সম্প্রতি চালু হওয়ার পর সর্বজনীন পেনশন স্কিমের অর্থ ট্রেজারি বন্ডে বিনিয়োগ করেছে সরকার। এই বিনিয়োগের আগে যথাযথ পরিকল্পনা জরুরি বলে মনে করছেন সমাজ বিশ্লেষক, অর্থনীতিবিদসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ। তারা বলছেন একই সাথে এই স্কিমের অর্থ ব্যবহারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার পাশাপাশি সঠিক তথ্য সকলকে জানানো প্রয়োজন।
ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক দেশ বর্তমানকে জানান, সরকারের এই উদ্যোগ অত্যন্ত সময় উপযোগী এবং সাধারণ মানুষের জন্য উপকারি একটি উদ্যোগ। যেভাবে সরকারি চাকুরিজীবীরা বৃদ্ধ বয়সেও অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী থাকেন ঠিক তেমনভাবে বেসরকারি সব পেশাজীবীদের জন্যও বৃদ্ধ বয়সেও স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। অর্থনৈতিক স্বাধীনতা মানুষের জীবন মানকে আরও উন্নত ও আরও স্বাভাবিক করবে বলে আমার বিশ^াস।
এদিকে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের অধ্যাপক ড. রুমানা হক দেশ বর্তমান প্রতিবেদককে জানান, আমাদের দেশের স্বল্প আয়ের মানুষদের সাধারণত সঞ্চয়ের প্রবণতা অনেক কম। সেই দিক বিবেচনা করলে সরকারের এই উদ্যোগটি অত্যন্ত প্রসংশনীয়। তবে সমস্যা হলো আমাদের দেশে এখনও সঞ্চয়ের সঠিক বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি হয় নি। এজন্য আমাদের আরও সময় এবং শ্রম দিতে হবে। করতে হবে সঠিক পরিকল্পনা এবং সঠিক তথ্য প্রচার করতে হবে। বাস্তবায়নের জন্য কয়েকটি পরামর্শ তুলে ধরেন তিনি। তিনি বলেন, স্কিমের আওতা নির্ধারণ করা যেমন জরুরি, তেমনি স্কিমে যুক্ত হলে কি কি সুবিধা পাওয়া যাবে তার সঠিক ব্যখা জানানোও জরুরি। একদিকে তথ্য প্রদান, তথ্যের অবাধ প্রবাহ এবং একটি সুনির্দিষ্ট সেল বা বুথ বা পয়েন্ট এখনই নির্ধারণ করে দেওয়া প্রয়োজন বলেও মনে করেন তিনি। যারা স্কিমের অর্থ সংগ্রহ করবেন বা তথ্য দেবেন তাদেরকে দক্ষ হওয়াও সময়ের দাবি। তবে বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিনিয়োগে সরকারকে আরও সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, স্কিমে যাতে বেশির ভাগ মানুষ যুক্ত হয় সেদিকে নজর আরও বাড়াতে হবে। আস্থা তৈরি করতে হবে।
তবে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞান অনুষদের অধ্যাপক ড. এ এস এম আমানুল্লাহ ফেরদৌস মনে করেন, সর্বজনীন পেনশন স্কিমের অর্থ ট্রেজারি বন্ডে বিনিয়োগ করাটা সরকারের সেভ গেম। তবে এই বিনিয়োগ শুধু ট্রেজারি বন্ডে নয়, বিভিন্ন ধরনের উদ্যোগেও বিনিয়োগ করতে পারেন। আমরা যদি অস্ট্রেলিয়া বা কানাডার দিকে তাকাই তাহলে দেখি যে, পেনশন স্কিমের অর্থ সে দেশের সরকার সেসব দেশে তো বটেই, বিভিন্ন দেশের পোর্টফলিও দেখেও বিনিয়োগ করে, আমরাও তেমনটা করতে পারি।
গবেষণা সংস্থা সিপিডির সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেছেন, পেনশন স্কিমের অর্থ ট্রেজারি বন্ডে বিনিয়োগ অত্যন্ত ভালো উদ্যোগ। এর ফলে এটা পরিস্কার হয়ে যায় যে, সরকার জনগণের অর্থ যথাযথভাবে ফেরত দেয়ার শর্ত মেনে চলছে। তবে ভয়ের বিষয় হলো এই স্কিমে অনেক কম সংখ্যক মানুষের সম্পৃক্ততা। ১৮ কোটি মানুষের দেশে মাত্র ১২ কোটি টাকা সঞ্চয় অনেক কম-এইটা বাড়াতে হবে। বাড়ানো উচিত বলে মনে করেন তিনি। তিনি মনে করেন, এজন্য সরকারের সুনির্দিষ্ট ক্যাম্পেইন পদ্বতি চালু করা উচিত। বর্তমান মূল্যস্ফিতি, অনিয়ন্ত্রিত বাজার ব্যবস্থা এবং অর্থনৈতিক সংকটের কারণে সরকার মানুষের আস্থা কিছুটা হলেও হারাচ্ছে বলে মনে করেন তিনি। তবে, নির্বাচনের পর এই স্কিমে বিনিয়োগের হার অনেকটাই বেড়ে যাবে বলেও মনে করেন গবেষণা সংস্থা সিপিডির সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান।
সম্প্রতি চালু হওয়ার পর সর্বজনীন পেনশন স্কিম এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি নিয়েছেন ৩১ থেকে ৪০ বছর বয়সীরা। এরপরেই রয়েছেন ৪১ থেকে ৫০ বছর বয়সী এবং ২১ থেকে ৩০ বছর বয়সীরা। তাদের সংখ্যা যথাক্রমে ১ হাজার ৮৩৭ এবং ১ হাজার ১৯৮। এ ছাড়া, ৬১ বছরের বেশি বয়সী ২৫ জন এবং ১৮ থেকে ২০ বছর বয়সী ৭৬ জন পেনশন স্কিমের জন্য নথিভুক্ত হয়েছেন। এ ছাড়া, দারিদ্র্য সীমার নিচে বসবাসকারী স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য সমতা স্কিম এবং বিদেশে কর্মরত বা অবস্থানরত বাংলাদেশিদের জন্য প্রবাসী স্কিম। এই ২টি স্কিম নিয়েছেন যথাক্রমে ৮৭৫ জন ও ১৪৮ জন। জাতীয় পরিচয়পত্র ভিত্তি ধরে ১৮ বছরে থেকে শুরু করে ৫০ বছর বয়সী বাংলাদেশি নাগরিক সর্বজনীন পেনশন স্কিমে অংশগ্রহণ করতে পারবেন। তবে, বিশেষ বিবেচনায় ৫০ বছরের বেশি বয়সীরা সর্বজনীন পেনশন স্কিমে অংশগ্রহণ নিতে পারবে, সেক্ষেত্রে স্কিমে অংশগ্রহণের তারিখ থেকে টানা ১০ বছর চাঁদা দিতে হবে। তারপর যে বয়স হবে, সেই বয়স থেকে আজীবন পেনশন পাবেন। পেনশনে থাকাকালে ৭৫ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে মৃত্যুবরণ করলে তার নমিনি বাকি সময়ের (পেনশন গ্রহীতার বয়স ৭৫ বছর পর্যন্ত) জন্য মাসিক পেনশন পাবেন। চাঁদাদাতা অন্তত ১০ বছর চাঁদা দেয়ার আগে মৃত্যুবরণ করলে জমা দেয়া অর্থ মুনাফাসহ তার নমিনিকে ফেরত দেয়া হবে। পেনশনের জন্য নির্ধারিত চাঁদা বিনিয়োগ হিসেবে গণ্য করে কর রেয়াতের জন্য বিবেচিত হবে এবং মাসিক পেনশন বাবদ প্রাপ্ত অর্থ আয়কর মুক্ত থাকবে।
এদিকে, সর্বজনীন পেনশন স্কিমে জমা পড়া চাঁদার টাকার ১১ কোটি ৩১ টাকা ট্রেজারি বন্ডে বিনিয়োগ করেছে সরকার। প্রাথমিকভাবে ১০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডে বিনিয়োগ করা হয়েছে। এরই মধ্যে ১৫ হাজার জন চাঁদা দিয়েছেন। জমা হওয়া অর্থ থেকে ১১ কোটি ৩১ লাখ টাকার ১০ বছর মেয়াদী ট্রেজারি বন্ড কিনে বিনিয়োগের উদ্বোধন করা হয়।