হঠাৎ সচিবদের সভা

সরকারের হৃদপিণ্ড বাংলাদেশ সচিবালয়। যেখান থেকে সরকার পরিচালিত হয়। সারাদেশের প্রশাসনকে নেতৃত্ব দিয়ে থাকে সচিবালয়। সরকারের পরিবর্তন হলেও সরকারের সচিবরা বহাল থাকেন। তারা সরকারের মন্ত্রীদের নানা নির্দেশ পালন করে দেশকে এগিয়ে নিতে সহায়তা দিয়ে থাকেন। তাদের এক সিদ্ধান্ত বা নির্দেশনা দেশে যে কোন সময় যা কিছু ঘটাতে পারে। বর্তমান সরকারের শেষ সময়ে এসে সচিবদের হঠাৎ বৈঠক নিয়ে সরকারের ভেতরে বাইরে নানা আলোচনা ডালপালা মেলতে শুরু করেছে। কারণ দেশে প্রধানমন্ত্রী অনুপস্থিত। তিনি দেশের বাইরে সফরে রয়েছেন। তার অনুপস্থিতিতে সচিবরা কি ঘটাতে চাচ্ছে তাই এখন আলোচনার বিষয়। নানা মহলে দিনভর নানা আলোচনা সমালোচনা অব্যহত রয়েছে।

সরকারের মেয়াদ আর মাত্র ৪-৫ মাস। বিরোধী দলগুলো সরকার পতনে আন্দোলনে রয়েছে। আগামী ২৭ জুলাই রাজধানীতে সরকারী দল আওয়ামী লীগ ও বিরোধী দল বিএনপি কাছাকাছি স্থানে সমাবেশ ডেকেছে। তাই নিয়ে দুই দলেই উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। তার মধ্যে সচিবদের বৈঠক ডাকাকে ভালো চোখে দেখছে না কেউ।

সরকারের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা নিজেকে প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সচিবালয়ে সরকারের পক্ষের নয় সব সচিব। বিরোধীদলের সমর্থক সচিবদের সংখ্যা কম নয়। তারা সুযোগ বুঝে নিজেদেরকে সংগঠিত করতে পারে। প্রধানমন্ত্রী দেশে না থাকা অবস্থায় সচিবদের বৈঠকের হেতু কি জানা দরকার।

তবে আওয়ামী লীগের সিনিয়র একজন নেতা বলেন, সরকার সতর্ক রয়েছে বিরোধীদের সম্পর্কে। প্রধানমন্ত্রী দেশে না থাকা অবস্থায় সচিবদের দায়িত্ব অনেক বেশি। তারা যদি দেশের ক্ষতির জন্য কিছু করে থাকে তাদেরকে কঠিন শাস্তির আওতায় আনা হবে। দেশের বিরুদ্ধে কেউ যড়যন্ত্র করে টিকতে পারবে না।

জানা গেছে,হঠাৎ করেই সরকারের সব সিনিয়র সচিব ও সচিবদের নিয়ে বৈঠকে করেছেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব মাহবুব হোসেন। গতকাল সোমবার সকাল ১০টায় সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের সভাপতিত্বে বৈঠকটি শুরু হয়। এ ধরনের বৈঠকের আগে নির্ধারিত এজেন্ডা দিয়ে সচিবদের চিঠি দেয়া হয়। এবার সে রকম কোনো এজেন্ডা দেয়া হয়নি। প‚র্ব ঘোষণা ছাড়াই স্বল্প সময়ের নোটিশে সোমবার সব সচিবদের নিয়ে বৈঠকটি শুরু হয়। শেষ হয় বেলা ১২ টার দিকে।

বৈঠকে অংশ নেয়া নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন সচিব বলেন, সচিবদের নিয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের এমন বৈঠক নিয়মিত হয়ে থাকে। আর সে বৈঠকের নির্ধারিত আলোচ্য বিষয় থাকে। সে আলোচ্য বিষয় উল্লেখ করে বৈঠকের আগে প্রত্যেক সচিবকে চিঠি দেয়া হয়। তবে আজকের এই বৈঠকের কোনো এজেন্ডা জানানো হয়নি।

তিনি আরও বলেন, বিগত বৈঠকের আলোচনার পাশাপাশি ম‚ল আলোচনা ছিলো নির্বাচনকে ঘিরে। আলোচনা হয়েছে দেশজুড়ে চলমান মেগা প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের অধীনে দফতর- সংস্থারগুলোর শ‚ন্য পদ প‚রণের অগ্রগতির বিষয়েও।

নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে জানা গেছে, এসব অনির্ধারিত আলোচনার পাশাপাশি বৈঠকে উপস্থিত সচিবদের কাছ থেকে তাদের পরামর্শও চাওয়া হয়েছে। তাদের মতামতও নেয়া হয় বৈঠকে। পাশাপাশি সচিবদের চাওয়া-পাওয়ার কথা শোনেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব।

জানা যায়, প্রশাসনিক উন্নয়ন সংক্রান্ত সচিব কমিটি’র বৈঠক মাসের বিভিন্ন সময়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয়। এই মাসে এ সংক্রান্ত বৈঠকের তারিখ নির্ধারণ ছিল মঙ্গলবার । হঠাৎ সেই তারিখ পরিবর্তন করে একদিন এগিয়ে সোমবার করা হলো। সেই সঙ্গে বৈঠকে সব মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ও সচিবদের বিশেষ আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।

প্রশাসনিক উন্নয়ন সংক্রান্ত সচিব কমিটির বৈঠকে মন্ত্রিপরিষদ সচিব, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবসহ ১৫ জন উপস্থিত থাকেন। সেই সঙ্গে বৈঠকের এজেন্ডা সংক্রান্ত মন্ত্রণালয়ের সচিবরা আমন্ত্রণ পান।

এবারের বৈঠকের জন্য দেয়া চিঠিতে কমিটির সদস্যদের বাইরে প্রস্তাবক মন্ত্রণালয়ের ৩ সচিবকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে রোববার সংশোধিত চিঠিতে বিশেষ আমন্ত্রণে সব সিনিয়র সচিব ও সচিবদের উপস্থিত থাকতে বলা হয়েছে। তবে ছিলো না কোনো নির্ধারিত আলোচ্য বিষয়।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব মো. মাহবুব হোসেন বলেছেন, জাতীয় নির্বাচনের আগে প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দু বাংলাদেশ সচিবালয়ে সিনিয়র সচিব ও সচিবদের নিয়ে এক সভা আয়োজন নিয়ে বিশেষ কৌত‚হল তৈরি হয়েছিল। তবে সেই সভা বিশেষ কোনো সভা ছিল না।

গতকাল সোমবার (২৪ জুলাই) সচিবালয়ে ছয় নম্বর ভবনে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে এই সভা শুরু হয়। সভা শেষে বেলা সোয়া ১টার দিকে বেরিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখে পড়েন মন্ত্রিপরিষদ সচিব। সভায় তিনি সভাপতিত্ব করেন।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, এটি বিশেষ কোনো মিটিং না। আমরা যে নিয়মিত মিটিং করি সেই মিটিং। এটি আগামীকাল, অথাৎ আজ মঙ্গলবার ছিল, ওই সময় আমার অন্য একটি প্রোগ্রাম পড়েছে। সেজন্য মিটিং একদিন আগে করেছি।

আজকের মিটিংয়ে কোনো নির্দেশনা ছিল কি না- জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের তরফ থেকে বিশেষ কোনো নির্দেশনা ছিল না। আমরা এই মিটিংয়ে সাধারণত যে জিনিসটা আলোচনা করি সেটাই ছিল। আমাদের অনেকগুলো প্রস্তাব ছিল। আমাদের কিছু নিয়োগবিধি ছিল, অর্গানোগ্রাম অ্যাপ্রæভ করার বিষয় ছিল সেগুলো আমরা আলোচনা করেছি। আমাদের যে সরকারি হাসপাতাল ছিল সেই হাসপাতালের নিয়োগবিধিটা আমরা করে দিয়েছি।

নির্বাচনের আগে মাঠ পর্যায়ে প্রশাসন কীভাবে কাজ করবে সে বিষয়ে কোনো নির্দেশনা ছিল কি না- প্রশ্নে তিনি আরও বলেন, না, না। এরকম কিছু না। স্কুল সরকারিকরণের বিষয় ছিল কি না- জবাবে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, সেটি আমাদের প্রতিটি মিটিংয়ে সাবজেক্ট থাকে।

প্রশাসনিক উন্নয়ন সংক্রান্ত সচিব কমিটির বাইরেও কয়েকজন সচিব ছিলেন- এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ওইখানে আমরা কয়েকটা বিষয় আলোচনা করেছি। সেটি হচ্ছে প্রকল্প বাছাই করার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক যে উইন্ডোগুলো তৈরি হচ্ছে সেখানে সচিবরা যেন একটু বেশি নজর দেন সেই বিষয় নিয়ে কথা হয়েছে।

সচিব কমিটি এবং প্রশাসনিক উন্নয়ন সংক্রান্ত সচিব কমিটির সভা ছিল বলে অ্যাজেন্ডা থেকে জানা গেছে।

তিনি বলেন, আমাদের তরফ থেকে বিশেষ কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। মিটিংয়ে সাধারণত যেসব জিনিস আলোচনা করি, সেটা আলোচনা করেছি। অনেকগুলো প্রস্তাব ছিল, কিছু নিয়োগবিধি ছিল, অর্গানোগ্রাম অনুমোদন করার বিষয় ছিল, সেগুলো আমরা করেছি। সরকারি হাসপাতালের নিয়োগবিধি আমরা করে দিয়েছি। শিল্প মন্ত্রণালয়ের একটি প্রস্তাব আমরা না করিনি, আমরা বলেছি এটি আইনের মাধ্যমে যেতে হবে। আইন প্রণয়নের পরামর্শ দিয়েছি।

নির্বাচন নিয়ে কোনো আলোচনা হয়েছে কি না, জানতে চাইলে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, এ সভায় এটা নিয়ে আলোচনা হয় না। আলাদা কোনো সচিবসভা করিনি।
মাঠ প্রশাসন নির্বাচনের আগে কীভাবে কাজ করবে, সে বিষয়ে আলোচনা হয়েছে কি না, এ প্রশ্নে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, ‘না, না, না। এ রকম কোনো বিষয় নয়।’
আলাদা করে সচিবসভা হয়েছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘না, না, না। আমাদের সাধারণ সভা হয়েছে।’

মাহবুব হোসেন বলেন, প্রকল্প বাছাই করার ক্ষেত্রে, প্রকল্পে অর্থায়নে যে ইন্টারন্যাশনাল উইন্ডোগুলো তৈরি হয়েছে, সেখানে যেন সচিবরা একুট বেশি নজর দেন, সে বিষয় নিয়ে কথা হয়েছে। এটি সচিবসভা নয়, আলাদা সচিবসভা নয়। আমাদের যে কমিটি, সে কমিটির সভা।