নগর গোয়েন্দা পুলিশের সর্বশেষ তালিকা অনুযায়ী ১৬ থানায় বর্তমানে সক্রিয় রয়েছে ৬২০ জনের অধিক ছিনতাইকারী। এর মধ্যে ১৬০ ছিনতাইকারীকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছে, বাকি ৪৬০ জনকে হন্যে হয়ে খুঁজছে পুলিশ।
এক সময় যেখানে ছিনতাই হওয়া মালামাল উদ্ধার দূরে থাক, অপরাধীদের শনাক্তে বেগ পেত পুলিশ, সেখানে গত দেড় মাসে ছয়টি ঘটনায় অপরাধীদের আটকের পাশাপাশি ছিনতাই হওয়া মালামাল উদ্ধারে সফলতা দেখিয়েছে বাংলাদেশ পুলিশের এই ইউনিট।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-কমিশনার (গোয়েন্দা) নিহাদ আদনান তাইয়ান দেশ বর্তমানকে বলেন, থানা পুলিশের সাথে সাথে নগর গোয়েন্দা বিভাগ অন্যান্য অপরাধ রোখার পাশাপাশি ছিনতাই রোধেও বেশ তৎপর। গত কয়েক মাসে আগে করা তালিকায় ছিনতাইকারীর সংখ্যা ৬০৩ হলেও কিছু মামলায় নতুন কিছু নাম আসায় বর্তমানে ৬২০ জনের এর অধিক হবে নগরীতে ছিনতাইকারীর সংখ্যা। এরমধ্যে ১৬০ জন ছিনতাইকারীকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছে পুলিশ।
তিনি আরও বলেন, আমাদের তালিকায় আটককৃতরা ছাড়া প্রত্যেককেই আমরা নজরদারীতে রাখার চেষ্টা করছি। প্রত্যেক এলাকায় খোঁজ খবর রাখছি, যখনই কারো বিরুদ্ধে কোন রিপোর্ট আসে আমরা তখনই তাকে নজরদারীতে আনার চেষ্টা করি। আর যখনই কোন ঘটনা ঘটে সংশ্লিষ্ট যারা থাকে তাদের নাম আমরা সংগ্রহ করি, তাদেরকে আটক করার চেষ্টা করি এবং তাদেরকে তালিকাভুক্ত করার চেষ্টা করি। তালিকায় থাকা ছিনতাইকারীদের খুঁজছে বলেও জানান নগর গোয়েন্দা পুলিশের উত্তর বিভাগের এই উপ-কমিশনার।
গত শুক্রবার নগরীর হাজারী গলির এক স্বর্ণ ব্যবসায়ীর ১৪টি স্বর্ণের বার ছিনতাইয়ের ঘটনায় পলাতক মো. আলমগীর (৫২) ও সরোয়ার (৩২) নামে দুজনকে গ্রেফতার এবং ছিনতাই হওয়া ৩টি স্বর্ণের বার ও স্বর্ণালংকার সহ প্রায় ৪০ ভরি স্বর্ণ এবং স্বর্ণের বার বিক্রির ১৫ লাখ ৩০ হাজার টাকা উদ্ধার করে কোতোয়ালী থানা পুলিশ।
এর আগে রবিবার একই ছিনতাইয়ের ঘটনায় মঙ্গলবার (৮ আগস্ট) ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত জয়ন্ত বনিক, প্রবীর বনিক, আব্দুর রউফ, মো. মাঈনুদ্দীন হাসান তুষার এবং শ্রাবণী বণিক নামে পাঁচ জনকে গ্রেফতার এবং ছিনতাই হওয়া ছয়টি স্বর্ণের বার ও বার বিক্রির ৬ লাখ ৩০ হাজার টাকা উদ্ধার করে পুলিশ। গত শনিবার (৫ আগস্ট) মামুন নামে এক কিশোর নগরীর বন্দর ২ নম্বর মাইলের মাথা বোনের বাসা যাওয়ার পথে মোবাইল ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনায় জড়িত বাসের চালক মো. মফিজ (২৯), হেলপার মো. মাহাদুল করিম (২০), হেলপার মো. রাকিব প্রকাশ মেহেদী (১৯) ও কন্ডাক্টর মো. সাইদুল ইসলাম জিসানকে (১৯) গ্রেফতার এবং ছিনতাই করা মোবাইল সেটটি উদ্ধার করে বন্দর থানা পুলিশ।
এর আগের দিন শুক্রবার (৪ আগস্ট) বিকেলে সিটি সার্ভিসের ৪ নম্বর রুটে চলাচল করা বাসযোগে মুরাদপুর থেকে আগ্রাবাদ যাওয়ার পথে সাংবাদিক শৈবালের গাড়ির ভেতর থেকেই মোবাইল ও মানিব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনায় কয়েকঘণ্টার মধ্যে ছিনতাইকারী দলের কয়েক সদস্যকে আটক এবং ছিনতাই হওয়া মোবাইল ফোন উদ্ধার করে ডবলমুরিং থানা পুলিশ। উদ্ধারের ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যেমে বেশ কিছু সাংবাদিক এবং সচেতন সমাজ পুলিশকে সাধুবাদ জানাতে দেখা যায়।
এছাড়া গত মাসের শেষ সোমবারে (৩১ জুলাই) নগরীর পাহাড়তলী থানার নোয়াপাড়া এলাকার বাসা থেকে একদিন আগে চুরি হওয়া তিন বছর শিশুকে কুমিল্লা থেকে উদ্ধার করে পাহাড়তলী থানা পুলিশ। পাশাপাশি গ্রেফতার করা হয় এ ঘটনায় জড়িত হোসনা আক্তার (৪০) এবং তার স্বামী মো. রুবেল (২৫) নামে দুজনকে। এর আগে ১২ জুলাই নগরীতে চলন্ত বাসে জিম্মি করে পারভেজ খান নামের মুন্সীগঞ্জের এক গাছ ব্যবসায়ীর ছিনিয়ে নেওয়া মুঠোফোন, নগদ ২০ হাজার টাকা, ঘড়ি ও কাপড়ের ব্যাগ কেড়ে নেয়ার ঘটনায় জড়িত আজিম, সাজ্জাদ হোসেন আজাদ, নিশাদ, মুন্না ও সাইফুল ইসলাম নাঈম নামের ছিনতাইকারী চক্রের পাঁচ সদস্যকে গ্রেপ্তার করে খুলশী থানা পুলিশ। ধরা পরার আগের দিন এরা ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটায়। এ ঘটনায় উদ্ধার হয়েছে পারভেজ খানের মানিব্যাগ,জামাকাপড় ও ৩ হাজার টাকা।
১০ জুলাই রিয়াজউদ্দিন বাজার ব্যবসায়ী নুর মো. ইয়াছিন কবিরের দুই কর্মচারীকে মারধর করে নগদ প্রায় দশ লাখ টাকা নিয়ে ছিনতাইয়ের ঘটনায় প্রধান হোতা মো. একরামুল আলম (৩৭), সাহেদ হোসেন মনা (২৪), মো. ইয়াছিন প্রকাশ মো. এরফান সাব্বির (২৪) ও রবিউল হোসেন মো. ইকবাল হোসেন ইবু (২৩) নামের চারজনকে গ্রেফতার করে কোতোয়ালী থানা পুলিশ। এর একদিন আগে ছিনতাই হওয়া টাকা থেকে উদ্ধার করা হয় ৭ লাখ ১০ হাজার টাকা।
এছাড়াও নানা সময়ে বিভিন্ন জায়গায় ছিনতাইয়ের ঘটনা গণমাধ্যম ও পুলিশের আড়ালে থেকে যায়। যেখানে কেউ কেউ প্রতিকার পাওয়া নিয়ে সন্দিহান, আবার কেউ কেউ সামাজিক মর্যাদা হানির শঙ্কায় থাকে। তবে ছিনতাইয়ের সাথে সাথে সঠিক তথ্য দিয়ে থানা পুলিশকে সহযোগিতা করলে ছিনতাই হওয়া মালামাল ও ছিনতাইকারীদের আইনের আওতায় আনা সহজ বলে মনে করছেন নগর পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকতারা।
অপরাধ দমনে এমন তৎপরতা, দীর্ঘদিন থেকে পুলিশকে নিয়ে নাগরিকদের যে খারাপ ধারণা তা দূর হয়ে পুলিশের ভাবমুর্তি বাড়বে বলে মনে করছেন সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজন’র চট্টগ্রাম জেলার সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আখতার কবির চৌধুরী।
তিনি দেশ বর্তমানকে বলেন, পুলিশ যদি এভাবে আন্তরিকতার সহিত কাজ করে তাহলে অপরাধ সংঘটন অনেক কমবে। এ ক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক মানসিকতার পরিবর্তন করে, নাগরিকদের প্রতি দায়িত্ববান ও কর্তব্য পালনে নিষ্ঠাবান হয় সততার সাথে স্বচ্ছতার সাথে জবাবদিহিতার সাথে কাজ করে তাহলে অকারণে পুলিশভীতি দূর হয়ে সুশাসনের জন্য সুফল বয়ে আনবে।
কোতোয়ালীতে স্বর্ণালংকার ও টাকা উদ্ধার অভিযানে থাকা কোতোয়ালী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. মোমিনুল হাসান দেশ বর্তমানকে বলেন, শুধু ছিনতাই নয় যেকোন অপরাধ রুখতে উর্ধ্বতন স্যারদের নির্দেশে টিম কোতোয়ালী সবসময় প্রস্তুত।
চট্টগ্রাম মেট্টোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) আ স ম মাহতাব উদ্দিন নগরবাসীকে ছিনতাইয়ের শিকার হলে দ্রুত নিকটস্থ থানায় অভিযোগ করার আহ্বান জানিয়ে দেশ বর্তমানকে বলেন, ভোক্তভোগীরা দ্রুত ও সঠিক তথ্য দিয়ে থানাকে অবহিত করলে আমরা অপরাধীদের ধরতে এবং ছিনতাই হওয়া মালামাল উদ্ধারে সহায়ক হয়। অপরাধ দমনে নগর পুলিশ সবসময় সজাগ ও তৎপর। কোন অপরাধী নগরীতে অপরাধ করে পার পাবেনা বলেও জানান অতি. এই পুলিশ কমিশনার।
প্রসঙ্গত: গোয়েন্দা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের তুলনায় চলতি বছর অন্তত ২৬০ ছিনতাইকারী যেমন নতুন করে তালিকায় এসেছে, তেমনি হদিস মিলছে না ২০০ এর বেশি পুরাতন ছিনতাইকারীর। তালিকাভুক্ত এসব ছিনতাইকারীর বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে সর্বনিম্ন পাঁচটি থেকে সর্বোচ্চ নয়টি।
দেশ বর্তমান/এআই