চট্টগ্রামে সড়ক দুর্ঘটনায় থামছেই না। প্রতিদিন কোথাও না কোথাও ঘটছে দুর্ঘটনা। কখনও দুরন্ত গতির করুণ পরিণতি, কখনও বিপরীত দিক থেকে ধেয়ে আসা যানবাহনের ধাক্কা, কখনও খাদে পড়ে, আবার কখনও দুই গাড়ির মুখোমুখি সংঘর্ষে চালক ও যাত্রীরা হচ্ছেন হতাহত। পরিবার যেমন নিহতদের হারাচ্ছেন, তেমনি আতদের মধ্যে অনেকেই সারাজীবনের জন্য পঙ্গুত্ববরণ করছেন। শুধু চলতি আগস্ট মাসেই চট্টগ্রামে ৮টি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৮ জন। দুর্ঘটনা রোধে মানুষের সচেতনতা, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং আইনের কঠোর প্রয়োগকে গুরত্ব দিচ্ছে নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা)। অন্যদিকে, সচেতনতার বিকল্প নেই বলছে ট্রাফিক পুলিশ।
সর্বশেষ গতকাল মঙ্গলবার সকালে লোহাগাড়া উপজেলার জাঙ্গালিয়া চুুনতি রেঞ্জ অফিসের সামনে তেলের ভাউচার ও মিনি পিকআপ ভ্যানের মুখোমুখি সংঘর্ষের ঘটনায় পিকআপ ভ্যানের চালক গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি আছেন।
এর ১১ ঘণ্টা আগে সোমবার রাত সাড়ে ১০টার সময় চট্টগ্রাম নগরীর আখতারুজ্জামান ফ্লাইওভারে থেমে থাকা পাথরবাহী মিনি ট্রাকে ধাক্কা লেগে ঘটনাস্থলে প্রাণ হারান মোটরসাইকেল আরোহী ছাত্রলীগ নেতা আল ইমরান ইফতি ও তার বান্ধবী নাহিদা সুলতানা। দুজনই বাইকার গ্রুপের সদস্য হলেও দূরন্ত গতির বাইকই নিয়ে গেল তাদের না ফেরার দেশে। মর্মান্তিক মৃত্যুতে তাদের দুই পরিবারে চলছে শোকের মাতম। দুর্ঘটনা নিয়ে নগর জুড়ে চলছে আলোচনা-সমালোচনার ঝড়। এছাড়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে সমবেদনা জানিয়ে স্ট্যাটাস দিচ্ছে স্বজন, সহপাঠি, সহকর্মী ও পরিচিতসহ অনেকেই।
দুর্ঘটনায় নিহত ২৩ বছর বয়সী আল ইমরান ইফতি চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজ ছাত্রলীগের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য। তিনি নগরীর পূর্ব মাদারবাড়ির দারোগারহাট এলাকার শাহেদ পাড়ার ইউনুস মোল্লার ছেলে।
অন্যদিকে তার বান্ধবী ২১ বছর বয়সী নাহিদা সুলতানা একই কলেজেরই ছাত্রী। তিনি কক্সবাজার জেলার পেকুয়া উপজেলার গোয়াখালী ১ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা।
এর আগে গত ৪ আগস্ট ভোরে মিরসরাইয়ে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নাহিদ হোসেন শাওন নামে এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। তিনি উপজেলার ১৬ নম্বর শাহেরখালী ইউনিয়ন এলাকার বাসিন্দা।
৬ আগস্ট সন্ধ্যায় মীরসরাই উপজেলার ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে বাসের ধাক্কায় জসিম উদ্দিন (৫৫) নামে এক পথচারী নিহত হয়েছে। তিনি একই উপজেলার জোরারগঞ্জের ৫ নম্বর ওয়ার্ড খিলমুরালি এলাকার আব্দুর রউফের ছেলে।
গত ১২ আগস্ট সকালে সীতাকুণ্ডে যাত্রীবাহি বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে বুলবুল মিয়া (৬০) নামে এক বৃদ্ধের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। তিনি নেত্রকোণার কেন্দুয়া এলাকার বাসিন্দা।
একই দিন সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারীতে ট্রেনের নিচে কাটাপড়ে আরিফুল ইসলাম (১৭) নামে এক কিশোরের মৃত্যু হয়েছে। নিহত আরিফ লালমনিরহাট জেলার পাটগ্রাম থানার হামিদুর ইসলামের ছেলে।
১৪ আগস্ট বাঁশখালীর কালীপুরে বাস চাপায় এক মোটরসাইকেল আরোহী নিহত হয়েছেন। নিহত মো. সায়মন (৩২) কালীপুর ইউনিয়নের বাঘগোনা এলাকার আব্দুল শুক্কুরের ছেলে। এঘটনায় আহত হয় আরও দু’জন।
১৬ আগস্ট বাকলিয়ায় সড়ক দুর্ঘটনায় আহত জিহাদুল ইসলামের (২৮) মৃত্যু হয়। তিনি চন্দনাইশের বরমা ইউনিয়নের কেশুয়া গ্রামের হাজী সালেহ আহমেদের বাড়ির জাহিদুল ইসলামের ছেলে।
এছাড়াও ছোট-বড় অনেক দুর্ঘটনা গণমাধ্যমের অন্তরালে থেকে যায়। এভাবে দুঘটনায় কেউ প্রাণ হারাচ্ছেন আর কেউ কেউ পঙ্গুত্ব বরণ করছেন।
সড়ক দুর্ঘটনা রোধে সবাইকে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়ে চট্টগ্রাম মেট্টোপলিটন পুলিশ ট্রাফিক উত্তর বিভাগের উপ-কমিশনার জয়নুল আবেদীন দৈনিক দেশ বর্তমানকে বলেন, আমরা প্রতিনিয়ত রাস্তা পারাপারের নিয়ম, মোটরসাইকেল আরোহীদের হেলমেট ব্যবহারে বাধ্য করাসহ দুর্ঘটনা রোধে নগরবাসীকে সচেতন করে যাচ্ছি। তবুও না মানলে মামলা দিয়ে আর্থিক শাস্তি দিয়ে যাচ্ছি। তাতেও যারা অসচেতন তারাই অনেক সময় দুর্ঘটনার শিকার হন। দিনের বেলায় রাস্তা তেমন ফাঁকা থাকে না, ফলে দ্রুত গতিতে গাড়ি চালাতে পারে না। রাতের বেলায় রাস্তা ফাঁকা থাকার সুযোগ নেয় অনেকেই। তাতে ঘটছে দুর্ঘটনা।
তিনি আরও বলেন, এক কথায় যদি বলি দুর্ঘটনা রোধে সড়ক ব্যবহারকারীদের সচেতনতার বিকল্প নেই। চালক, যাত্রী সর্বোপরি নগরবাসী সচেতন হলে এবং শৃঙ্খলা মেনে চলাচল করলেই সড়ক দুর্ঘটনা রোধ সম্ভব।
নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) চট্টগ্রাম মহানগরের সভাপতি এস.এম আবু তৈয়ব দৈনিক দেশ বর্তমানকে বলেন, সড়ক দুর্ঘটনা রোধে প্রথম কথা হচ্ছে সচেতনতা। গন্তব্য পোঁছাতে মানুষ যেভাবে তাড়াহুড়া করে, প্রতিটি গাড়ি, প্রত্যেক মানুষ কিংবা যাত্রী যেখানে সবার মধ্যে তাড়াহুড়া কিংবা অসহিষ্ণুভাব, অসুস্থ প্রতিযোগিতা চলছে, যার কারণে সড়ক দুর্ঘটনা বাড়ছে। সবার মাঝে ধৈর্যের অভাব দেখা যাচ্ছে, যা পুলিশ কিংবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তা কতক্ষণ পর্যবেক্ষণে রাখবে। এখানে ব্যক্তিগত সচেতনতা ছাড়া এটা রোধ করা প্রায় অসম্ভব। দেশে আইন আছে, কিন্তু আইনের সুষ্ঠু প্রয়োগ নেই, শাস্তি প্রয়োগ করা হচ্ছে না, সুষ্ঠু বিচার হচ্ছে না, ফলে আইন না মানার প্রবণতা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিদেশে আইন মানতে কড়া নির্দেশনা থাকায় সেখানে মানুষ বাধ্য। আমাদের দেশেও আইনের কঠোর প্রয়োগ হলে সড়কে চলাচলকারীরা আইন মানতে বাধ্য হবে।
তিনি আরও বলেন, সড়ক দুর্ঘটনা রোধ কিংবা সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার বর্তমানে সময়ের দাবি। যেমন- সিসিটিভি ক্যামেরাসহ গাড়ি চলার গতি নির্ণয় করার মতো যন্ত্র ব্যবহার করে দ্রুত গতির গাড়িকে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনলে সড়ক দুর্ঘটনা রোধ অনেকটা কমবে। সুতরাং মানুষের সচেতনতা, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং আইনের প্রয়োগ এই তিনটিকে সমানভাবে প্রয়োগ করলে সড়ক দুর্ঘটনা রোধ সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।
দেশ বর্তমান/এআই