ঈদে ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের নতুন টুপি ও সুগন্ধি ব্যবহারের রীতি অনেক প্রাচীন। ঈদ আনন্দ এবং নামাজ আদায়ের অন্যতম অনুষঙ্গ টুপি, আতর, সুরমা। ঈদে শিশু থেকে বৃদ্ধ সকলে চায় নতুন টুপি। অনেকের রয়েছে বাহারি ডিজাইনের টুপি ও দামি আতর ব্যবহারের শখ। অনেকের আবার নতুন জায়নামাজে ঈদের নামাজ আদায়ের অভ্যাস রয়েছে। তাই ঈদ এলেই মুসল্লিদের নতুন টুপি ও আতর কিনার ধুম লাগে নগর-গ্রাম সর্বত্র।
এ উপলক্ষে নগরীর বিভিন্ন মসজিদের সামনে ভাসমান দোকান পেতে আতর, সুরমা, টুপি, তসবিহ, মিসওয়াক, স্কার্ফ, জায়নামাজ সহ বিবিধ পণ্য নিয়ে পসরা সাজিয়ে বসেছেন দোকানিরা। আর ঈদ আনন্দের জোয়ার লেগেছে এসব দোকানপাটে। অল্প দামে টুপি, আতরের পাশাপাশি ভালো মানের জিনিসপত্রও পাওয়া যাচ্ছে এসব দোকানে। পাশাপাশি পিছিয়ে নেই বড় বড় বিপণি বিতানগুলো; সেখানেও দেশি-বিদেশী টুপি, আতর, স্কার্ফ, জায়নামাজ সহ মুসল্লিদের পছন্দের নানা রকম জিনিসপত্র বিক্রি করছেন ব্যবসায়ীরা। তাই ক্রেতাদের শেষ মুহূর্তে টুকিটাকি কেনাকাটায় স্থান পাচ্ছে টুপি, আতর, সুরমা।
বুধবার (১৯ এপ্রিল) চট্টগ্রাম নগরীর বিভিন্ন মার্কেট ও এলাকা ঘুরে দেখা গেছে এমন চিত্র। এসময় নগরীর বিভন্ন মোড় ও মসজিদের সামনে ভ্যান গাড়ি করে টুপি-আতর বিক্রির দোকানগুলোতে ছিল ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড়।
নগরীর রিয়াজ উদ্দিন বাজারে টুপি কিনতে আসা শরিফুল ইসলাম বলেন, বাচ্চার জন্য টুপি নিতে এসেছেন তিনি। পাঞ্জাবির সঙ্গে মিলিয়ে টুপি পরবে বলে বায়না ধরেছে তার বাচ্চা। তাই বাচ্চা ও পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে ভাই, বাচ্চা ও নিজের জন্য টুপি কিনতে এসেছেন এখানে।
তিনি আরো বলেন, অন্যান্য সময়ের চেয়ে এবার দাম কিছুটা বেশি মনে হচ্ছে টুপি ও আনুষঙ্গিক জিনিসপত্রের। ঈদ উপলক্ষে কিছুটা বেড়েছে দাম। তবে, সাধারণ জনগণের হাতের নাগালেই রয়েছে বলে মন্তব্য তার। দাম কিছুটা বেশি হলেও পরিবারের সকলের জন্য ছয়টা টুপি নিয়েছেন তিনি।
নগরীর রিয়াজউদ্দিন বাজারের বিক্রেতা মো. হাশেম বলেন, তিনি দশ বছর ধরে এই ব্যবসার সাথে জড়িত। দেশ বিদেশের নানা রকম আতর ও টুপি পাওয়া যায় তার দোকানে। এছাড়াও আছে বিভিন্ন ডিজাইনের বাহারি রঙের টুপি যেগুলো ২০০ থেকে ৬০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সুগন্ধি আতরের মধ্যে আছে জান্নাতুল ফেরদৌস, জেসমিন, রোজ বেলি, দিলরুবা, এরাবিয়ান, আসওয়াদ, মর্নিং কুইন, অ্যাঞ্জেল ও জমজম। যেগুলো তিনশ থেকে দেড় হাজার টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। দেশি আতরের মধ্যে হাসনাহেনা, রজনীগন্ধা, গোলাপ, বেলি ও নাইট ফ্লাওয়ার বিক্রি হচ্ছে পাঁচশ থেকে সাতশ টাকায়। জয়তুন ও নিমের মিসওয়াক বিক্রি হচ্ছে দশ থেকে ত্রিশ টাকায়।
এসময় তিনি বলেন, এবছর জিনিসপত্রের দাম কিছুটা বেড়েছে। ঈদ এলেই এধরনের পণ্যে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় দাম একটু বেশি থাকে। তবে এবছর আশানুরূপ বিক্রি নেই বলে জানান তিনি।
এসময় নগরীর আন্দরকিল্লা মোড়ে ফুটপাতের দোকানি মো. রুবেল দেশ বর্তমানকে বলেন, সারা বছর বিক্রি সীমিত থাকলেও ঈদ এলেই বেড়ে যায় এসব পণ্যের চাহিদা। তার দোকানে টুপি, আতর, সুরমা, তসবিহ, মিসওয়াক সহ বেশ কিছু পণ্য রয়েছে। পাকিস্তানি, চায়না, ভারতীয়, আল ফারুক, ওমানি, সুলতানি টুপি সহ রয়েছে দেশীয় কারখানায় তৈরি বিভিন্ন রকম টুপি। যেগুলো খুবই মান সম্পন্ন ও ব্যবহার উপযোগী। এ সব টুপি পঞ্চাশ থেকে তিনশ টাকায় বিক্রি হচ্ছে এখানে। এছাড়া ছোট বাচ্চাদের চুমকি, মখমল ও কাপড়ের টুপি চল্লিশ থেকে একশ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
আরো আছে মদিনা আতর, কিউট চন্দন আতর, সৌদি আল রিহাব, আল ফারেস, রেড রোজ, লর্ডস, আসিল, অরজিনাল, সিলভার স্টোন সহ বিভিন্ন রকমের আতর। যেগুলো এক শিশি পঞ্চাশ থেকে দেড়শ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
এসময় নগরীর ইউনুস্কো সিটি সেন্টার সুন্না-ওয়ে দোকানের মালিক মুত্তাকির বিল্লা হাসিব দেশ বর্তমানকে বলেন, তাদের মূল বিপণন হচ্ছে বিভিন্ন দেশের আতর, টুপি, জায়নামাজ, পাঞ্জাবী সহ বিবিধ পণ্য। এছাড়াও আছে পোশাক ও ঘরকে সুগন্ধী করার বিভিন্ন পণ্য।
মূলত আতর খুবই বিলাসবহুল সুগন্ধী বলে জানান তিনি। তাদের দোকানে দুই ধরনের আতর পাওয়া যায় ওয়েষ্টার্ন ও এরাবিয়ান। যেগুলো ১০০ ভাগ হালাল ও এলকোহল ফ্রি। এরাবিয়ান আতরের মধ্যে মাস্ক, এম্বার, ওদ, সেন্ডাল, মিসকান বাদ, ওদ আসাম, ওদ ভিয়েতনাম, মুখালাদ(মিক্স) সহ বিবিধ আইটেম রয়েছে। এসকল আতর ৩মিলি বোতল একশ টাকা থেকে বাইশ হাজার টাকায় বিক্রি করছেন তারা। এরাবিয়ান বা ক্লাসিক আতর পাওয়া যাচ্ছে ৩ মিলি বোতল দুইশ থেকে এক হাজার টাকায়। এসব আতরের মধ্যে সবচেয়ে দামি হচ্ছে কম্বডিয় ওদ। যেটির ৩ মিলির দাম পরে সাড়ে সাত হাজার টাকা। এছাড়াও চাইনিজ ও ইন্ডিয়ান রুমাল, টারকিশ জায়নামাজ, হ্যন্ড মেইড বাংলাদেশি টুপি; বগুড়া-সিরাজগঞ্জ সহ বেশ কিছু জায়গার টুপি রয়েছে। আড়াইশ থেকে পাঁচশ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে এসব টুপি।
এছাড়াও রয়েছে পাকিস্তানি, মিশরি, ইন্দোনেশিয়ান, আফগানী, সৌদি, টার্কিস ও আফ্রিকান টুপি। ঈদে বেচাকেনা সম্পর্কে তিনি বলেন, প্রতি বছর ১৫ রমজানের পর থেকে ক্রেতাদের চাপ থাকলেও এবার সে তুলনায় বেশ কম। তাই বেচা বিক্রি বিগত বছরগুলোর তুলনায় খুবই সীমিত। ঈদ যতই ঘনিয়ে আসছে সুরমা, আতর, টুপি, তসবি আর জায়নামাজের দোকানগুলোতে ভিড় যেন ততই বাড়ছে। দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনার পর ঈদের নামাজে আতর ও সুরমার ব্যবহার একদিকে যেমন সুন্নত আদায়, তেমনি সুগন্ধির ব্যবহার মনকে করে প্রফুল্ল।