সিটি নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিয়েও মাঠে থাকার কৌশল

বিএনপি একটি নির্বাচন মুখী দল।  গণতান্ত্রিক দল হিসেবে বিএনপি বিশ্বাসও করে ক্ষমতায় যাওয়ার একমাত্র বৈধ পন্থা নির্বাচন।  নির্বাচনের মধ্য দিয়েই ক্ষমতার পালাবদল ঘটবে।  নির্বাচনী ইতিহাসে দেখা যাবে বিএনপি নির্বাচন বর্জনের কথা বললেও দেখা গেছে দলের নেতারা নির্বাচন বর্জন করা থেকে বিরত থাকতে পারেনি। তারা দলীয় শৃংখলা ভঙ্গের অপরাধে শাস্তির মুখোমুখি হবেন জেনেও নির্বাচন করছেন।  তবে আসন্ন পাঁচ সিটি করপোরেশন নির্বাচন বর্জনের কঠিনতর সিদ্ধান্ত নিলেও দল, তা শেষ পর্যন্ত মানতেছে না স্থানীয় নেতারা।  কারণ কেউ কেউ কেন্দ্রের কোন প্রভাবশালী নেতার মৌন সমর্থন নিয়ে দাঁড়িয়ে যাচ্ছেন নির্বাচনে। তারা নির্বাচনী মাঠে থাকবেন।  জেতার মতো পরিস্থিতি না থাকলে তারা ভোট বর্জনের নাটক করে মিডিয়ায় তা প্রচারে ভূমিকা রাখবেন।  মোট কথা নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে যা করার তা প্রাথীরা করবেন,সুবিধাটা নেবে দল।  এই কৌশলে বিএনপি নির্বাচনের মাঠে থাকবে বলে নানা সুত্র আভাস দিচ্ছে।  তবে সরকার ও নির্বাচন কমিশনেরও নিরপেক্ষ ভূমিকা দেখানের একটা সুযোগও থাকছে এ নির্বাচনে।  এ নির্বাচন সুষ্ট ও অবাধ করার মধ্য দিয়ে জাতীয় নির্বাচন কেমন হতে পারে তার ধারণা পাওয়া যাবে বলেও অভিজ্ঞ মহল মনে করছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ইতিমধ্যে গাজিপুর সিটির ভোটে বিএনপি পরিবারের একজন সদস্য মেয়র পদে মনোনয়ন পত্র দাখিল করে মাঠে নেমে পড়েছেন।  তিনি দাবি করছেন তার পরিবারের বাবা জেটা বা ভাই বিএনপির বড় পদের নেতা।  বিএনপি দলীয় ভাবে নির্বাচন  না করার সিদ্ধান্ত নিয়ে বসে থাকলেও  তারা স্থানীয় নেতাকর্মীদের চাপে নির্বাচন থেকে দূরে থাকা সম্ভব নয়।  রাজশাহী খুলনাও তেমন প্রার্থীরা অপেক্ষা করছেন ।

জানা গেছে,গত বৃহস্পতিবার গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন সরকার শাহ নূর ইসলাম রনি। তিনি কারান্তরীণ বিএনপি নেতা নুরুল ইসলাম সরকারের ছেলে এবং বিগত নির্বাচনে বিএনপিদলীয় মেয়র প্রার্থী ও দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য হাসান উদ্দিন সরকারের ভাতিজা। রনি দলের কোনো পদে নেই।  অবশ্য গাজীপুর সিটির ৫৭টির মধ্যে অধিকাংশ ওয়ার্ডেই বিএনপির পদধারী নেতা ও সাবেক নেতারা কাউন্সিলর পদে প্রার্থী হয়েছেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পাঁচ সিটি নির্বাচনে বিএনপি কিছুটা কৌশলী ভ‚মিকাও নিতে পারে।  প্রকাশ্যে বর্তমান সরকার ও নির্বাচন কমিশনের অধীনে নির্বাচনে না যাওয়ার জাতীয় রাজনীতির নীতিগত সিদ্ধান্ত অটুট থাকছে।  আবার মেয়র পদে প্রার্থী হিসেবে দলীয় পদবিহীন বিএনপি নেতার ছেলেকে ‘মৌন সমর্থন’ দিয়ে নির্বাচনী মাঠ দখলের কৌশলও নিয়ে থাকতে পারে।  রাজনৈতিক মাঠে এ ধরনের কৌশল হতেই পারে।

এ বিষয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গনমাধ্যমকে বলেছেন, বর্তমান সরকার ও নির্বাচন কমিশনের অধীনে কোনো নির্বাচনে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত রয়েছে বিএনপির।  তাঁরা নির্দলীয় সরকারের অধীনে আগামী নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলনে রয়েছেন।  দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে কেউ নির্বাচনে অংশ নিলে দল গঠনতন্ত্র অনুযায়ী সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেবে।

এদিকে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ইতোমধ্যে বলেছেন, বিএনপির ধানের শীষের প্রার্থী না থাকলেও ‘ঘোমটা পরে’ ইতোপূর্বে সব স্থানীয় সরকার নির্বাচনেই তাদের প্রার্থী ছিল।  এই ঘোমটা পরা প্রার্থী কিন্তু এবারের সিটি নির্বাচনেও থাকবে।

দলীয় সূত্রের  দাবি, সিটিগুলোর নির্বাচনে অংশগ্রহণে ইচ্ছুক নেতাদের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি রয়েছে বিএনপির।  গত মঙ্গলবার রাতে দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে পাঁচ সিটিতে নির্বাচনের বিষয়ে বৈঠকে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।  নির্বাচন বর্জনের দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে কেউ নির্বাচনে অংশ নিলে, কোনো ‘কৌশলের আশ্রয়’নিলে তাঁর বিরুদ্ধে এবং কেউ নির্বাচন প্রক্রিয়ায় নেপথ্যেও সম্পৃক্ত থাকলে তাঁদের বিরুদ্ধেও সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির একজন নেতাও  জানান, বৈঠকে নেতারা সবাই একবাক্যে নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার ব্যাপারে মত দিয়েছেন। তবে কাউকে দল থেকে বহিষ্কার করার আগে তিনি যাতে প্রার্থী না হন, সে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তাঁদের সঙ্গে কথা বলার সিদ্ধান্ত নেন।

অবশ্য নির্বাচনে অংশ নেওয়ার বিষয়ে দলের এমন ‘কঠোর অবস্থানের’ মধ্যেও বিএনপি ঘরানার প্রার্থীরা বলছেন ভিন্ন কথা।  তাঁরা বলছেন, দল থেকে ‘মৌন সমর্থন’ নিয়েই তাঁরা প্রার্থী হচ্ছেন। গাজীপুর সিটি করপোরেশনের মনোনয়ন ফরম জমা দিয়ে সরকার শাহ নূর ইসলাম বলেন, তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হচ্ছেন।  ভোটের মাঠ থেকে সরে দাঁড়ানোর জন্য দলের কোনো চাপ আসছে কিনা– জানতে চাইলে বলেন, চাপ তো পাচ্ছিই না; বরং দল মৌন সমর্থন দিচ্ছে।

একইভাবে বরিশাল সিটির বিএনপি-দলীয় সাবেক মেয়র আহসান হাবিব কামালের ছেলে সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী কামরুল আহসান রুপন জানান, দল থেকে তাঁকে কোনো চাপ দেওয়া হচ্ছে না। তিনি নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন।  সিলেটে  আরিফুল হক চৌধুরী বিএনপির পক্ষ থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার গুঞ্জন আছে।

গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ দিন ছিল বৃহস্পতিবার। খুলনা ও বরিশালে ১৬ মে এবং রাজশাহী ও সিলেটের মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ দিন ২৩ মে। গাজীপুরে আগামী ২৫ মে, খুলনা ও বরিশালে ১২ জুন এবং রাজশাহী ও সিলেটে ২১ জুন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মেয়র প্রার্থীর মতো গাজীপুরের ৫৭টি ওয়ার্ডের অধিকাংশ স্থানেই বিএনপির বর্তমান পদধারী, সাবেক নেতা ও সমর্থক হিসেবে পরিচিতরা মনোনয়ন ফরম জমা দিয়েছেন। গাজীপুরের ৩ নম্বর ওয়ার্ডে কাশিমপুর থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক আহবায়ক তাহাজ উদ্দিন মোল্লাহ, ১৪ নম্বর ওয়ার্ডে মহানগর শ্রমিক দলের আহবায়ক ফয়সাল সরকার, ১৬ নম্বর ওয়ার্ড-বাসন থানা বিএনপির সদস্য সচিব মোসলেম উদ্দিন চৌধুরী মুসা, ১৭ নম্বর ওয়ার্ডে ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি রফিকুল ইসলাম রাতা, ১৯ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সমর্থক তানভীর আহমেদ, ২০ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সমর্থক শহীদুল ইসলাম, ২৬ নম্বর ওয়ার্ডে মহানগর বিএনপির সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হান্নান মিয়া হান্নু, ২৮ নম্বর ওয়ার্ডে মেট্রো সদর থানা বিএনপির সাবেক আহবায়ক হাসান আজমল ভূইয়া, ৪০ নম্বর ওয়ার্ডে পুবাইল থানা বিএনপির আহবায়ক কমিটির সদস্য অ্যাডভোকেট নূরুল ইসলাম বিকি, ৪২ নম্বর ওয়ার্ডে থানা বিএনপির আহবায়ক কমিটির সদস্য সুলতান উদ্দিন আহমেদ, ৪৮ নম্বর ওয়ার্ডে টঙ্গী প‚র্ব থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শফি উদ্দিন সফি, ৪৯ নম্বর মহানগর বিএনপির সাবেক ধর্মবিষয়ক সম্পাদক মোবারক হোসেন মিলন, ৫৫ নম্বর ওয়ার্ডে ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি আবুল হাশেম ও মহানগর বিএনপির সদস্য জহির উদ্দিন মনোনয়ন ফরম জমা দিয়েছেন।

এসব নেতার বিষয়ে দলের কেন্দ্রীয় নেতারা জানান, দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে ২০২২ সালে বিএনপি নেতা নারায়ণগঞ্জে তৈমূর আলম খন্দকার নারায়ণগঞ্জে ও মনিরুল হক সাক্কু কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলে দল তাঁদের বহিষ্কার করে। এ বহিষ্কার সবচেয়ে কঠিন পদক্ষেপ এবং শীর্ষ নেতারা এটি এড়ানোর চেষ্টা করছেন। এ ধরনের পদক্ষেপ চলমান আন্দোলনেও বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। এ জন্য দলের হাইকমান্ড আরেকটু সময় নিয়ে তাঁদের নির্বাচন থেকে সরানোর চেষ্টা করবে।

বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, সরকার নতুন করে সিটি নির্বাচনের মাধ্যমে ষড়যন্ত্রে মেতেছে। যখন বিএনপি সরকারবিরোধী চূড়ান্ত আন্দোলনের প্রস্তুতি নিয়েছে, ঠিক তখনই সিটি নির্বাচনের তপশিল ঘোষণা করা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের আগেই নির্বাচন করছে সরকার। অর্থাৎ সিটি নির্বাচন হবে তথাকথিত নির্বাচন। এ অবস্থায় সিদ্ধান্ত অমান্য করে দলের কেউ নির্বাচনে গেলে তাঁকে বহিষ্কার করা হবে। এর আগেও দুই সিটির মেয়র প্রার্থীদের বহিষ্কার করা হয়েছে। এবার মেয়রদের সঙ্গে কাউন্সিলরদেরও সতর্ক বার্তা দিচ্ছে বিএনপি।

তবে এ নির্বাচনে কে জিতবেন, কে হারবেন; তা শুধু ভোটের অঙ্কে নির্ধারিত হবে না।  ভোটের বাইরে আরও অনেক হিসাব-নিকাশ থাকবে।  আগামী দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচন কেমন হবে, কারা অংশ নেবে, তার অনেক কিছুই নির্ভর করছে আগামী ৫ সিটি নির্বাচনের ওপর।  এ জন্য সর্তক থাকতেই হবে সরকারকে যেনো ‘মাগুরা উপনির্বাচন পরিস্থিতি হয়ে যায় গুরুত্বহীন পাঁচ সিটি নির্বাচন।