কক্সবাজার শহরে বেড়ে গেছে চুরি, ছিনতাই, মাদক কারবার, ডাকাতি, ভূমিদূস্যতা ও হত্যাসহ নানা অপরাধের ঘটনা। প্রশাসনের পক্ষ থেকে নেওয়া হয়নি কোনো উদ্যোগ। শহরের সুশীল সমাজ ও সংস্কৃতিকর্মী ও সাধারণ নাগরিকরা বলছেন, পুলিশ আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ।
তবে কক্সবাজার সদর থানার ওসি রফিকুল ইসলামের দাবি, ‘কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটলেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিকই রয়েছে। যেসব ঘটনা ঘটেছে তার অধিকাংশেই পুলিশ ট্রেস করেছে। উদ্ধার হয়েছে মালামাল, গ্রেপ্তারও হয়েছে অনেকে। তবে এটাও সত্য এখনো কিছু ঘটনা অমীমাংসিত রয়ে গেছে। সেগুলোর সমাধানে নিরলস কাজ করছে পুলিশ।’
তিনি আরও বলেন, ‘এ শহরটা আমার চেয়ে এখানকার লোকজন ভালো চেনে। তারা জানে কারা ছিনতাইকারী, কারা চোর। সমাজের ভালো মানুষগুলো যদি পুলিশকে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করত, তাহলে আমাদের কাজ আরও সহজ হতো।’
পুলিশ, ভুক্তভোগী ও আরও কয়েকটি নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে, প্রায় প্রতিদিনই কক্সবাজারের শহর দাপিয়ে বেড়ায় দেড় শতাধিক ছিনতাইকারী। পৌরসভার ৩০টি পয়েন্টে ঘটছে নিয়মিত ছিনতাইয়ের ঘটনা। স্থানগুলো চিহ্নিত হলেও এসব এলাকায় নেই কোনো বাড়তি নিরাপত্তাব্যবস্থা। এসব ঘটনার অধিকাংশই জানাজানি না হলেও সম্প্রতি কয়েকটি ঘটনা প্রকাশ হলে পুলিশকে দোষারোপ করছে সুশীল সমাজের লোকজন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত শুক্রবার রাত ৮টায় শহরের প্রাণকেন্দ্র বাজারঘাটা থেকে অটোরিকশায় করে এক ব্যক্তিকে তুলে নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। মোহাম্মদ আলী নামে ওই ব্যক্তির বাড়ি টেকনাফ উপজেলার হ্নীলা ইউনিয়নের মধ্যম হ্নীলার কুতুবদিয়াপাড়ায়। পরে তাকে মারধর করে তার কাছে থাকা ১ লাখ ১১ হাজার টাকা কেড়ে নেয় দুর্বৃত্তরা। এ ঘটনায় শহরের মোহাজেরপাড়ার মো. জসিম ও মো. শাহাদাতকে অভিযুক্ত করে কক্সবাজার সদর থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন মোহাম্মদ আলী। তার আগের দিন ভোরে শহরের প্রধান সড়কের বার্মিজ মার্কেটের সামনে থেকে এক কর্মজীবী নারীর ভ্যানিটি ব্যাগ নিয়ে পালিয়ে যায় দুই ছিনতাইকারী।
এর আগে ৪ জুলাই দুপুর ১২টার দিকে শহরের বইল্ল্যাপাড়ার একটি ভবনের তৃতীয়তলার দরজার তালা ভেঙে ল্যাপটপ, সোনা, নগদ টাকা লুট করে নিয়ে যায় একটি সংঘবদ্ধ চক্র। ওই বাসাটি কক্সবাজার ডিসি কলেজের জীববিজ্ঞানের প্রভাষক রোসনা আক্তার সুমার। এ ঘটনায় কক্সবাজার সদর থানায় লিখিত অভিযাগের পাশাপাশি সিসিটিভি ফুটেজ পুলিশকে সরবরাহ করেছে ভুক্তভোগীর পরিবার। কিন্তু এখনো এ নিয়ে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি প্রশাসন।
এ বিষয়ে প্রভাষক সুমার স্বামী আজকের পত্রিকার কক্সবাজার প্রতিনিধি মাঈন উদ্দিন শাহেদ বলেন, ‘পুলিশকে লিখিত অভিযোগ দিয়েছি। সিসিটিভি ফুটেজ দিয়েছি। আমার বাড়ি থেকে দূরে গাড়ির মাঠের এক লোককে আমার সন্দেহ হয় বলে জানিয়েছি। কিন্তু তবুও পুলিশ কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না।’
এর আগে ৩ জুলাই রাতে শহরের রুমালিয়ারছড়ার তোরাব ভিলার পাঁচতলার একটি ভবনের দরজা ভেঙে সাড়ে তিন ভরি সোনা, ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা ও বিক্রির জন্য রাখা ৩০ হাজার টাকার কাপড় নিয়ে যায় একটি চক্র। এ ঘটনায় থানায় লিখিত এজাহার করা হলেও এখনো পর্যন্ত কাউকে আটক করতে পারেনি পুলিশ।
এ বিষয়ে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের মালিক নাসরিন সুলতানা এ্যানি বলেন, ‘আমার বাড়ির নিচে সিকিউরিটি আছে। আমরা একটি পারিবারিক অনুষ্ঠানের কারণে বাসার বাইরে ছিলাম। ঘটনার পর দুই দফা পুলিশ আমার বাসায় এসেছে। কিন্তু এখনো মালামাল কিংবা চোরের খোঁজ মেলেনি।’
গত ৩০ জুন খুরুশকুলে হেফাজ উল্লাহ নামে এক জেলে খুন হন। তার আগে ২৯ জুন রাতে শহরের রুমালিয়ারছড়ার বাপ্পিকে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করা হয়। এ দুই হত্যার আসামিরা এখনো অধরা বলে দাবি করেছেন পরিবারের লোকজন। এ ছাড়া গেল মাসে আরও কয়েকটি খুনের ঘটনা ঘটেছে শহরে।
সরেজমিনে শনিবার রাত ১২টা থেকে ভোর ৫টা পর্যন্ত শহর ঘুরে দেখা য়ায়, অধিকাংশ সড়কবাতি বন্ধ। ঘুটঘুটে অন্ধকার শহরের প্রধান সড়ক ও অলিগলিতে। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রধান সড়ক ও অলিগলিতে ১৬-১৭ বছর বয়সী কিশোর থেকে ৩০ বছর বয়স পর্যন্ত যুবকদের সন্দেহজনক ঘোরাফেরা করতে দেখা গেছে। এরা ছোট ছোট গ্রুপ করেই হাঁটছিল শহরের ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোতে। দেখা মিলেছে ঝড়োগতির মোটরসাইকেল চলাচল। এ ছাড়া ছিনতাইপ্রবণ এলাকা হিসেবে পরিচিত শহরের বিডিআর ক্যাম্প এলাকার আমতলা, সাবমেরিন গেট, সিটি কলেজ গেট, আলীর জাহাল রোড, গরুর হলদা সড়ক, হাশেমিয়া মাদ্রাসা গেট, খুরুশকুল রাস্তার মাথা, টেকপাড়া মসজিদ রোড, ম্যালেরিয়া অফিস সড়ক, বার্মিজ স্কুল রোড, বৌদ্ধ মন্দির সড়ক, হাসপাতাল সড়ক, ভোলা বাবুর পেট্রোলপাম্প, লালদীঘিরপাড় ও গাড়ির মাঠের মুখ জইল্ল্যার মোড়, জাম্বুর মোড় ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র এলাকায় নিরাপত্তা বাহিনীর প্যাট্রল কিংবা মোবাইল টিমের দেখা না মিললেও, বাজারঘাটা পুকুরপাড়, কালুর দোকান, গোলদীঘিরপাড় ও সুগন্ধা পয়েন্টে দেখা মিলেছে পুলিশের। সেসব এলাকায় বসে বসে তারা নিজেদের মধ্যে খোশগল্পে মত্ত ছিলেন।
এ বিষয়ে ‘আমরা কক্সবাজারবাসী’র সাধারণ সম্পাদক নেজাম উদ্দিন বলেন, ‘প্রায় প্রতিদিনই চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, এমনকি খুনের মতো ঘটনা অহরহ ঘটছে এ শহরে। আমাদের নিরাপত্তা দিতে চরম ব্যর্থতায় পরিচয় দিচ্ছে বর্তমান পুলিশ।’