কিশোরগঞ্জের ভৈরবে দুটি ট্রেনের ভয়াবহ সংঘর্ষের ঘটনার কারণ জানালেন ভৈরব স্টেশন মাস্টার ইউসুফ। এ দুর্ঘটনায় ভৈরব স্টেশন থেকে দেওয়া সিগন্যালের কোনও ত্রুটি ছিল না বলে দাবি করেন তিনি। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে গণমাধ্যমে দুর্ঘটনার কারণ ব্যাখ্যা করে এ দাবি করেন স্টেশন মাস্টার।
তিনি জানান, রেলওয়ের সিগন্যাল সিস্টেম পুরোপুরি কম্পিউটারাইজড। যে কারণে কখনই একসঙ্গে দুটি ট্রেনের সংকেত দেওয়া যাবে না। ভৈরব স্টেশন থেকে শুধু এগারসিন্দুর ট্রেনের জন্য সংকেত দেওয়া হয়েছিল। মালবাহী ট্রেনটিকে স্টেশনে প্রবেশের জন্য কোনও প্রকার সিগন্যাল দেওয়া হয়নি। সুতরাং স্টেশনের সিগন্যাল সিস্টেমে কোনও ত্রুটি ছিল না।
স্টেশন মাস্টার ইউসুফ আরও জানান, ভৈরব রেলওয়ে স্টেশনের প্রবেশ সিগন্যাল না পাওয়ার পরও তা অমান্য করে মালবাহী ট্রেনটি স্টেশনে প্রবেশ করে। ফলে স্টেশন থেকে ছেড়ে যাওয়া এগারসিন্দুর ট্রেনকে ধাক্কা দিলে যাত্রীবাহী দুটি বগি উল্টে যায় এবং হতাহতের ঘটনাটি ঘটে।
দুর্ঘটনার পর শিডিউল কিছুটা এলোমেলো হয়েছে। তাই নির্ধারিত সময় অনুযায়ী ট্রেন চলাচলের জন্য কিছুটা সময় লাগতে পারে। তবে আজকের মধ্যেই সব ট্রেন শিডিউল অনুযায়ী চলতে পারবে। দুর্ঘটনার পর বর্তমানে ঢাকা-চট্টগ্রাম-সিলেট রেল যোগাযোগ স্বাভাবিক হয়েছে।
প্রসঙ্গত, সোমবার বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে কিশোরগঞ্জ থেকে ছেড়ে আসা এগারসিন্দুর গোধূলি ট্রেনের সঙ্গে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামগামী মালবাহী ট্রেনের সংঘর্ষ হয়। মালবাহী ট্রেনটি ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের দিকে যাচ্ছিল। একই সময় ভৈরব থেকে ঢাকায় যাচ্ছিল যাত্রীবাহী ট্রেন এগারসিন্দুর গোধূলি। ভৈরব রেলস্টেশনের আউটার পয়েন্টে ক্রসিংয়ে যাত্রীবাহী ট্রেনের শেষ তিন বগিতে ধাক্কা দেয় মালবাহী ট্রেনটি। এতে যাত্রীবাহী ট্রেনের কয়েকটি বগি উল্টে যায়। দুর্ঘটনায় জেলা প্রশাসনের পক্ষে ১৭ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করে। এরপর ১৫ জনের মরদেহ শনাক্ত শেষে তাদের স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
এ ঘটনায় লোকোমাস্টার জাহাঙ্গীর আলম, সহকারী লোকোমাস্টার আতিকুর রহমান ও গার্ড আলমগীর হোসেনকে বরখাস্ত করা হয়েছে।
ঘটনা তদন্তে পৃথক তিনটি কমিটি গঠন।
কিশোরগঞ্জের ভৈরবে ট্রেন দুর্ঘটনার ১৫ ঘন্টা পর উদ্ধার কাজ শেষ হওয়ায় ঢাকা-চট্রগ্রাম-সিলেট রেলপথে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হয়েছে। এঘটনায় পৃথক ৩টি তদন্ত কমিটি গঠন।
আজ মঙ্গলবার ভোর সাড়ে ৪টায় দুটি রিলিফ ট্রেনের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত বগি দুটি লাইন থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়।
উভয় লাইন পুরোপুরি প্রস্তুত করার পর সকাল ৭টা থেকে ডাউন এবং আপ উভয় লাইনে ট্রেন চলাচল শুরু হয়। এর আগে রাতে এক লাইনে ট্রেন চলাচল করে। বিভিন্ন স্টেশনে আন্তঃনগর ও লোকাল ট্রেন আটকে থাকায় ট্রেন চলাচল এবং নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী চলাচল স্বাভাবিক হতে এক দুইদিন সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করছেন রেল কর্তৃপক্ষ। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশে দুর্ঘটনা কবলিত এলাকায় ১০ কিলোমিটার গতিতে ট্রেন চলাচল করবে বলে এতথ্য নিশ্চিত করেছেন ভৈরব রেলওয়ে স্টেশন মাস্টার মো. ইউসুফ। ঘটনার পরপরই ফায়ার সার্ভিসের ৯টি ইউনিটের সাথে রেলওয়ে পুলিশ, বেঙ্গল পুলিশ, র্যাব, ডিবি, আনসারসহ রেলওয়ে ও প্রশাসনের লোকজন উদ্ধার কাজ শুরু করেন। পরে রাত সাড়ে দশটার দিকে মালবাহী ট্রেনটিকে স্টেশনে সরিয়ে আনার পর ট্রেনটি চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে ভৈরব স্টেশন ছেড়ে যায় এবং রাত ১১টার পর নোয়াখালীগামী উপকূল এক্সপ্রেস ট্রেনটি ভৈরব স্টেশনে এসে যাত্রা বিরতীর পর নোয়াখালীর উদ্দেশ্যে ভৈরব স্টেশন ছেড়ে যায়। সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে দূর্ঘটনায় পতিত এগারোসিন্ধুর ট্রেনটির ক্ষতিগ্রস্ত বগি গুলো আলাদা করার পর দুর্ঘটনাকবলিত স্থান থেকে ৭টা ৫৫ মিনিটে এগারসিন্ধুর ট্রেনটি ঢাকার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। সাধারণ মানুষের আশঙ্কা ছিল বগি গুলোর নিচে আরো অনেক যাত্রী আটকা পড়ে মারা যেতে পারে। দুটি বগি সরানোর সময় বগির নিচ থেকে আর কারও মরদেহ পাওয়া যায়নি। উদ্ধার কাজ শেষ হওয়ায় এখন পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা ১৮ জন। আহতদের মধ্যে এখন পর্যন্ত কোনো মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি। এই ঘটনায় মালবাহী (কন্টিনার) ট্রেনের চালক, সহকারী চালক ও পরিচালককে (গার্ড) সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। রেলপথ মন্ত্রণালয় ও রেল প্রশাসনের পক্ষ থেকে দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয় এবং কিশোরগঞ্জ জেলা প্রশাসন একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন। তদন্ত কমিটি আগামী ৭২ ঘন্টার মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। ঢাকা বিভাগীয় ৪ সদস্যের তদন্ত কমিটির নেতৃত্বে থাকছেন ঢাকার বিভাগীয় পরিবহন কর্মকর্তা। এছাড়াও সদস্য হিসেবে থাকবেন বিভাগীয় মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার লোকোমেটিভ, বিভাগীয় প্রকৌশলী-১ এবং বিভাগীয় সিগন্যাল ও টেলিকমিউনিকেশন প্রকৌশলী। এবং চট্টগ্রাম বিভাগেও একটি ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এতে নেতৃত্ব দিচ্ছেন রেলের চিফ অপারেটিং সুপারিনটেনডেন্ট (সিওপিএস) মো. শহিদুল ইসলাম। কমিটিতে সদস্য হিসেবে থাকছেন চিফ মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ জাকির হোসেন, চিফ ইঞ্জিনিয়ার আরমান হোসেন, সিএসপি তুষার এবং চিফ মেডিকেল অফিসার আহাদ আলী সরকার। অন্যদিকে কিশোরগঞ্জ জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আজ মঙ্গলবার বিকেলে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে বলে জানিয়েছেন কিশোরগঞ্জ অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) রুবেল মাহমুদ। আজ মঙ্গলবার তদন্ত কমিটির সদস্যরা ভৈরবে এসে মাঠ পর্যায়ের তদন্তের কাজ করবেন বলে রেলওয়ে সূত্র জানায়। এখন পর্যন্ত ১৬টি লাশের পরিচয় পাওয়ায় পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।