পেতে হলে এডিস মশা নিধন করতে হবে। মশার উৎপত্তিস্থল ধ্বংস করতে হবে। এক্ষেত্রে অবহেলা করা হলে সামনে মহাবিপদ দেখা দেবে।

সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় (সোমবার সকাল থেকে মঙ্গলবার ( ১১ জুলাই) সকাল পর্যন্ত চট্টগ্রামে ৭৪ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।

জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম জেলায় জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন মোট ১ হাজার ১৪ জন। গতকাল পর্যন্ত সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল মিলিয়ে ১৯৮ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি রয়েছেন। আর চট্টগ্রামে এ পর্যন্ত মোট ১৩ জন ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে জানুয়ারিতে মারা যান তিনজন। বাকি ১০ জনের মধ্যে জুনে ছয়জন এবং জুলাইয়ের প্রথম ১০ দিনে মৃত্যু হয়েছে চারজনের।

চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয়ের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুসারে, প্রতিবছরই চট্টগ্রামে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। ২০২০ সালে চট্টগ্রামে রোগীর সংখ্যা ছিল মাত্র ১৭ জন, ২০২১ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২৭১ জনে এবং ২০২২ সালে সর্বোচ্চ ৫ হাজার ৪৪৫ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, চট্টগ্রামে বিগত সময়ের তুলনায় এ বছর ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি দেখা যাচ্ছে। ডেঙ্গুজ্বরে এরই মধ্যে ১৩ জনের মৃত্যু ও আক্রান্তের সংখ্যা হাজার ছাড়িয়ে যাওয়ায় দুশ্চিন্তায় পড়েছে চট্টগ্রামের স্বাস্থ্য প্রশাসন।
চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ ইলিয়াছ চৌধুরী দৈনিক দেশ বর্তমানকে বলেন, ‘চট্টগ্রামে যেভাবে দিন দিন ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ছে, তা উদ্বেগজনক। আগে যেখানে পাঁচ থেকে সাতজন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে আসতো, এখন তা বেড়ে ২০ থেকে ৩০ জনে দাঁড়িয়েছে। চলতি জুলাই মাসে ডেঙ্গুর প্রকোপ আরও বাড়তে পারে। ডেঙ্গুর ঊর্ধ্বমুখী আক্রান্তের হার নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে সামনে পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।’

থেমে থেমে বৃষ্টির কারণে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ছে জানিয়ে সিভিল সার্জন বলেন, ‘বৃষ্টির পানি জমে মশার লার্ভার সৃষ্টি হচ্ছে। যেখানে এডিশ মশার প্রজনন (বংশ বিস্তার) ঘটছে। মূলত এ কারণেই ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়তে শুরু করেছে।’
ডা. মোহাম্মদ ইলিয়াছ চৌধুরী বলেন, ‘ডেঙ্গু প্রতিরোধের অন্যতম উপায় হচ্ছে মশার লার্ভা ধ্বংস করা, এডিস মশার বংশবিস্তার রোধ করা। তাই মশার প্রজনন রোধে সিটি করপোরেশনকে দ্রæত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। সাধারণ মানুষকেও সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।’

চিকিৎসকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, চট্টগ্রামে বেশিরভাগ মানুষ ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভার গ্রেড-১ (এতে রক্তক্ষরণ হয় না) আক্রান্ত হচ্ছেন। তবে রাজধানী ঢাকায় ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভার গ্রেড-২ তে ( চোখ, নাক, ত্বকের নিচে রক্তক্ষরণ হয়) আক্রান্তের হার বেশি। সাধারণত দ্বিতীয় বা তৃতীয়বার আক্রান্ত হলে ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভার হয়।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ডা. সুজিত পাল দৈনিক দেশ বর্তমানকে বলেন, ‘ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভারে রক্তে প্লেটলেটের সংখ্যা কমতে থাকে। একজন সুস্থ মানুষের রক্তে প্লেটলেটের স্বাভাবিক মাত্রা হলো দেড় লাখ। কিন্তু ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভারে আক্রান্ত হয়ে অনেকের রক্তে প্লেটলেটের সংখ্যা ৫ হাজার পর্যন্ত নেমে আসে। এতে রক্তক্ষরণের সম্ভাবনা থাকে।’

এদিকে ডেঙ্গু জ্বরের বাহক এডিস মশার প্রজননস্থল খুঁজে বের করতে ড্রোন দিয়ে অভিযান চালাচ্ছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন। গত ৯ জুলাই থেকে এই ড্রোন দিয়ে নগরীর বিভিন্ন বাসা-বাড়ির ছাদে মশার লার্ভা আছে কিনা তা পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। মশার প্রজননস্থল পেলেই ভবনমালিকদের জরিমানা করা হচ্ছে।

সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতা বিভাগের তথ্যমতে, ড্রোন দিয়ে গত তিনদিনে নগরীর কমপক্ষে ৫০০টি বাসা-বাড়ির ছাদ পর্যবেক্ষণ করা হয়। এর মধ্যে ১৬টি ভবনের ছাদে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া যায়। এর দায়ে ১৬টি ভবনের মালিককে ১ লাখ ৬১ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।

এর আগে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ৪১টি ওয়ার্ডে জরিপ চালিয়ে এডিস মশার প্রজননস্থল হিসেবে ৪৩৫টি এলাকা চিহ্নিত করেছে। গত ৫ জুলাই প্রতিষ্ঠানটির ম্যালেরিয়া ও মশক নিয়ন্ত্রণ শাখা এই তালিকা প্রকাশ করে। ৪১টি ওয়ার্ডের এসব স্থানকে রেড জোন বা ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। এর মধ্যে মোহরা ওয়ার্ডে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ স্থান রয়েছে।

সিটি করপোরেশন গত ২২ জুন ঢাকঢোল পিটিয়ে মশক নিধন কর্মসূচি ‘ক্রাশ প্রোগ্রাম’ শুরু করলেও ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা দিন দিন আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ অবস্থায় মশার যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে নগরবাসী। দিনের বেলায় নগরীর বিভিন্ন অলিগলিতে ফগার মেশিনের শব্দ শোনা গেলেও এই কর্মযজ্ঞকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে সন্ধ্যা হলেই বাসাবাড়িতে দেখা যায় মশার রাজত্ব।
সাধারণ মানুষ সিটি করপোরেশনের ওষুধ ছিটানো কার্যক্রম নিয়ে অসন্তোষ ও ক্ষোভ প্রকাশ করছেন।

জানতে চাইলে সিটি করপোরেশনের ম্যালেরিয়া ও মশক নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা মো. শরফুল ইসলাম মাহি দৈনিক দেশ বর্তমানকে বলেন, ‘ড্রোন দিয়ে কেবল বাসা-বাড়ির ছাদে এডিস মশার প্রজননস্থল চিহ্নিত করা সম্ভব। কিন্তু বাসায় ফ্রিজ ও এসির পানির মধ্যেও এডিস মশার প্রজনন হয়। কিন্তু বাসার ভেতরে তো আর ওষুধ ছিটানো যাবে না। কাজেই কেবল সিটি করপোরেশনের দিকে না তাকিয়ে নগরবাসীকেও সচেতন হবে।’