ঢাকাই চলচ্চিত্রকে আপামর জনসাধারণের কাছে জনপ্রিয় ও গ্রহণযোগ্য করতে কয়েকজন অভিনেত্রী সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছেন। তাদের মধ্যে চিত্রনায়িকা শাবানা অন্যতম। তিনি এদেশের চলচ্চিত্রকে বাণিজ্যিক রূপ দিতে ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলা সিনেমাকে তুলে ধরতে অনন্য ভূমিকা পালন করেছেন।
জীবনের আরেকটি বসন্ত পার করলেন ঢাকাই সিনেমার জীবন্ত কিংবদন্তি শাবানা। বৃহস্পতিবার (১৫ জুন) গুণী এই অভিনেত্রীর ৭১তম জন্মদিন।
চঞ্চলতা ছিল বটে, কিন্তু বেশ লাজুক ছিলেন তিনি। তাই ক্লাস ফাইভে থাকতেই যখন সিনেমায় অভিনয়ের প্রস্তাব আসে, তার বাবা বিস্মিত হন। বলেন, ‘আমার মেয়ে কীভাবে অভিনয় করবে! এত লাজুক, কারও সামনেই তো আসতে চায় না’।
অথচ নিয়তির কী লীলা, সেই লজ্জাবতী কিশোরীই কয়েক বছর পর হয়ে ওঠেন ঢাকাই সিনেমার সবচেয়ে জনপ্রিয় নায়িকা!
চট্টগ্রামের রাউজানে তার জন্ম। বাবা-মা নাম রাখেন আফরোজা সুলতানা রত্না। পড়াশোনায় মন বসেনি তার। তাই স্কুলের গণ্ডিও পার করেননি। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াও যে জীবনে সর্বোচ্চ সাফল্য অর্জন করা যায়, সেটা কড়ায়-গণ্ডায় বুঝিয়ে দিয়েছেন তিনি।
১৯৬২ সালে মাত্র ৯ বছর বয়সে এহতেশাম পরিচালিত ‘নতুন সুর’ সিনেমার মাধ্যমে প্রথম অভিনয়ের সুযোগ পান তিনি। এরপর রত্না নামে সেই কিশোরী অভিনেত্রী হিসেবে ‘তালাশ’, ‘কবাবু’, ‘ভাইয়া’, ‘সাগর’, ‘পঁয়সে’, ‘আবার বনবাসে রূপবান’ সিনেমায় অভিনয় করেন। সহনায়িকা হিসেবে অভিনয় করেছেন ‘আবার বনবাসে রূপবান’ ও ‘ডাক বাবু’তে।
নায়িকা চরিত্রে তাকে প্রথম দেখা যায় ১৯৬৭ সালে, এহতেশাম পরিচালিত ‘চকোরী’তে। ছবিটি ব্যবসাসফল হয়, আর তিনিও বনে যান তারকা। অতঃপর শুধু এগিয়ে যাবার পালা। ব্যস্ততায় ডুবে একের পর এক সিনেমা করেছেন আর নিজেকে নিয়ে গেছেন অনন্য উচ্চতায়। নাদিম, রাজ্জাক, আলমগীর, ফারুক, জসীম, সোহেল রানাসহ জনপ্রিয় নায়কদের সঙ্গে জুটিবেঁধে উপহার দিয়েছেন বহু নন্দিত সিনেমা।
তার অভিনীত উল্লেখযোগ্য কয়েকটি ছবি হলো, ‘ভাত দে’, ‘অবুঝ মন’, ‘ছুটির ঘণ্টা’, ‘দোস্ত দুশমন’, ‘সত্য মিথ্যা’, ‘রাঙা ভাবী’, ‘বাংলার নায়ক’, ‘ওরা এগারো জন’, ‘বিরোধ’, ‘আনাড়ি’, ‘সমাধান’, ‘জীবনসাথী’, ‘মাটির ঘর’, ‘লুটেরা’, ‘সখি তুমি কার’, ‘কেউ কারো নয়’, ‘পালাবি কোথায়’, ‘স্বামী কেন আসামি’, ‘দুঃসাহস’, ‘পুত্রবধূ’, ‘আক্রোশ’, ‘চাঁপা ডাঙার বউ’ প্রভৃতি।
নায়িকা কিংবা অভিনেত্রী হিসেবে তার মতো প্রাপ্তি ঢাকাই শোবিজে কারও ঝুলিতে নেই। নগর থেকে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে, সবার কাছেই তিনি জনপ্রিয়। আর পুরস্কার? সেখানে তো তার রেকর্ড কেউ ভাঙতেই পারেনি আজ অব্দি। সেরা অভিনেত্রী হিসেবে নয়বার, প্রযোজক হিসেবে একবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন তিনি। একই আয়োজনে ২০১৭ সালে আজীবন সম্মাননাও পেয়েছেন তিনি।

সিনে জগতে একটি ধারণা প্রচলিত ছিল যে বিয়ের পর নায়িকাদের জনপ্রিয়তা কমে যায়। কিন্তু এই ধারণা ভুল প্রমাণ করেছেন তিনি। ক্যারিয়ারের শুরুতেই ২১ বছর বয়সে বিয়ে করেন এই অভিনেত্রী। ১৯৭৩ সালে সরকারি কর্মকর্তা ওয়াহিদ সাদিককে বিয়ে করেন শাবানা। এরপর সংসার আর সিনেমা, দুটোই সমানভাবে সামলেছেন।
তবে ১৯৯৭ সালে এসে তার মনে হয়, ক্যারিয়ারে অনেক সময় দিয়েছেন, এবার সন্তানদের দিকে পূর্ণ মনোযোগ দেওয়া যাক। তাই আচমকাই সিনেমা থেকে বিদায় নেন। আর স্থায়ী হন যুক্তরাষ্ট্রে। সেই থেকে এখনও তিনি মার্কিন মুলুকে বসবাস করছেন। মাঝে মধ্যে দেশে আসেন, অতিথি পাখির মতো ঘুরে আবার ফিরে যান।
একাধিকবার সিনেমায় প্রত্যাবর্তনের বার্তাও দিয়েছেন বটে। কিন্তু তা আর বাস্তবে পরিণত হয়নি। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, সিনেমা থেকে বিদায় নেওয়ার ২৬ বছর হয়ে গেলেও এখনও দর্শক তাকে ভালোবাসে। টানা তিন দশক সুনীপুণ অভিনয়ের মাধ্যমে জয় করে নিয়েছেন কোটি দর্শকের মন।