চীন সরকারের অর্থায়নে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতাল এলাকায় বিশেষায়িত বার্ন ইউনিট প্রকল্পের কাজ শুরু হওয়ার কথা ছিল এপ্রিল মাস থেকে। কিন্তু এই প্রকল্পটি এখনো উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনায় (ডিপিপি) আটকে আছে। প্রকল্পটির কাজ শুরু হতে আরও চার মাস লাগতে পারে বলে জানিয়েছেন চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামীম আহসান।
গত ১৩ মার্চ ১৫০ শয্যার এই বার্ন ইউনিট স্থাপনে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এর আগে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি চীনের ৫ সদস্যের একটি টিম চমেক হাসপাতালে পরিদর্শনে আসে।
জানা গেছে, গত ২২ মে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালকের (পরিকল্পনা ও গবেষণা) কাছে ডিপিপি প্রেরণ করেন চমেক হাসপাতালের পরিচালক। প্রায় এক মাস ধরে এই ডিপিপি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে পড়ে আছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে এটি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।
জানতে চাইলে চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামীম আহসান দেশ বর্তমানকে বলেন, ‘ডিপিপি এখনো স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে রয়েছে। সেখান থেকে এটি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে যাবে। ডিপিপি অনুমোদন না হওয়া পর্যন্ত প্রকল্পের কাজ শুরু করা যাবে না। ডিপিপি অনুমোদন হয়ে আসতে আরও চার মাস লাগতে পারে।’
জানা গেছে, চমেক হাসপাতালের পেছনে গোঁয়াছি বাগান এলাকায় প্রায় এক একর জায়গায় নির্মাণ হবে অত্যাধুনিক এই বার্ন ইউনিট। এই প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ১৮২ কোটি টাকা। ৬ তলা বিশিষ্ট এই বার্ন ইউনিটে প্রথম তলায় থাকবে ইর্মাজেন্সি ওর্য়াড এবং ওপিডি, দ্বিতীয় তলায় তিনটি ওটি (অপারেশন থিয়েটার) এবং তলায় নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ), তৃতীয় তলায় পুরোটা হাই ডিপেন্সি ইউনিট (এইচডিইউ), ৪র্থ এবং ৫ম ওর্য়াড, ৬ষ্ঠ তলায় ওয়ার্ড এবং অফিস।
এই বার্ন ইউনিটে থাকবে ২০টি আইসিইউ, শিশুদের জন্য ৫টি আইসিইউ, ২৫টি এইচডিইউ এবং দুটি অত্যাধুনিক অপারেশন থিয়েটার থাকবে। রোগী আনা নেওয়ার সুবিধার জন্য তিনটি রাস্তা বানানো হবে। চট্টেশ্বরী রোডের দিক থেকে একটি রাস্তা হবে। সেটি হবে বার্ন হাসপাতালের প্রধান রাস্তা। চমেক হাসপাতালের পেছনে ছাত্র হোস্টেলের দিক থেকে আসবে আরও একটি রাস্তা। সর্বশেষ রাস্তাটি হবে মিজান হোস্টেলের দিক দিয়ে। সেখানে মাঝখানে পাহাড় থাকায় তা ঘুরিয়ে ওয়ার সিমেট্রি হয়ে আনা হবে।
হাসপাতালটি ৬তলা ভবনের করা হবে।
চট্টগ্রামে বিশেষায়িত এই বার্ন ইউনিট গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল সাত বছর আগে। ২০১৬ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর চীনের একটি প্রতিনিধি দল চমেক হাসপাতালে এসে ১০০ শয্যার এই বার্ন ইউনিট প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই করে যায়। কিন্তু প্রকল্পের জায়গা চূড়ান্ত করা নিয়ে গত ৭ বছর ধরে চীনা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে মন্ত্রণালয়ের নানা টানাপোড়েন চলে আসছিল। সম্প্রতি চীনা কর্তৃপক্ষ অনানুষ্ঠানিকভাবে চমেক হাসপাতালের গোঁয়াছি বাগান এলাকায় বার্ন ইউনিট প্রকল্পের জায়গা চূড়ান্ত করেছে।
উল্লেখ্য, চট্টগ্রামে দগ্ধ ও পোড়া রোগীদের একমাত্র চিকিৎসা রয়েছে চট্টগ্রাম মেডিক্যালে। ২০১০ সালে গড়ে তোলা হাসপাতালটির ২৬ শয্যার বার্ন ইউনিটে প্রতিদিন গড়ে শতাধিক রোগী ভর্তি থাকে। সরকারি এ হাসপাতালে গুরুতর দগ্ধ রোগীরা পর্যাপ্ত চিকিৎসা ব্যবস্থা নেই। অতি গুরুত্বপূর্ণ নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্র (আইসিইউ)সহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম ও পর্যাপ্ত জনবল না থাকায় আগুনে পোড়া রোগীদের এখানে পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসাসেবা দেওয়া যায় না। গুরুতর দগ্ধ রোগীকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ঢাকা বার্ন হাসপাতালে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু সময় মতো চিকিৎসাসেবা না পাওয়ায় ঢাকায় যেতে যেতেই মারা যাচ্ছেন অনেক পোড়া রোগী।
বিভিন্ন সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনায় সামনে আসে চট্টগ্রামে পূর্ণাঙ্গ বার্ন হাসপাতালের প্রয়োজনীয়তা। গত বছর সীতাকুণ্ডের বিএম ডিপোতে বিস্ফোরণের ঘটনায় শয্যা না থাকায় হাসপাতালের তিনটি ওয়ার্ডে চিকিৎসা দিতে হয়েছে পোড়া রোগীদের। এছাড়া তুলনামূলক খারাপ রোগীদের পাঠিয়ে দেওয়া হয় ঢাকার বার্ন হাসপাতালে। ওই সময় চট্টগ্রামে একটি বিশেষায়িত বার্ন ইউনিট নির্মাণের বিষয়টি আবার সামনে আসে।