সড়কের পাশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠা না করতে ট্রাফিক উত্তরের ব্যতিক্রমী উদ্যোগ

চট্টগ্রাম নগরীতে মূল সড়কের পাশে থাকা স্কুল-কলেজ চলাকালীন সময়ে যানজট এক ধরণের নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে ক্লাস কিংবা পরীক্ষার শুরু এবং শেষ হওয়ার সময় যানজটের আধিক্যতা দেখা যায়। এমনকি যানজটের কারণে অনকে সময় ক্লাস ও পরীক্ষায় ছাত্র-ছাত্রীদের দেরিতে উপস্থিতির ঘটনাও ঘটেছে।

এবার মূল সড়কের পাশে পর্যাপ্ত পরিমাণ পার্কিং নিশ্চিত করতে না পারলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপনে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়েছে চট্টগ্রাম মেট্টোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক উত্তর বিভাগ। কেননা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আগত শিক্ষক-শিক্ষিকা, ছাত্র-ছাত্রী এবং অভিভাকদের গাড়ি সড়কে পার্কিং করলে যানজট সৃষ্টি হয়। এতে নষ্ট হয় কর্মঘণ্টা, অসুবিধায় পড়ে পথচারীরা।

সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার (৭ সেপ্টেম্বর) নগরীর ব্যবস্ততম প্রবর্তক মোড়, ষোলশহর ২নং গেটের মূল সড়কের পাশে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান না করতে ড. মাহমুদ হাসান একাডেমির প্রধান শিক্ষক বরাবর চিঠি দেন ট্রাফিক উত্তর বিভাগ। অনুলিপি দিয়ে অবগত করা হয় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান, চট্টগ্রাম মেট্টোপলিটন পুলিশের কমিশনারসহ সংশ্লিষ্টদের।

এর আগে প্রায় ১ মাস আগে নগরীর প্রবর্তক মোড়ে আল হিদায়া নামক একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত পার্কিং নিশ্চিত করার অনুরোধ করে চিঠি দেওয়া হয়। পরবর্তীতে স্কুলের গেটের সামনে সড়কের শৃঙ্খলায় রক্ষায় ভ্যারিকেড স্থাপন করে দিয়েছে ট্রাফিক উত্তর বিভাগ।

গত ২১ মে পাঁচলাইশ থানাধীন পূর্ব নাসিরাবাদ বায়েজিদ বোস্তামি রোডে আকতার ম্যানশনের মালিক পক্ষকে একইভাবে মূল সড়কের পাশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মার্কেট ও ক্লিনিক ভাড়া না দিতে অনুরোধ করে চিঠি দেন ট্রাফিক উত্তর বিভাগ। যেখানে একটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল করা কথা ছিল। কিন্তু চিঠি পেয়ে কর্তৃপক্ষ সেখানে আর স্কুল করেননি। চিঠিতে সাড়া মিলেছে বলে জানান পুলিশের এই ইউনিট।

গত ৭ সেপ্টেম্বর ড. মাহমুদ হাসান একাডেমির প্রধান শিক্ষক বরাবর দেওয়া চিঠিতে স্বাক্ষর করেন চট্টগ্রাম মেট্টোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক উত্তর বিভাগের উপ-কমিশনার জয়নুল আবেদীন। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী ট্রাফিক উত্তর বিভাগের আওতাধীন ১৫ নং বাগমনিরাম ওয়ার্ডের পূর্ব নাসিরাবাদ-পাঁচলাইশ এলাকার ৪৮৭০ হোল্ডিং নম্বরে ড. মাহমুদ হাসান একাডেমি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। যেহেতু ভবনটি নগরীর ব্যস্ততম বায়েজিদ বোস্তামী লেইনের মূল সড়কে অবস্থিত সেহেতু ট্রাফিক শৃঙ্খলা রক্ষায় এর প্রভাব পড়বে। এমনিতেই এই সড়কে ট্রাফিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে ট্রাফিক বিভাগকে প্রতিনিয়ত হিমশিম খেতে হচ্ছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি চালু হলে আগত শিক্ষক-শিক্ষিকা, ছাত্র-ছাত্রী এবং অভিভাকদের গাড়ি মূল সড়কে পার্কিং করতে হবে। এতে মূল সড়কে ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পাবে যানজট, সংঘটিত হতে পারে দুর্ঘটনা। তাই পর্যাপ্ত পার্কিং ব্যবস্থা নিশ্চিত ও সংশ্লিষ্ট ট্রাফিক বিভাগের পার্কিং অনাপত্তি ছাড়পত্র এবং সিডিএসহ অন্যান্যসংস্থার আরোপিত বিধি-বিধান যথাযথ না মেনে গুরুত্বপূর্ণ সড়কে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন সমীচিন হবে না। সুতরাং এ ধরনের কাজ থেকে কর্তৃপক্ষকে বিরত থাকার অনুরোধ জানাই। অন্যথায় সড়কের ওপর যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং, সড়কে কোনোরকম প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হলে ট্রাফিক বিভাগ ‘সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮’ অনুয়ায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করিবে।

বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম মেট্টোপলিটন পুলিশ ট্রাফিক উত্তর বিভাগের উপ কমিশনার জয়নুল আবেদীন দৈনিক দেশ বর্তমানকে বলেন, চট্টগ্রাম মহানগরীতে পর্যাপ্ত পার্কিং ব্যবস্থা না থাকায় ইতোপূর্বে গড়ে ওঠা বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলোর যানবাহন যত্রতত্র পার্কিং করার ফলে সড়কে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে ট্রাফিক বিভাগ প্রতিনিয়ত হিমশিম খাচ্ছে। এর থেকে আগামীতে কিছুটা উত্তরণ পেতে ট্রাফিক বিভাগের এই প্রচেষ্টা। এর আগে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে বিষয়গুলো বারবার জানিয়েছি আমরা। এরপরও দেখা যায় হঠাৎ করে সাইনবোর্ড লাগিয়ে স্কুল প্রতিষ্ঠা করে ফেলায় সড়কে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে আমাদের কষ্ট হয়। তাই সড়কের পাশে যাতে পর্যাপ্ত পার্কিং ছাড়া কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে না উঠে সে ব্যাপারে আমরা সজাগ।

তিনি আরও বলেন, প্রতিটি চিঠির অনুলিপি দিয়ে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানকে অবগত করছি, যাতে পর্যাপ্ত পার্কিং ছাড়া মূল সড়কের পাশে এ ধরনের স্থাপনাকে অনুমতি না দেন। দিলেও ট্রাফিক বিভাগের অনাপত্তি পত্র ছাড়া যাতে না দেওয়া হয় সেই জন্য এই ব্যবস্থা।

চিঠিতে সাড়া পাচ্ছেন জানিয়ে পুলিশের এই কর্মকর্তা আরও বলেন, ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটিতে চিঠি দিয়ে মূল সড়কের পাশে স্থাপনা করা থেকে বিরত রাখতে পেরেছি। আগামীতে ট্রাফিক শৃঙ্খলা ধরে রাখতে এ ধরনের কার্যক্রম অব্যাহত রাখবে বলেও জানান পুলিশের এই উপ-কমিশনার।

ট্রাফিক পুলিশের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে নিরাপদ সড়ক চাই (নিশচা) এর চট্টগ্রামের সভাপতি আবু তৈয়ব দৈনিক দেশ বর্তমানকে বলেন, এই উদ্যোগ প্রশংসনীয়। যদিও এই কাজটি আরও আগে করা উচিত ছিল। বিশ্বের অন্য কোনো দেশে আমাদের মতো মূল সড়েকের পাশে নিজস্ব পার্কিং ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার নজির নেই। প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানের একটি নির্দিষ্ঠ নীতিমালা থাকে, যেখানে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা অবশ্যম্ভাবী।

তিনি নগরীর দামপাড়া এলাকায় অবস্থিত বাংলাদেশ মহিলা সমিতি উচ্চ বিদ্যালয়ের (বাওয়া) সামনে ছুটির সময় যানজট প্রসঙ্গে বলেন, প্রতিদিনই এই স্কুলের সামনে কী অসহনীয় যানজট তা সবাই ভোগে। অথচ এই স্কুলের একটি বড় মাঠ আছে, যা পার্কিংয়ের জন্য ব্যবহার না করে কর্র্তৃপক্ষ ভাড়া দিয়ে রেখেছে। এছাড়াও নগরীর বিভিন্ন স্কুল-কলেজের সামনে ছুটির সময় এমন দৃশ্য প্রতীয়মান। সুতরাং ট্রাফিক বিভাগের এই উদ্যোগের ফলে নগরবাসী সুফল ভোগ করবে।

তিনি চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্র্তৃপক্ষের দৃষ্টি আর্কষণ করে বলেন, আগামীতে মূল সড়কের পাশে শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয় বরং সব ধরনের প্রতিষ্ঠানের অনুমতির ক্ষেত্রে ট্রাফিক বিভাগের অনাপত্তি পত্রের সংযুক্তি বাধ্যতামূলক করা সময়ের দাবি।

দেশ বর্তমান/এআই