সমাধান খোঁজা হচ্ছে সংলাপে

আগামী নির্বাচন নিয়ে নানা আলোচনায় সরব রাজনৈতিক অঙ্গন। মাঠের বিরোধীদল বিএনপি এক দফার আন্দোলন জোরদার করার কথা জানিয়েছে। তারা সরকারের পদত্যাগ ও নিরপেক্ষ তদারকি সরকার ছাড়া কোন নির্বাচনে যাবে না। সরকারী দল আওয়ামী লীগও বিএনপিকে বাগে আনতে নানামুখী বক্তব্য দিয়ে আবার সেখান থেকে সরে আসছে। এক পা সামনে এগোয় তো দুই পা পিছনে সরে যাচ্ছে।

সম্প্রতি আওয়ামী লীগের বর্ষিয়ান নেতা আমির হোসেন আমু জাতিসংঘের প্রতিনিধির উপস্থিতিতে সংলাপের কথা বলে পরদিনই তিনি দলের শীর্ষনেতাদের চাপে সেখান থেকে সরে আসেন। এখন আবার কথা উঠছে প্রেসক্রিপশন নিয়ে। কার প্রেসক্রিপশনে দু’দল সংলাপে বসবে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহলের মতে, আগামী নির্বাচন প্রেসক্রিপশনে হোক বা সংবিধানের মধ্যে থেকে হোক একটা সংলাপ ছাড়া হবে না। সংলাপের আয়োজন করতেই হবে।

তবে সংলাপ ইস্যুতে এখন পর্যন্ত আওয়ামী লীগের নেতারা ও সরকারের মন্ত্রীরা যে বক্তব্য দিচ্ছেন সেটাকে আপাতত বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে না বিএনপি। কারণ সংলাপ নিয়ে সরকারি দল থেকে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য আসছে। বিএনপি সরকারের মনোভাব আরও পর্যবেক্ষণ করতে চায়। দলটির সিনিয়র নেতারা মনে করছেন, নির্বাচন ঘনিয়ে আসায় বিরতি দিয়ে সংলাপের ইস্যুকে সামনে আনা হবে। এটা সময় ক্ষেপণ ছাড়া কিছু নয়। বিএনপির মাঠের আন্দোলনকে স্তিমিত করতে সরকার রাজনীতিতে সংলাপের কথা টেনে এনেছে। তবে কেউ কেউ সংলাপ নিয়ে সরকারি দলের বক্তব্যকে ইতিবাচকভাবেও দেখছেন।

এদিকে গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে বিএনপির গুলশানের কার্য্যালয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত চার্লস হোয়াইটলির নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল বিএনপি নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। এ প্রসঙ্গে সাংবাদিকরা নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ব্যাপারে তাদের বক্তব্য কী জানতে চাইলে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘তারা তো সব সময় বলে আসছে, বাংলাদেশে অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন চাই, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন চাই। এটা আরও ভালোভাবে এক্সপ্লোর করার জন্য বাংলাদেশে আরও একটা টিম আসবে। তারা দেখবেন যে বাংলাদেশে আসলে অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচন হওয়ার সুযোগ আছে কি না।’

আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতা হলে সংলাপের সম্ভাবনা আছে কি না, জানতে চাইলে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আমি এ বিষয়ে এখনোই কোনো কথা বলতে পারব না। কারণ সে বিষয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। আলোচনাটা হচ্ছে যে বাংলাদেশে বর্তমানে নির্বাচনের কোনো পরিস্থিতি আছে কি না। এই সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচন সম্ভব কি না, সেটাই তারা জানতে চাচ্ছেন।’

বর্তমানে নির্বাচনকালীন প্রেসক্রিপশন আলোচনায় আসছে, এ নিয়ে উনাদের (ইইউ) কোনো সাজেশন আছে কি না, জানতে চাইলে বিএনপি নেতা বলেন, ‘প্রেসক্রিপশনের ব্যাপারে তো প্রশ্নই উঠতে পারে না। কিসের প্রেসক্রিপশন। এখানে ইলেকশন হতে হবে। আমরা বলেছি, নিরপেক্ষ সরকার ছাড়া নির্বাচন সম্ভব নয়। বর্তমানে আওয়ামী লীগ যে অবস্থান তৈরি করেছে, তাতে প্রমাণিত হয়ে গেছে গত দুটো নির্বাচনের পর এখন আর নির্দলীয় সরকার ছাড়া নির্বাচন সম্ভব নয়।’

তিনি বলেন, ‘প্রেসক্রিপশনের প্রশ্ন না। সংবিধানে আছে জনগণ ভোট দেবে। সুষ্ঠু, অবাধ নির্বাচন হবে। সেখানে জনগণের ভোট দিয়ে সরকার হবে।’

এদিকে মঙ্গলবার দুপুরে নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রেসক্রিপশনে এবার কোনও নির্বাচন হবে না’ বলে মন্তব্য করেছেন । তিনি বলেন, ‘ওবায়দুল কাদের সাহেব যা-ই বলুন না কেন, অবৈধভাবে সশস্ত্র শক্তি প্রয়োগ করে আর ক্ষমতায় যাওয়া যাবে না। দেশের জনগণ এবং বিশ্ববাসীর কাছে এটা স্বীকৃত যে অবৈধ সরকার গোটা দেশ অবৈধভাবে দখল করেছে। গত ১৪ বছর ধরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মাধ্যমে যেভাবে ওবায়দুল কাদের সাহেবরা দেশ চালিয়েছেন, সেই প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী দেশ শাসনের অবসান ঘটাতে এবার জনগণ সর্বাত্মক প্রস্তুত আছে।’

বিএনপির নেতারা বলছেন, সংকট সমাধানে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো প্রস্তাব পেলে তারা দলের বৈঠকে আলোচনা করে যাওয়া না-যাওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন। তবে যেকোনো ধরনের আলোচনা হতে হবে অবশ্যই নির্বাচনকালীন সরকারের বিষয়ে। অন্য কোনো বিষয়ে আলোচনা করে সময় নষ্ট করতে চান না তারা। এ ছাড়া সংলাপ নিয়ে অতীতে তাদের তিক্ত অভিজ্ঞতা রয়েছে।
বিএনপির একজন সিনিয়র নেতার ভাষ্য, ক‚টনৈতিক তৎপরতার কারণেই সরকার সংলাপ নিয়ে নানা কথা বলছে। কয়েক দিন আগেও তারা সংলাপের সম্ভাবনাকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়েছিল। এখন তাদের গলায় নরম সুর। এ জন্য বিএনপি ক‚টনৈতিক তৎপরতা আরও জোরালো করছে। জাতীয় নির্বাচন নিয়ে বিদেশিদের চাপের কারণে সরকার কিছুটা নমনীয় হয়েছে। এখন আন্দোলন ও সংলাপ উভয়ই চলতে পারে।

বিএনপির আন্দোলন প্রসঙ্গে গত রোববার (২ জুলাই) সকালে সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে ঈদ পরবর্তী মতবিনিময়কালে কারও প্রেসক্রিপশনে নয়, আগামী জাতীয় নির্বাচন হবে সংবিধান অনুযায়ী বলে মন্তব্য করেছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের।

তিনি বলেন, বিদেশি বন্ধুরা কেউ হস্তক্ষেপ করছেন না, কেউ কেউ পরামর্শ দিচ্ছেন। আমরা তাদের কথাবার্তা, ভালো পরামর্শ শুনব। কিন্তু নির্বাচন হবে সংবিধান অনুযায়ী। সংবিধানই আমাদের বিধান। কারও পরামর্শ বা প্রেসক্রিপশনে এদেশে নির্বাচন হবে না। পৃথিবীর অন্যান্য গণতান্ত্রিক দেশে যেভাবে নির্বাচনকালীন সরকারের অধীনে নির্বাচন হয় এদেশেও সেভাবে হবে।
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বলেন, আমেরিকার নিজের গণতন্ত্রই ত্রæটিমুক্ত নয়। আমাদের কী গণতন্ত্র শেখাবে?
ভিসানীতি, নিষেধাজ্ঞা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সব বিষয়ে তাদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক অটুট থাকবে। বন্ধুত্ব থাকবে, লেনদেন থাকবে। কিছু কিছু বিষয়ে ভিন্নমত থাকতে পারে, সেটা বন্ধুত্বেরই অংশ।

প্রসঙ্গত, অভ্যন্তরীণ ভূ-রাজনীতির নানা সমীকরণে বাংলাদেশে নির্বাচন ও ক্ষমতার পালাবদল প্রশ্নে বরাবরের মতো আওয়ামী লীগের প্রতি ইতিবাচক অবস্থানে প্রতিবেশি ভারত। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের কিছু দেশের নানামুখী চাপ সত্তে¡ও নিকটতম প্রতিবেশী ও পরীক্ষিত বন্ধু ভারতের এমন ইতিবাচক বার্তায় স্বস্তি ফিরেছে ক্ষমতাসীন শিবিরে। তবুও সম্পর্ক ঝালাইয়ে চলতি মাসের শেষ সপ্তাহে ভারত সফরে যাচ্ছে দলটির পাঁচ সদস্যের প্রতিনিধিদল। নির্বাচনের আগে দল ও সরকারের সঙ্গে ভারতের যোগাযোগ মজবুত ও সম্পর্কের গুরুত্ব বাড়াতেই এ সফর বলে ধারণা করা হচ্ছে।

আওয়ামী লীগের একাধিক সূত্র জানায়, ভারতীয় জনতা পাটির (বিজেপি) আমন্ত্রণে আওয়ামী লীগ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে দেবেন সভাপতিমÐলীর সদস্য ও কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক। আরও থাকবেন দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, সাংগঠনিক সম্পাদক সুজিত রায় নন্দী, কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্য তারানা হালিম ও সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য আরমা দত্ত। সফরে প্রতিনিধিদলটির ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, বিজেপির সভাপতি জেপি নাড্ডা, বিজেপির সাধারণ সম্পাদকসহ আরও অনেকের সঙ্গে বৈঠকের কথা রয়েছে।

জানা গেছে,আগামী সেপ্টেম্বরে দিল্লিতে জি-২০ শীর্ষ সম্মেলনে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে যোগ দেবেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রীর সফরের আগে কয়েকটি গুরুত্বপ‚র্ণ বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় বিষয় ছাড়াও আগামী সংসদ নির্বাচন নিয়ে আলোচনা হতে পারে প্রতিনিধিদলের সঙ্গে। তাই আওয়ামী লীগ প্রতিনিধিদলের সফরটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। এর আগে, গত ২১ মে আওয়ামী লীগের ১৭ সদস্যের প্রতিনিধিদল চায়না কমিউনিস্ট পার্টির আমন্ত্রণে চীন সফর করেন।
#