স্কাউটিংয়ের নাম ভাঙিয়ে রেলের জায়গা দখল!

দখল-নৈরাজ্যে ছেয়ে গেছে বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চল। অভিনব কায়দায় স্কাউটিং কার্যক্রমের নাম ভাঙিয়ে গুটিকয়েক অসাধু ব্যক্তি লুটেপুটে খাচ্ছে রেলের জায়গা। হাতিয়ে নিচ্ছে লাখ লাখ টাকা।

স্কাউটের বিভিন্ন গ্রুপের জন্য বরাদ্দকৃত জায়গায় স্কাউটিং কার্যক্রম পরিচালনা করার কথা থাকলেও বিগত একযুগেরও বেশি সময় ধরে ওইসব স্থানে পুরোপুরি বন্ধ। শুধুমাত্র জায়গার দখলদারিত্ব ধরে রাখতে কাগজে কলমে চলে স্কাউটিং। এরই মধ্যে বরাদ্দকৃত জায়গাসহ তার আশেপাশে আরও বেশকিছু জায়গা দখল করে তৈরি করা হয়েছে দোকানপাঠসহ অন্যান্য স্থাপনা। যা রেলওয়ে সংবিধানের বর্হীভূত।

চট্টগ্রামের সিআরবি এলাকার গোয়াল পাড়ায় অবস্থিত আশির দশকে প্রতিষ্ঠিত ‘সৃজনী রেলওয়ে মুক্ত স্কাউট গ্রুপ’ ও ‘আলোড়ন রেলওয়ে মুক্ত স্কাউট গ্রুপ’। প্রথমে ক্লাব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলেও রেলের জায়গায় উচ্ছ্বেদ ঠেকাতে সে সময় স্কাউট গ্রুপের রেজিস্ট্রেশন নেয় তারা। এরপর স্কাউটার নজরুল আজাদের নেতৃত্বে বহু বছর চলে স্কাউটিং। তবে বিভিন্ন সমস্যার কারণে হুট করেই বন্ধ হয়ে যায় স্কাউটিং কার্যক্রম। এরপর এক যুগেরও বেশি সময় ধরে এই দুটি দলের জন্য রেল কর্তৃক বরাদ্দকৃত জায়গায় চলে ভিন্ন কার্যক্রম। সেখানে দোকানপাঠসহ অন্যান্য স্থপনা তৈরি করে বছরের পর বছর হাতিয়ে নিয়েছে লাখ লাখ টাকা।

সূত্রে জানা গেছে, ‘সৃজনী রেলওয়ে মুক্ত স্কাউট গ্রুপ’ বর্তমানে এনায়েত নামের একজনের দখলে আছে। স্কাউটিংয়ের সাথে সম্পৃক্ত না হয়েও এনায়েত ‘সৃজনী রেলওয়ে মুক্ত স্কাউট গ্রুপের’ সেক্রেটারি। তিনি দীর্ঘ বছর ধরে রেলওয়েতে চাকরি করেন।

সূত্রে আরও জানা যায়, চট্টগ্রামের পাহাড়তলী এলাকার এক্স-ই-এন কলোনীতে অবস্থিত আরও একটি স্কাউট গ্রুপের নামে। ওই স্কাউট গ্রুপের নাম ‘হিলফুল ফুজুল রেলওয়ে মুক্ত স্কাউট গ্রুপ’। যার রেজিস্ট্রেশন নং- পিআরএস ০৮। ‘হিলফুল ফুজুল রেলওয়ে মুক্ত স্কাউট গ্রুপটি’ বর্তমানে বাবুল নামের একজনের দখলে রয়েছে।

‘হিলফুল ফুজুল রেলওয়ে মুক্ত স্কাউট গ্রুপের’ সিনিয়র রোভার মেট কিশোর দাশ দৈনিক দেশ বর্তমানকে বলেন, বাবুল দীর্ঘদিন ধরে আমাদের জায়গাটি দখল করে রেখেছে। রেল একটা ভালো কাজের জন্য জায়গাটি বরাদ্দ দিলেও বাবুল নেশার আড্ডা বানিয়ে দিয়েছে। রাত-বিরাতে চলে ইয়াবা-গাজাসহ অন্যান্য নেশা পানের হিড়িক।

বাংলাদেশ স্কাউটস রেলওয়ে অঞ্চলের ১৪টি জেলার মধ্যে চট্টগ্রাম রেলওয়ে জেলা অন্যতম। তবে এই অন্যতম শুধু কাগজে কলমেই। ব্যবহারিক অর্থে গত ৫ বছরের বেশি সময় ধরে বন্ধ জেলাভিত্তিক বিভিন্ন কার্যক্রম।

খবর নিয়ে জানা যায়, দেড় বছরের বেশি সময় আগে গত হয়েছে জেলা কমিটির মেয়াদ। তারপরেও কোনো এক অদৃশ্য শক্তির বলোয়ে জেলা সম্পাদক পদে নিয়োজিত আছেন বাংলাদেশ রেলওয়েতে কর্মরত নাজমুল হুদা।

মুঠোফোনে যোগাযোগ হয় জেলা সম্পাদক নাজমুল হুদার সাথে। দীর্ঘবছর জেলা সম্পাদক পদে নিয়োজিত নিয়োজিত থাকার পরও জেলার এমন বেহাল অবস্থা নিয়ে তাকে প্রশ্ন করা হলে তিনি এর কোনো সঠিক জবাব দিতে পারেননি। নিজের দায় অস্বীকার করে চাপানোর চেষ্টা করেন অন্যদের ওপর।

এসব বিষয়ে বিস্তারিত জানতে রেলওয়ের সাবেক কর্মকর্তা ও প্রবীন স্কাউটার নজরুল আজাদের সাথে কথা হলে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি দৈনিক দেশ বর্তমানকে বলেন, স্কাউটিংয়ে চট্টগ্রাম রেলওয়ে জেলার অবস্থা অত্যন্ত নাজুক! গত চার বছরের বেশি সময় ধরে এই জেলার কোনো বাস্তব কার্যক্রম নেই। পূর্ণাঙ্গ নির্বাহী কমিটির একটি সভাও হয়েছে কিনা আমার জানা নেই।

তিনি আরও বলেন, চট্টগ্রাম রেলওয়ে জেলা স্কাউট ভবনের অবস্থা সোচনীয়। অসত্য রিপোর্ট ও কাগজে কলমে চলছে স্কউটিং। কারও কোনো নজরদারি নেই।

এই সকল অনৈতিক কর্মকাণ্ডের পেছনে কে বা কারা দায়ী এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কারা আবার, যে বা যারা জেলার দায়িত্বে দীর্ঘদিন যাবত বসে আছেন তারা। তবে তিনি সরাসরি কারও নাম উল্লেখ করেননি।

হতাশ কণ্ঠে নজরুল আজাদ বলেন, একসময় রেলওয়ে অঞ্চলের নেতৃত্ব দানকারী চট্টগ্রাম রেলওয়ে জেলা এখন আক্ষরিক অর্থে ‘কাগুজে বাঘ’।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন স্কাউটার বলেন, এমন একজন ব্যক্তি জেলার দায়িত্বে আছেন যার জেলা পরিচালনার কোনো যোগ্যতাই নেই। আর এ কারণেই চট্টগ্রাম রেলওয়ে জেলার এই বেহাল দশা।

বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলি ও চট্টগ্রাম রেলওয়ে জেলার সভাপতি আবু জাফর মিয়া বলেন, আমি সরাসরি স্কাউটিংয়ের সাথে সম্পৃক্ত নই। পদাধিকার বলে আমাকে জেলার সভাপতি করা হয়েছে। তবে আমি এই সকল ব্যাপারে অবগত ছিলাম না।

তিনি আরও বলেন, এখন যেহেতু জেনেছি অবশ্যই এর একটা ব্যবস্থা করব। দখলকৃত জায়গা এবং অন্যান্য স্থাপনা উচ্ছ্বেদের ব্যবস্থা করব।

বাংলাদেশ স্কাউটস রেলওয়ে অঞ্চলের উপ-পরিচালক লতিফ উদ্দীন আহমদ দৈনিক দেশ বর্তমানকে বলেন, চট্টগ্রাম রেলওয়ে জেলায় স্কাউটিং কার্যক্রম শূণ্যের কোঠায় নেমে গেছে বললেই চলে। আমরাও এই জেলা নিয়ে বেশ চিন্তিত। আমরা অতিদ্রুত একটা পরিদর্শন টিম চট্টগ্রাম রেলওয়ে জেলায় পাঠাবো এবং যাবতীয় ব্যবস্থা গ্রহনণ করব।