সেপ্টেম্বরে সংলাপের সম্ভাবনা

আগামী নির্বাচন নিয়ে সংলাপ হবে কি হবে না এ নিয়ে বিতর্ক চলছেই। বিতর্কের কখন অবসান হবে কেউ জানে না। অথচ আগামী নির্বাচনের সময় দ্রুত এগিয়ে আসছে। আগামী অক্টোবরেই নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করার কথা রয়েছে নির্বাচন কমিশনের রোডম্যাপে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির শীর্ষনেতারা প্রতিদিন তর্ক-বিতর্ক অব্যাহত রেখেছেন। রাজনৈতিক সচেতন মানুষ তাকিয়ে আছে বড় দুই দল কবে একসাথে বসে মীমাংসা করছে রাজনৈতিক পরিস্থিতির। চেষ্টা করছেন কূটনৈতিকরাও। তবে সেপ্টেম্বরে সংলাপ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যেহেতু আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, বিএনপির সাথে সংলাপের এখনো সময় আসেনি। হয়ত সরকার এখনই সংলাপ না করে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগ মুহূর্তকেই উপযুক্ত মনে করছেন। অনেকে আশঙ্কা করছেন নির্বাচনকে ঘিরে অতীতের মতো আবারও জ্বালাও পোড়াও হবে কি না।

দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে রাজপথের আন্দোলনে রয়েছে বিএনপি। সরকারের পদত্যাগ ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে আগামী নির্বাচন আয়োজনই তাদের মূল দাবি। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের বক্তব্য সংবিধান অনুযায়ী আগামী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচনকালীন সরকারে থাকবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার। দুই দলের দুই অবস্থানকে এক করতেই কূটনীতিকেরা কয়েকমাস যাবত দুই দলের শীর্ষ নেতাদের সাখে শলাপরামর্শ অব্যহত রেখেছেন। এর মধ্যেই গত ৬ জুন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের জনসভায় আওয়ামী লীগের বর্ষীয়ান নেতা ও সাবেক মন্ত্রী ১৪ দলের সমন্বয়ক আমির হোসেন আমু বলেছেন, জাতিসংঘের প্রতিনিধির উপস্থিতিতে বিএনপির সাথে সংলাপ হতে পারে। সরকার বিএনপির সাথে আলোচনায় রাজি।

আমির হোসেন আমুর এ বক্তব্যে রাজনৈতিক অঙ্গনে একটা আলোড়নের সৃষ্টি করে। রাজনৈতিক নেতারা নড়েচড়ে বসেন। অনেককে মন্তব্য করতে শোনা গেছে, কূটনীতিকদের চাপে পড়ে সরকার ও বিরোধী পক্ষ এক টেবিলে বসতে যাচ্ছে। একটা সমাধানের পথ বেরিয়ে আসবে। আমুর বক্তব্যের প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির প্রভাবশালী সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, কে কোথায় কি বললেন তা নিয়ে তো আলোচনার কিছু নেই। সরকার চিঠি দিলে আমরা তার জবাব দেবো।

সরকার ও বিরোধী দলের এমন সব বক্তব্যে রাজনৈতিক মহলকেও বেশ উজ্জীবিত মনে হয়েছে। কেউ কেউ মন্তব্য করেছেন, রাষ্ট্রপতি কি সংলাপের আয়োজন করবেন নাকি প্রধানমন্ত্রী ? কে আমন্ত্রণ জানাবেন। পরদিন পত্রিকায় বড় বড় হেডিং করে ছাপা হয় আমুর সেই বক্তব্য। কিন্তু পত্রিকার সংবাদকে অস্বীকার করেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদসহ আরও নেতৃবৃন্দ। ৭ জুন আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর সকালে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে দলীয় সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে সাংবাদিকদের কাছে আগের দিনের বক্তব্যের ব্যাখা দিয়ে সংলাপের কথাটা অস্বীকার করেন আমির হোসেন আমু। তিনি বলেন, আমি ২০১৩ ও সংলাপের কথা বলেছি। বিএনপি সংলাপে আসেনি। তাদের সাথে আর কিসের সংলাপ।

তবে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ও সড়ক ও সেতুমন্ত্রী ওবাদুল কাদের বলেছেন,আমাদের দেশে এমন কোনও রাজনৈতিক সংকট হয়নি যে জাতিসংঘের এখানে ইন্টারফেয়ার করতে হবে। জাতিসংঘ মধ্যস্থতা করবে এই রকম কোনও সংকট স্বাধীন বাংলাদেশে হয়নি।

ওবায়দুল কাদের বলেন, বিএনপির সঙ্গে আমাদের আলোচনার বিষয়ে এখনও কোনও সিদ্ধান্ত নিইনি। আমাদের দেশে আমরা আলোচনা করবো, এটা নিজেদের সমস্যা, নিজেরাই সমাধান করবো। বিগত নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী সংলাপের আহ্বান করেছিলেন। বিএনপি সেই সংলাপে আসেনি। সময় হোক আমরা সংলাপের আহবান করব।

গত শক্রবার ঢাকায় একটি অনুষ্ঠানে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ বলেছেন, আমরা কোনো সংলাপের কথা বলিনি। বিএনপির সঙ্গে সংলাপের প্রয়োজনীয়তা আছে বলে আমরা মনে করি না।

তিনি বলেন, আমির হোসেন আমু সংলাপ নিয়ে যা বলেছেন, পরদিনই তিনি সে বিষয়ে ব্যাখ্যা দিয়েছেন। প্রথমে তিনি যা বলেছিলেন সেটি তার নিজের অভিমত ছিল। আমাদের দল আওয়ামী লীগ, সরকার বা ১৪ দল- কারও অভিমত ছিল না।

‘আন্দোলন থেকে দৃষ্টি অন্যদিকে নিতে সরকার সংলাপের কথা বলছে’- বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের এমন বক্তব্যের বিষয়ে তথ্যমন্ত্রী বলেন, যারা নির্বাচন ভণ্ডুল করতে চায়, নির্বাচন প্রতিহত করতে চায়, তাদের সঙ্গে সংলাপ করে কোনো ফায়দা নাই। বাংলাদেশে নির্বাচন সংবিধান অনুযায়ী অনুষ্ঠিত হবে। মির্জা ফখরুল ইসলাম বরং এসব কথা বলে জনগণকে বিভ্রান্ত করতে চান।

শুক্রবার নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে এক বিক্ষোভ মিছিলের আগে বক্তব্য রাখতে গিয়ে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে আওয়ামী লীগ ‘নির্বাচন নির্বাচন খেলা’ শুরু করেছে বলে মন্তব্য করেছেন ।

তিনি বলেছেন, তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা ছাড়া কোনো দলীয় সরকারের অধীনে আর নির্বাচন হবে না। ১৪-১৮ সালে ভোট দিতে পারেনি জনগণ। সামনের নির্বাচন নিয়েও ‘নির্বাচন নির্বাচন খেলা’ খেলতে চাচ্ছে আওয়ামী লীগ।

এদিকে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু জাতীয় প্রেস ক্লাবে দলীয় এক সভায় ২০২৩ সালের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বিদায় নিতে হবে মন্তব্য করে বলেছেন, আপনাকে (প্রধানমন্ত্রী) পদত্যাগ করতে হবে, সংসদ ভেঙে দিতে হবে, নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন করতে হবে। এ সরকারের সঙ্গে কোনো সংলাপ নেই। কারণ তাদের জাতি বিশ্বাস করে না।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহলের মতে, আমির হোসেন আমুর বক্তব্যে বিএনপির মনোভাব স্পষ্ট হয়েছিল যে, তারা রাজপথে যাই বলুক না কেন, সরকারের সাথে আলোচনার প্রস্তাব পেলে তারা আলোচনায় বসবেন। তবে সরকারের অবস্থানও বুঝা গেছে, যে তারা বিএনপিকে সংলাপের জন্য আহবান জানালে আসবে কিনা তা যাচাই করার জন্য আমুকে দিয়ে সংলাপের প্রস্তাব করেছেন। এমনও হতে পারে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগ মুহূর্তে সেপ্টেম্বরে সরকার বিএনপির সাথে সংলাপ করার আগ্রহের কথা জানিয়ে চিঠি দেবে।

এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়ামের একজন সদস্য নিজেকে প্রকাশ না করার শর্তে দেশ বর্তমানকে বলেছেন, রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই।ওবায়দুল কাদের যখন বলেছেন, সময় আসেনি। তবে সরকার সংলাপের জন্য উপযুক্ত সময় বিএনপিকে আহবান জানাতেই পারে। অতীতেও সংলাপ হয়েছে। সামনেও যে হবে না সে কথা তো কেউ বলছে না। অপেক্ষা করুন।

এমএফ