সাজেদা হক: দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনেই প্রার্থী দিতে প্রস্তুত গণমুক্তি জোট। গতকাল বুধবার সকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবে ‘সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবিতে বর্তমান প্রেক্ষাপটে করণীয়’ শীর্ষক আলোচনা সভায় এ কথা বলেন, গণমুক্তি জোটের চেয়ারম্যান ড. শাহরিয়ার ইফতেখার ফুয়াদ। তিনি বলেন, নির্বাচন আসন্ন। আমরা যারা নিরপেক্ষ, তারা এই নির্বাচনকে সুষ্ঠু করার একটা দায়িত্ব নিতে চাই। সেটা হলো- সকলে মিলে কথা বলার একটা প্লাটফ্রম তৈরি করতে চাই আমরা। যে প্লাটফ্রমে দাঁড়িয়ে সবাই সুষ্ঠুভাবে নির্বাচনমুখী হবেন, অংশ নেবেন এবং বাংলাদেশের উন্নয়নে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করবেন। তিনি বলেন, গণমুক্তি জোটের স্লোগান হলো, জয় হোক গণমুক্তি জোটের, জয় হোক গণ মানুষের, জয় হোক বাংলাদেশের। বাংলাদেশে একটা প্রচলিত ধারণা আছে, যে বাংলাদেশের নাম আগে থাকতে হবে। আমরা মনে করি এটি একটি ভুল ধারণা। সম্মান আসলে নামের আগে বা পরে দিলেই বাড়ে বা কমে না। আমরা মুলত বাংলাদেশের গুরুত্ব বোঝাতে শেষে বাংলাদেশ দিয়েছি। বাংলাদেশকে আমরা সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেই সেজন্য স্লোগান শেষ হয়েছে বাংলাদেশের জয়ধ্বনি দিয়ে। এর একটা উদাহরণ আপনাকে দিতে পারি। আপনি দেখবেন আওয়ামী লীগের স্লোগান হলো জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু। আওয়ামী লীগের কাছে বঙ্গবন্ধু গুরুত্বপূর্ণ, সুতরাং তাদের স্লোগান শেষ হয়েছে বঙ্গবন্ধু দিয়ে। আমরা ইদানীং দেখছি যে, যুক্তরাষ্ট্র, চীন এবং রাশিয়া বাংলাদেশ নিয়ে বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে। তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ আছে। তার মধ্যে দুটি কারণ বেশ উল্লেখযোগ্য। একটা কারণ হলো: বিরাট একটা অংশ স্কলারশিপে বিদেশ গেছেন, তারাই বিদেশিদের বাংলাদেশে আমন্ত্রণ জানাচ্ছে। দুই দলীয় বৃত্ত হওয়ার কারণে একদল আরেক দলের বিরুদ্ধে বলছেন। ফলে বিদেশীরা নানাভাবে ইন্টারেস্টেট হচ্ছেন। দ্বিতীয়ত: ভৌগলিক অবস্থান। আমরা এমন একটা জায়গায় অবস্থান করি, যার একদিকে বিশাল ভারত, আরেকদিকে চীন, অন্যদিকে আনবিক বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নিয়েছে রাশিয়া এবং ডিপ সী আধিপত্য বিস্তারে মরিয়া যুক্তরাষ্ট্র। ফলে সকলেই বাংলাদেশকে নিয়ে আগ্রহী হয়ে উঠছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো- তাদের এই আগ্রহী বাংলাদেশের জন্য কতটুকু সম্মানজনক? আমরা মনে করি এটা আসলে আমাদের জন্য সম্মানজনক নয়। কারণ তারা আমাদেরকে স্যাংসন দিয়েছে, ভিসানীতি করে ঘোষণা দিয়েছে। এগুলো আমাদের জন্য খুবই মানহানি কর। এমন পরিস্থিতি কেন তৈরি হলো। এর কারণ হিসেবে আমরা দায়ি করছি এই দুই রাজনৈতিক দলকে। যারা বার বার ক্ষমতায় আসছে, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য দুদলই দুদলের বিরুদ্ধে বিষোদগার করছে। বর্তমান সরকার দেশের অবকাঠামোগত যে উন্নয়ন করেছে, সেটি অত্যন্ত প্রশংসনীয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো এই উন্নয়ন করতে গিয়ে যদি অর্থ পাচার হয়ে যায়, লুটপাট হয়ে যায়, অথবা আমরা যদি কোন রাজনৈতিক সংঘাতের কারণে আমরা আমাদের স্বাধীন সার্বভৌমত্ব হারিয়ে ফেলি? এজন্য আমাদেরকে একটা ব্যালেন্স অফ পলিসি তৈরি করতে হবে। যেই পলিসিতে আমরা সকলেই একটা জায়গায় দাঁিড়য়ে জাতীয় ঐক্যমতে পৌঁছতে পারবো।
বাংলাদেশের সংবিধানে স্পষ্ট করে লেখা আছে যে, কোন রাজনৈতিক দলের কোন অঙ্গ সংগঠন থাকবে না, এমনকি প্রবাসেও এসবের কোন কমিটি করতে পারবে না। তাহলে আমাদের প্রশ্ন; দেশে-বিদেশে এই লীগ-ওই দল-এরা কারা? এসময় তিনি বলেন, বাংলাদেশের সকল রাজনৈতিক দল এটা মানে কিন্তু আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি এই বিধান মানে না? কেন মানেন না এই প্রশ্নও তোলেন তিনি। তিনি দাবি করেন, এই দুই দল ছাড়া সকল নিবন্ধন প্রত্যাশী রাজনৈতিক দলকে এই বিষয়ে মুচলেকা দিতে হয়, তাহলে এ জন্যই এই দুই দল সংবিধান মানছেন না।
এ সময় গণমুক্তি জোটের প্রধান উপদেষ্টা মোয়াজ্জেম হোসেন খান মজলিশ বলেন, বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে অসংখ্যবার মাওলানা ভাসানীকে নিয়ে প্রশংসা করেছেন। যিনি বঙ্গবন্ধুকে তৈরি করলেন তিনিও তো ফাউন্ডিং ফাদার। উনসত্তুরে এদেশের মানুষ গণ আন্দোলন করে শেখ মুজিবকে পাকিস্তানি কারাগার থেকে বের করে এনেছে। ৭০ এর নির্বাচনে আপামর জন সাধারণ তাকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত এবং সম্মানিত করেছ। সেই সুত্রেই কিন্তু শেখ মুজিবর রহমান এখন জাতির পিতা। আমরা তার সন্তান। রক্তের সম্পর্কের বাইরেও যে আত্মার সম্পর্ক শেখ মুজিবের সাথে বাঙ্গালীর, তা রক্তের সম্পর্ককেও হার মানাবে। শেখ হাসিনা হলেন, শেখ মুজিবর রহমানের সম্পদের উত্তরাধিকারি। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর উত্তরসুরী তো গোটা বাংলাদেশ। বাংলাদেশের মানুষই তাকে বঙ্গবন্ধু উপাধি দিয়েছে। শেখ হাসিনার পিতা এবং পরিবারের সদস্য এবং বেগম খালেদার স্বামী জিয়াউর রহমানের ট্রাজিক মৃত্যুর কারণেই কিন্তু জনগণ তাদের অলরেডী ৩ বার করে রাষ্ট্রক্ষমতায় বসিয়েছে। দেশ গঠনে, দেশের উন্নয়নে ব্যক্তি শেখ হাসিনা কিংবা ব্যক্তি বেগম খালেদা জিয়ার কি অবদান ছিলো সেটা ভাবার সময় এসেছে। এই ট্রাজিক মৃত্যুর কারণেই যে আমৃত্যু কেবল শেখ হাসিনা এবং বেগম খালেদা জিয়াই রাষ্ট্র গঠন করে যাবে, এর তো কোন বাঁধা ধরা নিয়ম নেই। মোয়াজ্জেম হোসেন খান মজলিশ বলেন, রাজনীতি হচ্ছে একটা কালেক্টিভ গেম। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমরা দেশ স্বাধীন করেছি, সেই আমাদেরি চোখের সামনে দেশটা বিপথে যাক-এটা আমরা চাই না। সেই কারণেই দ্বি-দলীয় রাজনীতির বাইরে অন্য দলের সমমনা মানুষ, সামাজিক-সাংস্কিৃতিক জোট ও রাজনৈতিক দলগুলো ঐক্যবদ্ধ হয়েছি। কারণ ঐক্যবদ্ধ শক্তি ছাড়া আসলে এই দুই দলের খপ্পর থেকে দেশকে বাঁচানো যাবে না। ঠিক এই কারণেই ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান স্বত্ত্বেও আমরা আমাদের ভয়েজ রেইজ করার জন্য একত্রিত হয়েছে। বর্তমানে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, এটা সংঘাতে রূপ নিতে পারে। আর এই সংঘাতের কারণের দেশের স্বাধীনতা এবং স্বার্বভৌমত্ত্ব হুমকির মুখে পড়তে পারে। এজন্য আমরা মনে করছি যে, গণতান্ত্রিক উপায়ে এটার একটা সমাধান বের করতে হবে। নির্বাচন আমরা চাই। সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে বর্তমান সরকারের কাছে আমাদের আবেদন থাকবে, যে আপনারা উদ্ভূত সব সমস্যার সমাধান করেন এবং সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি করেন।
গণতন্ত্র মানেটা কি? গণতন্ত্র ইজ নাথিং অ্যান আর্ট অফ কম্প্রোমাইজ। কাজেই আপোষহীন নেত্রী-এই শব্দটাই হলো আনডেমোক্রেটিক। সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য গণমুক্তিজোট তাদের দাবি তুলে ধরবে, জনগণকে সম্পৃক্ত করার জন্য অন্যান্য দলকেও আহ্বান করবো। একই অনুষ্ঠানে গণমুক্তি জোটের প্রধান সমন্বয়ক আবু লায়েস মুন্নাফ বলেন, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আসন্ন। সেই লক্ষ্যে আমরা ৩০০ আসনে প্রার্থী দেয়ার প্রসস্তুতি নিচ্ছি। সেই প্রেক্ষাপটে আমরা কাজ করছি। পৃথিবীতে ভালো মানুষের সংখ্যা কিন্তু অনেক বেশি। আর খারাপ মানুষের সংখ্যা অনেক কম। সংখ্যায় কম হলেও ব্যক্তি স্বার্থের কারণে এই খারাপ লোকগুলো আবার ঐক্যবদ্ধ। ফলে সাধারণ চোখে মনে হয় খারাপ লোকের সংখ্যা অনেক বেশি।
অপর দিকে ভালো মানুষগুলো কিন্তু মোটেও সংগঠিত নয়। আর সংগঠিত নয় বলেই ভালো মানুষগুলোকে আমরা খুঁজে পাচ্ছি না। গণমুক্তি জোটের উদ্দেশ্যই হলো- সেই সব রাজনৈতিক দল, সামাজিক-সাংস্কৃতিক জোট এবং ব্যক্তি মানুষকে একত্রিত করা, যা দেশের উন্নয়নে অবদান রাখতে চায়, দেশের স্বার্থে নিবেদিত হয়ে কাজ করতে চায়। আমাদের এ আহ্বানে প্রচুর সাড়া পেয়েছি আমরা। আলোচকরা বলেন, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বিরোধী দলগুলো সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবী জানাচ্ছে এবং বিভিন্ন ফর্মুলা তুলে ধরছে। গণমুক্তি জোটও সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবীর সাথে সম্পূর্ন একমত। সেই সাথে সুষ্ঠু নির্বাচনে যেসব বাধা রয়েছে তার বিরুদ্ধে গণ আন্দোলন গড়ে তুলতেও সংকল্পবদ্ধ। এ লক্ষ্যে তফসীল ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে সংসদ ভেঙ্গে দেয়া, মন্ত্রীসভা ছোট করা এবং মন্ত্রীসভায় বিরোধী দলগুলোর প্রতিনিধি যুক্ত করা, স্বরাষ্ট্র ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে সরাসরি নির্বাচন কমিশনের অধীনে আনাসহ ৩৯টি দাবি তুলে ধরেন।তিনিধি যুক্ত করা, স্বরাষ্ট্র ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে সরাসরি নির্বাচন কমিশনের অধীনে আনাসহ ৩৯টি দাবি তুলে ধরেন।