‘পাহাড়ের কান্নাকে ঝর্ণা সবাই বলে, সেই ঝর্ণাধারায় পাহাড় কষ্টের নদী বয়ে চলে…।’ পাহাড় নিয়ে এমন কথামালাকে ভরাট কণ্ঠে অন্য মাত্রা দেন ব্যান্ডশিল্পী জেমস। বাস্তবতাও তাই, ক্ষত বুকে চলছে পাহাড়ের বোবা কান্না! বোবা পাহাড়ের কান্নায় পাহাড়খেকোদের মন না ভেজা স্বাভাবিক। তবে পাহাড়ের কান্না থামাতে প্রশাসনের নেই কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ।
চট্টগ্রামে একের পর এক পাহাড় কেটে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হচ্ছে। এমনকি সরকারি প্রতিষ্ঠানও পাহাড় কেটে বহুতল ভবনসহ নানা স্থাপনা বানাচ্ছে। কোথাও উন্নয়নের নামে, আবার কোথাও মাটিখেকোদের জুলুমে ফোকলা হচ্ছে এই প্রকৃতির দেয়াল। নতুন স্থাপনা নির্মাণ থেকে সড়ক সম্প্রসারণ বা নানা ছুতায় কোপ পড়ছে পাহাড়ে। কোনো রকম রাখঢাক ছাড়াই, ফকফকা দিনের আলোতেই চলছে এই পাহাড় লুট। পাহাড় লোপাটের সেই গল্পে সরকারি দলের নেতা-কর্মীরা থাকেন ‘নায়ক’, আর স্থানীয় প্রশাসন হয়ে যায় নীরব দর্শক!
পরিবেশবিদ ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এভাবে নির্বিচারে পাহাড় খোদাই চলতে থাকলে আগামী পাঁচ দশকের মধ্যে চট্টগ্রামে আর পাহাড় দেখা যাবে না। পাহাড় কাটার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পরিবেশ-প্রতিবেশ। বন হারাচ্ছে তার চেনা রূপ। এ কারণে বনের নানা প্রাণী হাঁটছে বিলুপ্তির পথে।
জানা গেছে, বন্দরনগরী চট্টগ্রামের পাহাড়ে প্রথম কোপ দিয়েছিল ব্রিটিশরা। ১৭৬০ সালে পাহাড় কাটার যে অশুভ তৎপরতা শুরু হয়েছিল সেই ধারা বজায় ছিল পাকিস্তান আমলেও। আর এখন স্বাধীন বাংলাদেশে পাহাড়কে করা হচ্ছে ক্ষত-বিক্ষত। পাহাড় কেটে কেটে সেখানকার রূপ-সৌন্দর্য সবই কেড়ে নেওয়া হচ্ছে।
জানা গেছে, ৪০ বছর আগে চট্টগ্রামে ২০০টি পাহাড় ছিল, যার ৬০ শতাংশ অর্থাৎ ১২০টিই ইতোমধ্যে বিলুপ্ত হয়ে গেছে।
গতকাল রোববার সকালে চট্টগ্রাম মোটেল সৈকতে এক মতবিনিময় সভায় বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান জানান, চট্টগ্রাম নগরীর শুধু পাঁচলাইশ মৌজাতেই ৭৪ শতাংশ পাহাড় কাটা হয়েছে।
পাহাড় কেটে কিভাবে জীববৈচিত্র রক্ষা হবে?-এমন প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, ‘১৯৭৬ সালে চট্টগ্রামে ৩২ দশমিক ৩৭ বর্গকিলোমিটার পাহাড় ছিল। ২০০৮ সালে তা কমে ১৪ দশমিক ২ বর্গকিলোমিটারে নেমে আসে। এ সময়ে ১৮ দশমিক ৩৪৪ বর্গকিলোমিটার পাহাড় কাটা হয়। সবচেয়ে বেশি ৭৪ শতাংশ কাটা পড়ে পাঁচলাইশে।’
সভায় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র এম রেজাউল করিম চৌধুরী ও ইস্ট ডেল্টা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক সিকান্দার খান উপস্থিত ছিলেন।
২০১১ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়, ১৯৭৬ থেকে ৩২ বছরে চট্টগ্রাম নগর ও আশপাশের ৮৮টি পাহাড় সম্পূর্ণ এবং ৯৫টি আংশিক কেটে ফেলা হয়। বেশিরভাগ পাহাড় কাটা হয় পাহাড়তলী, খুলশী, বায়েজিদ, লালখান বাজার মতিঝরনা, ষোলশহর ও ফয়’স লেক এলাকায়। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) ১৫টি পাহাড় কেটে ফৌজদারহাট-বায়েজিদ বাইপাস সড়ক নির্মাণ করেছে।
জানা গেছে, চট্টগ্রামে পাহাড় কাটার সঙ্গে জড়িতদের অধিকাংশই প্রভাবশালী ব্যক্তি। জরিমানা ও শাস্তির হাত থেকে বাঁচতে নতুন নতুন কৌশল গ্রহণ করেন সংশ্লিষ্টরা। যেমন পাহাড়ের জমি কেনার পর তা নামজারি না করার ফলে একের পর এক পাহাড় কাটার সঙ্গে জড়িত থেকেও তারা পার পেয়ে যাচ্ছেন। পাহাড় কাটার ঘটনায় পরিবেশ অধিদপ্তর ও স্থানীয় থানা পুলিশ মামলা করলেও তা বন্ধ হচ্ছে না।
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক আবুল বাসার মোহাম্মদ ফখরুজ্জামান বলেন, ‘আমি পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির বিভিন্ন সভায় বলেছি, পরিবেশ অধিদপ্তর, সিডিএ এবং সিটি করপোরেশন সর্বোপরি স্থানীয় জনগণকে পাহাড় রক্ষায় এগিয়ে আসতে হবে। সে কাজ না করে সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলররা পাহাড় কাটার সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়েছেন।’
পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৩ থেকে ২০২৩ সালের এপ্রিল পর্যন্ত চট্টগ্রাম মহানগরে পাহাড় কাটার ঘটনা ঘটেছে প্রায় ১৬১টি। এর মধ্যে পাহাড় কাটার অপরাধে পরিবেশ অধিদপ্তর কর্তনকারীদের বিরুদ্ধে মামলা করেছে প্রায় ৮৬টি। যার বেশির ভাগ মামলা চার্জশিট এবং সাক্ষ্যপ্রমাণের অভাবে রায় দিতে পারেনি পরিবেশ আদালত।
চট্টগ্রাম পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম মহানগর কার্যালয়ের উপপরিচালক মিয়া মাহমুদুল হক বলেন, ‘পরিবেশ আইনে পাহাড় কাটলে অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে বিভিন্ন আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়ার বিধান আছে। ইতোমধ্যে পাহাড় কাটার দায়ে আমরা অনেকের বিরুদ্ধে মামলা ও জরিমানা করেছি। তবে পাহাড় রক্ষায় আমাদের করণীয় কী সে বিষয়ে কোনো সুপারিশ নেই। যার কারণে চট্টগ্রামের পাহাড় রক্ষায় আমরা বিশেষায়িত জরিপ করার উদ্যোগ নিয়েছি।’
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) বন ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. খালেদ মেসবাহুজ্জামান বলেন, ‘চট্টগ্রামের সৌন্দর্য ধারণ করে প্রাকৃতিক পাহাড়গুলো। কিন্তু এ সৌন্দর্য হারিয়ে যেতে বসেছে বাছবিচারহীনভাবে পাহাড় কাটার কারণে। চট্টগ্রামে বর্তমানে টিকে থাকা অবশিষ্ট পাহাড় রক্ষা করতে হলে জেলা প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর, সিডিএ, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এক হয়ে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করার বিকল্প নেই।’
এমএফ