২৮ অক্টোবর ঘিরে নতুন শঙ্কা জামায়াতের মনে ‘শাপলা চত্ত্বর’!
* অনুমতি নয়, সহযোগিতা চেয়ে পুলিশকে চিঠি * সুইসাইডাল স্কোয়াড প্রস্তুত, দাবি গোপন সূত্রের # অনুমতি না দিলেও যে কোনো মূল্যে সমাবেশ বাস্তবায়ন করা হবে অধ্যাপক মুজিবুর রহমান, ভারপ্রাপ্ত আমির, জামায়াতে ইসলামী # নাগরিকের জীবন ও মালামালের ক্ষতির চেষ্টা করলে আইনগত পদক্ষেপ কমান্ডার খন্দকার আল মঈন, পরিচালক, র্যাব # কেউ রাজপথে বসে পড়তে চাইলে হার্ডলাইনে যেতে বাধ্য হব হাবিবুর রহমান, কমিশনার, ডিএমপি
২৮ অক্টোবর নয়াপল্টনে মহাসমাবেশ করবে বিএনপি। দলের জ্যেষ্ঠ নেতৃবৃন্দের ভাষ্য, ওই দিন থেকেই সরকার পতনের শেষ ধাপের আন্দোলন শুরু। আর বিএনপিকে প্রতিরোধে ওই দিন স্মরণকালের সর্বাধিক লোক সমাগম ঘটিয়ে শান্তি সমাবেশ করবে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ। সমাবেশের আগে দুই পক্ষের মন্তব্য-পাল্টা মন্তব্য ও গ্রেপ্তার-ধরপাকড়ের মধ্যে ‘কী হতে যাচ্ছে ২৮ অক্টোবর?’- এই প্রশ্নের উত্তর জানতে কৌতুহলি দৃষ্টিতে দিনটির অপেক্ষা গুণছে দেশবাসী। এমন পরিস্থিতিতে ৫ দিন আগে রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়িয়ে দিল জামায়াতে ইসলামী। ২৩ অক্টোবর দলটির পক্ষ থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ২৮ অক্টোবর তারাও রাজধানীতে মহাসমাবেশ করবে। স্থান নির্ধারণ করেছে আলোচিত সেই মতিঝিলের শাপলা চত্ত্বর। ২০১৩ সালের ৫ মে ওই শাপলা চত্ত্বরে হেফাজতে ইসলামের হঠাৎ সড়ক না ছাড়ার ঘোষণা এবং তাদের ওপর আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পদক্ষেপ নিয়ে বিশ^জুড়ে আলোচনা-সমালোচনা রয়েছে। ফলে, সব ছাড়িয়ে মহাসমাবেশের দিনটিকে ঘিরে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে জামায়াত।
প্রচলিত আছে, আন্দোলন জমানোর ক্ষেত্রে জামায়াতের সঙ্গে কোন দলই পেরে উঠে না। ফলে, দলটির হঠাৎ মহাসমাবেশের ঘোষণা রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ সামনে এনেছে। এরই মধ্যে কথা উঠেছে, বিএনপির একদফা আন্দোলন সফল করতে জামায়াতকে দরকার। ২৮ অক্টোবরের আওয়ামী লীগ-বিরোধী আন্দোলনে বিএনপিকে সর্বাত্মক সহযোগিতার অংশ হিসেবে তারাও কর্মসূচির ডাক দিয়েছে। যদিও, বিএনপির সঙ্গে জামায়াতের জোট আছে কি-না, এ নিয়ে দীর্ঘ সময় জুড়ে আলোচনা থাকলেও একপর্যায়ে বিএনপি আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়ে জোট ভেঙে দেয়। এরপর দুই দলের মাঝে দূরত্ব আরো বেড়ে যায়। তবে পুনরায় ক্ষমতার স্বাদ পাওয়ার আকাক্সক্ষা ও দু’দলের আন্দোলনের দাবি একই।
এদিকে, জামায়াতে ইসলামীর অভ্যন্তরীণ অসমর্থিত সূত্রে জানা গেল আরো ভয়ঙ্কর তথ্য। সূত্র জানিয়েছে, বিএনপি ও অন্যান্য দল যে ধারায় কর্মসূচি করছে তাতে সরকার পতনের মত কঠিন দাবি কোনদিনও আদায় হবে না। যে কারণে জামায়াত মোক্ষম একটি সময়ের অপেক্ষায় ছিল। ২৮ অক্টোবর থেকে সরকারবিরোধী আন্দোলনে রাজপথের উত্তেজনা চরমে উঠবে বলে ধর্মীয় রাজনৈতিক দলটির ধারণা। এই সময়ে নিজেদের শক্তি, সামর্থ্য, কৌশল সবই সর্বোচ্চ পর্যায়ে প্রয়োগ করতে পরিকল্পনা করছে জামায়াত। এমনকি দাবি আদায় না হলে রাজপথে আত্মাহুতি দেওয়ার মত ‘সুইসাইডাল স্কোয়াড’ও প্রস্তুত করা হয়েছে। যদিও এসব তথ্য দেওয়া সূত্র পরিচয় প্রকাশ না করার শর্ত দিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, একই দিনে বিএনপির কর্মসূচির স্থান থেকে মাত্র ২ থেকে আড়াই কিলোমিটারের মধ্যে গুলিস্তানে শান্তি ও উন্নয়ন মহাসমাবেশ করবে আওয়ামী লীগ। অন্যদিকে, শাপলা চত্বরে মহাসমাবেশের করবে জামায়াতে ইসলামী। দেশের বড় তিনটি দলের পাল্টাপাল্টি এমন কর্মসূচি থাকার ফলে সংঘর্ষ ও সহিংসতার সম্ভাবনা দেখছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও বিশ্লেষকরা। পুলিশের সন্দেহ, বিএনপি শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি করলেও জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করতে পারে।
ডিএমপির বিশ্বস্ত একটি সূত্র জানিয়েছে, ২৮ অক্টোবর নয়াপল্টনে বিএনপির মহাসমাবেশ ঘিরে হার্ডলাইনে রয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। ২৮ অক্টোবর পর্যন্ত ডিএমপির সব পর্যায়ের পুলিশের ছুটি বাতিল ও ছুটি নিতে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।
অপরদিকে, জামায়াতের শাপলা চত্ত্বরে মহাসমাবেশ করতে চাওয়া নিয়ে রাজনীতির মাঠে আরো এক ‘শাপলা চত্ত্বর’ কাণ্ডের আভাস পাচ্ছে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, ২০১৩ সালের ৫ মে ঘটা শাপলা চত্ত্বরের হেফাজতকাণ্ড একটি ইতিহাস। হেফাজতে ইসলামও ছিল ধর্মীয় সংগঠন। আর জামায়াতের বিরুদ্ধে রাজনীতির নামে জ¦ালাও-পোড়াও-সহিংসতার অভিযোগ বহু পুরানো। বর্তমানের রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে ১০ বছর পর সেই শাপলা চত্ত্বরকে জামায়াতের কর্মসূচির জন্য বেছে নেওয়াকে কোনভাবেই স্বাভাবিক নজরে নিতে পারছেন না তারা। মহাসমাবেশ থেকে শাপলা চত্ত্বরেই মরণ কামড় দিতে পারে তারা।
এদিকে, জামায়াতের পক্ষ থেকে ডিএমপিকে দেওয়া চিঠির ভাষা নিয়েও কথা হচ্ছে। নিয়ম অনুযায়ী- সমাবেশ করার জন্য পুলিশের কাছে অনুমতি চাইবে যে কোন সংগঠ। কিন্তু সমাবেশ সফল করতে প্রশাসনের অনুমতি না চেয়ে সহযোগিতা চেয়েছে জামায়াত। একই সঙ্গে দলের নেতাকর্মী ও দেশবাসীকে আহ্বান জানিয়েছে সমাবেশে যোগ দিতে। অর্থাৎ, অনুমতি পাক আর না-ই পাক, তারা সমাবেশ করবেই।
জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত আমির মুজিবুর রহমান স্বাক্ষরিত গণমাধ্যমে পাঠানো বিবৃতিতে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রধান দায়িত্ব হচ্ছে রাজনৈতিক দলসমূহের সভা-সমাবেশ ও মিছিল শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠানে সহযোগিতা করা। মিছিল, মিটিং, সভা-সমাবেশ প্রত্যেক নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার। এ অধিকার যাতে তারা প্রয়োগ করতে পারে, সে ব্যাপারে সহযোগিতা করা পুলিশের দায়িত্ব। তাতে বাধা দেওয়া পুলিশের দায়িত্ব হতে পারে না। কিন্তু আমরা লক্ষ্য করছি বিগত সময় ৫০ থেকে ৬০ বারেরও অধিকবার দেশের বিভিন্ন স্থানে সমাবেশ করার সহযোগিতা চেয়ে আবেদন করা হলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে সাড়া পাওয়া যায়নি। এটি সম্পূর্ণ অগণতান্ত্রিক ও অসাংবিধানিক। এই ভূমিকা থেকে বিরত থাকার জন্য কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি আহ্বান জানাই। কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ ২৮ অক্টোবর শান্তিপূর্ণ মহাসমাবেশে সুশৃঙ্খলভাবে সমবেত হয়ে এক দফা দাবি কেয়ারটেকার সরকার ব্যবস্থা বাস্তবায়নের আন্দোলনকে বেগবান করার আহ্বান জানিয়ে বিবৃতিতে বলে, সরকারের কোনো ধরনের উসকানি, অসাংবিধানিক ও গণতন্ত্রবিরোধী অপতৎপরতায় বিভ্রান্ত না হওয়ার জন্য নির্বাহী পরিষদ দেশবাসী এবং সংগঠনের সর্বস্তরের জনশক্তির প্রতি আহ্বান জানাচ্ছে।
জামায়াতে ইসলামীর ভারপ্রাপ্ত আমির অধ্যাপক মুজিবুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, সমাবেশ সফল করতে ইতোমধ্যে বিভাগ, নগর-মহানগর, থানা ও ইউনিটসহ সকল স্তরে বৈঠক করা হয়েছে। প্রশাসন অনুমতি না দিলেও ২৮ অক্টোবর যে কোনো মূল্যে সমাবেশ বাস্তবায়ন করা হবে। এমনকি কোনো কারণে যদি মতিঝিলে জায়গা না পাই, তবুও আশপাশের যে কোনো এলাকায় সমাবেশ করা হবে।
পুলিশের গোয়েন্দা বিশেষ শাখার সূত্রে জানা গেছে, গত ১৩ থেকে ২৩ অক্টোবর পর্যন্ত বিএনপি-জামায়াতের প্রায় ১৫ শতাধিক নেতাকর্মীকে সারা দেশে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে শুধু ১৭ অক্টোবর একদিনেই সারা দেশ থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে ২২৯ জনকে। সূত্রের মতে, ওই দিন শুধু বিএনপি নেতাকর্মী নয়, জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরাও মাঠে নামার সম্ভাবনা তারা আগে থেকেই করেছে। ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর নিহত নেতাকর্মীদের স্মরণে জামায়াত কর্মসূচি দিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছিল। সমাবেশের দিন সহিংসতা প্রতিরোধসহ ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরে হেফাজতের মতো যাতে নেতাকর্মীরা বসে যেতে না পারে সেদিক বিবেচনা করে মাঠ পর্যায়ের পুলিশ সতর্ক থেকে কাজ করবে। তারা বসে পড়ার চেষ্টা করলে সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগের সিদ্ধান্ত নিতে পুলিশকে বিশেষ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে র্যাবের পরিচালক (লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইং) কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, শান্তিপূর্ণ সভা-সমাবেশ করার অধিকার সব দলের রয়েছে। তবে এসব কার্যক্রমের আড়ালে সাধারণ নাগরিকের জীবন ও মালামালের ক্ষতির চেষ্টা যদি কোনো রাজনৈতিক দল করে থাকে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ নিতে আমরা বাধ্য হব। এ ছাড়া এসব কর্মসূচি ঘিরে গুজবসহ অপপ্রচার ঠেকানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান বলেন, ২৮ অক্টোবর মহাসমাবেশকে ঘিরে পুলিশের পক্ষ থেকে প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। রাজধানীতে যে কোনো শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ, আন্দোলন, মিছিল-মিটিং করার অধিকার সবার রয়েছে। এসব কার্যক্রমে পুলিশ নিরাপত্তা দেবে। কিন্তু যদি এর আড়ালে কেউ সহিংসতা করার চেষ্টা করে কিংবা ঢাকার রাজপথ দখল করে বসে পড়তে চায়, তা হলে আমরা সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তার স্বার্থে হার্ডলাইনে যেতে বাধ্য হব।