লোহাগাড়ায় প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় প্রকাশ্যে বালু লুট, নীরব ভূমিকায় প্রশাসন

চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার পদুয়া ইউনিয়নের জঙ্গল পদুয়া এলাকায় পাহাড়ের গা ঘেঁষে বয়ে চলা সাফুরা খাল থেকে প্রতিনিয়ত শ্যালো মেশিন দিয়ে উত্তোলন করা হচ্ছে বালু। এর ফলে ধসে পড়ছে বনাঞ্চলের পাহাড়। আর এভাবেই ওই এলাকায় গড়ে তোলা হয়েছে অবৈধ বালুর রাজ্য। হত্যা, ধর্ষণ, অস্ত্র, ছিনতাই, মারামারি, গাছ চুরিসহ একাধিক মামলার আসামিরাই মূলত নিয়ন্ত্রণ করছে এসব বালুর রাজ্য। গত এক বছর ধরে দিনদুপুরে প্রকাশ্যে সাফুরা খালের অন্তত পাঁচটি এলাকা থেকে বালু উত্তোলন করলেও প্রশাসনকে নীরব থাকতে দেখা গেছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, সাফুরা খালের ধনিয়া বিল বড় ডেপা এলাকায় সকাল-সন্ধা শ্যালু মেশিন বসিয়ে বালু উত্তোলন করছে জাহেদুল ইসলাম ও মোহাম্মদ সরওয়ারের নেতৃত্বে একদল শ্রমিক। জাহেদ ও সরওয়ার এলাকার মানুষের কাছে আতঙ্কের নাম। তাদের প্রত্যেকের নামে তিনটি করে মামলা রয়েছে। কোনো প্রকার ইজারা ছাড়াই প্রতি গাড়ি ১৮শ’ টাকায় প্রতিদিন শতাধিক ট্রাকে বালু বিক্রি করা হচ্ছে।

বড় ডেপার ২০০ ফুট নিচে ধনিয়া বিলের দক্ষিণ পাশের চিত্র আরও ভয়াবহ। এখানে খাল, বিল ও বনাঞ্চল ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেছে। বন্ধ হয়ে গেছে চাষাবাদ। প্রভাবশালী মোহাম্মদ হুবায়ের ও বারেক কামাল এ অঞ্চল দখল করে বালু উত্তোলন করছে। মোহাম্মদ হুবায়ের এই এলাকার একজন চিহৃিত সন্ত্রাসী। তার বিরুদ্ধে মুখ খুললেই ত্রাস সৃষ্টি করে। অস্ত্র ও হত্যা মামলাসহ তার বিরুদ্ধে ৪টি মামলা রয়েছে।

মোহাম্মদ হুবায়ের নিজেকে সাবেক সেচ্ছাসেবক লীগের নেতা উল্লেখ করে বলেন, দলীয় লোকজন বালু উত্তোলন করছে, আপনাদের সমস্যা কী?

এ সময় জাহেদুল ইসলাম, শোইয়াবুল সিকদার ও ইউপি চেয়ারম্যান হারুন অর রশিদসাংবাদিকদের ছবি তুলতে বাধা দেন।

স্থানীয় চাষী আব্দুল মাবুদ বলেন, রাস্তাঘাট ও কৃষি জমির ক্ষয়ক্ষতি হলেও তাদের বিরুদ্ধে কেউ কিছু বলবে না। বললেই মারধর করে।

সাফুরা খালের ১৫০০ ফুট নিচে ধনিয়া বিলের দক্ষিণ পাশে কাঠালিয়া চর এলাকায় বিশাল বালুর স্তুপ করেছে আরেকটি গ্রুপ। এ বালু মহলে কিশোর গ্যাং লিডার মোহাম্মদ মিনহাজ নেতৃত্ব দেয়। তার সাথে রয়েছে মোহাম্মদ হেলাল ও আব্দুর নূর। অস্ত্র, ছিনতাই, হত্যা মামলাসহ মিনহাজের বিরুদ্ধে ১০টি মামলা রয়েছে। মোহাম্মদ হেলালের ৬ ও আব্দুর নূর ৪ মামলার আসামি। আওয়ামী লীগ নেতা ফিরোজ কামাল ও নূরুল হককে প্রকাশ্যে গুলি করার অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। মামলাও হয়েছে। এক রিকশাচালককে হত্যা করার মামলাও রয়েছে মিনহাজের বিরুদ্ধে । সাতকানিয়ার চরতিতে নির্বাচনের সময় অস্ত্রসহ গ্রেফতার হয় এ সিন্ডিকেটের সদস্যরা। কাঠালিয়া চর এলাকায় নির্বিচারে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের ফলে ফসলি জমির ভাঙন সৃষ্টি হয়েছে। ভাঙছে পাহাড়ও।

প্রতিবেদক ক্রেতা সেজে মিনহাজের সাথে কথা বললে সে জানায়, এক ট্রাক বালু ১৮০০ টাকায় বিক্রয় করে সে। প্রশাসনের কোনো ঝামেলা নেই, তিনি সামলাবেন। তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা থাকার কথাও স্বীকার করেন।

কাঠালিয়ার চর থেকে ৩০০ ফুট নিচে উলুবনিয়া এলাকায় শোয়াইবুল হক সিকদার, মোহাম্মদ সরওয়ার, মুহাম্মদ জিসান ও মামুনের নেতৃত্বে অবৈধ ভাবে বালু উত্তোলন করছে শ্রমিকরা। এ এলাকায় অবাধে বালু উত্তোলনের ফলে ২০/৩০ সনাতন ধর্মাবলম্বীর ঘর হুমকির মুখে পড়েছে। আগামী বর্ষা মৌসুমে এসব ঘরবাড়ি বিলীন হয়ে যেতে পারে।

স্থানীয় সাগর দাশ বলেন, এভাবে বালু উত্তোলনের কারণে ঘরবাড়ি বিলীন হওয়ার আশংঙ্কা রয়েছে। প্রতিনিয়ত আতঙ্কের মধ্যে রয়েছে গ্রামের মানুষ।

এ অংশের আরও ৩০০ ফুট নিচে উলবনিয়া এলাকায় মোহাম্মদ মিনহাজ, মোহাম্মদ জিসান, মোহাম্মদ হেলাল ও মোহাম্মদ মামুন শ্যালো মেশিন দিয়ে বালু উত্তোলন করছেন। তাদের প্রত্যেকের নামে ৮ থেকে ১২টি মামলা রয়েছে। এ চারজনের নামেই রয়েছে অস্ত্র মামলা। এ ছাড়াও মাদক, হত্যা, হত্যার চেষ্টা, নারী নির্যাতনসহ বন মামলা রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।

সকাল-সন্ধা ওই ৫ স্থানে শ্যালু মেশিনের মাধ্যমে চলে বালু উত্তোলনের কার্যক্রম। অবৈধ বালু উত্তোলনের সাথে পদুয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হারুন অর রশিদও জড়িত আছেন বলে অনুসন্ধানে জানা যায়। তিনি প্রতিটি বালু মহল থেকে কমিশন নেন বলে মোহাম্মদ হুবায়ের প্রতিবেদককে জানান। কিন্তু ইউপি চেয়ারম্যান হারুন অর রশিদ বিষয়টি অস্বীকার করেন।

জঙ্গল পদুয়ায়ার সড়কে তিন থেকে চার জন উঠতি বয়সের যুবক পাহারা দেয়। তারা গাড়ি প্রতি ৫০ টাকা কমিশন পেয়ে থাকে। এ ছাড়া কোনো গণমাধ্যম কর্মী গেলে প্রাথমিকভাবে তাদের সাথে কুশল বিনিময় করে মুষ্টিমেয় অর্থের বিনিময়ে সমঝোতা করার চেষ্টা করে। আর যদি তাদের সাথে সমঝোতা না করে তারা বিভিন্ন প্রকার হুমকি-ধমকি দিয়ে থাকে। মাঝে মধ্যে গণমাধ্যম কর্মীর সাথে হাতাহাতির ঘটনাও ঘটে।

এছাড়া প্রশাসনিকভাবে অভিযান পরিচালনা করতে যাওয়ার পূর্বে বালুখেকোরা অলৌকিক ক্ষমতার মাধ্যমে অভিযানের খবর পেয়ে যায়। যার ফলে তারা দ্রুত স্থান ত্যাগ করে।

গত বৃহস্পতিবার (৭ সেপ্টেম্বর) বেলা ১২ টায় ওই এলাকার ছাফুরা খাল হতে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোহাম্মদ শাহজাহান। এ সময় তিনি বিশ হাজার ঘনফুট বালু জব্দ করেন।

তিনি বলেন, অভিযানের সময় কাউকে পাওয়া যায়নি। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বনবিভাগের জায়গা সুরক্ষিত রাখতে নিয়মিত টহল জোরদারসহ সার্বিক ব্যবস্থা নেয়ার জন্য বন বিভাগকে নির্দেশনা প্রদান করেছি।

অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রতি গাড়ি বালু বিক্রি হয় ১৮০০ থেকে ২০০০ টাকায়। এর মধ্যে জমির মালিককে দেওয়া হয় ২০০ টাকা। জমির মালিক দুর্বল হলে টাকার বিনিময়ে হুমকি ধমকি দেওয়া হয়। উত্তোলনের জায়গায় তিন-চারজন যারা থাকেন তাদের ভাগে যায় গাড়ি প্রতি গাড়ি ৫০ টাকা। দিন-শেষে প্রত্যেক জায়গা থেকে প্রতিদিন দুই হাজার টাকা করে সর্বমোট দশ হাজার টাকা বর্তমান চেয়ারম্যান হারুন অর রশিদকে দিতে হয় বলে জানা গেছে।

পদুয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হারুন অর রশিদ বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, গাড়ি প্রশাসনকে ধরিয়ে দেওয়ায় বালুখেকোরা আমার বিরুদ্ধে মিথ্যাচার করছে।

জানা গেছে, প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দেওয়ার জন্য পার্শবর্তী উপজেলা সদর বান্দরবানে সেনাবাহিনীর অভিযানে জব্দকৃত দুটি বালুর স্তুপ নিলামের মাধ্যমে বিক্রি করা হয়। বালুগুলো সরকারি রাজস্ব প্রদানের মাধ্যমে বিক্রির জন্য গাড়িপ্রতি একটি নিদিষ্ট টোকেনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। যারা উক্ত বালুর ডাক নিলামের মাধ্যমে কিনেছেন তাদের থেকে জঙ্গল পদুয়ার বালুখেকোরা

টোকেনের তিনটি বই প্রায় ত্রিশ হাজার টাকার বিনিময়ে কিনে নেয়। প্রত্যেক রাজস্ব প্রদানের বইয়ে ১০০টি টোকেন রয়েছে। রাজস্ব প্রদানের বইগুলো কেনার কারণ হিসেবে জানা যায়, বালু সরবরাহের সময় যাতে কোন আইনি সমস্যায় পড়তে না হয়।

এআই