দেশের সবচেয়ে বড় শুল্ক স্টেশন চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউস রাজস্ব আহরণে ক্রমাগত পিছিয়ে পড়ছে। আগের মতো নেই রাজস্ব আহরণের আয়ের সেই উল্লস্ফন। সরকারের আমদানি সংকোচন নীতির কারণে রাজস্ব আয়েও পড়েছে ভাটার টান। আমদানি কমায় ক্রমাগত কমছে রাজস্ব আয়। অথচ দেশের রাজস্ব আয়ের বড় যোগানদাতা চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউস।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক মন্দার এখন দখল সামলাচ্ছে বাংলাদেশ। ডলার সংকটের কারণে এলসি (ঋণপত্র) খুলতে ব্যাংকের অনীহা আবার উচ্চ মার্জিনে এলসি খুলতে ব্যাবসায়ীদের অনাগ্রহ এবং ডলার সংকটের কারণে নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য ব্যতীত সরকারের আমদানি সংকোচন নীতির কারণে রাজস্ব আয়ের এই নেতিবাচক ধারা। বিগত অর্থবছরে চট্টগ্রাম কাস্টমস ১২ শতাংশের ওপর প্রবৃদ্ধি অর্জন করলেও চলতি অর্থবছরে প্রথম ১০ মাসে প্রবৃদ্ধি দুইয়ের ঘরেও পৌঁছায়নি।
সমুদ্রপথে দেশে আমদানি-রফতানি বাণিজ্যের ৯২ শতাংশ সম্পন্ন হয় চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর দিয়ে। চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজের আগমন, পণ্য খালাসের পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে দেশের আমদানি-রফতানি বাণিজ্যের সার্বিক চিত্র পাওয়া যায়। চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরে আমদানিবাহী পণ্যের জাহাজের আগমন কমে যাওয়ার অর্থ দাঁড়ায় আমদানি বাণিজ্যের মন্থরতা। যার সরাসরি প্রভাব পড়ে রাজস্ব আহরণের ওপর। চট্টগ্রাম বন্দরের পরিবহন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর প্রথম চার (জানুয়ারি-এপ্রিল) মাসে জাহাজ হ্যান্ডলিং হয়েছে এক হাজার ৩৭২টি। আগের বছর (২০২২ সাল) একই সময়ে হয়েছে এক হাজার ৪৭৫টি জাহাজ।চলতি বছরের প্রথম চার মাসে তিন কোটি ৯৮ লাখ টন কার্গো (খোলা পণ্য) খালাস এবং কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছে ৯ লাখ ১০ হাজার টিইইউএস। গত বছর (২০২২ সাল) একই সময়ে কার্গো হয়েছে চার কোটি ৩৩ লাখ ৫৪ হাজার টন এবং কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছে ১০ লাখ ৭৭ হাজার টিইইউএস। বন্দরের এই পরিসংখ্যানে আমদানি-রফতানি বাণিজ্যের নিম্নমুখী ধারার একটি চিত্র পাওয়া যায়।
চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আগত আমদানিকৃত পণ্যের ভলিউমের ওপর চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের রাজস্ব আহরণের পারদ ওঠা-নামা করে। চট্টগ্রাম কাস্টমসের তথ্য মতে, চলতি অর্থবছর ৭৪ হাজার ২০৬ কোটি টাকার রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।চলতি অর্থবছরেরর প্রথম ১০ মাসে (জুলাই-এপ্রিল) রাজস্ব আয় ধরা হয়েছে ৬২ হাজার ৬৪৭ কোটি টাকা। বিপরীতে আহরণ হয়েছে ৪৮ হাজার ৮১৫ কোটি টাকা। গত অর্থবছরের (২০২১-২২) একই সময়ে চট্টগ্রাম কাস্টমস ৪৮ হাজার ৬০ কোটি টাকার রাজস্ব আয় করেছিল। সে হিসেবে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২২.০৮ শতাংশ কম রাজস্ব আদায় হয়েছে।
চট্টগ্রাম কাস্টমসের রাজস্ব আয়ের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায় গত অর্থবছরের এপ্রিলে পাঁচ হাজার ৩২৯ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হয়। চলতি অর্থবছরের এপ্রিলে আয় হয়েছে চার হাজার ৫৫৯ কোটি টাকা। গত অর্থবছরের এপ্রিলের তুলনায় চলতি অর্থবছরের এপ্রিলে রাজস্ব আয় কমেছে ১৫ শতাংশ। আবার চলতি অর্থবছরের এপ্রিলে লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে রাজস্ব আয় ৩৩.৩৪ শতাংশ কম হয়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম (জুলাই) মাসে চট্টগ্রাম কাস্টমস ৪০.৮৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করলেও তা ক্রমাগত কমে এপ্রিলে এসে দাঁড়িয়েছে এক দশমিক.৫৭ শতাংশে। বিগত ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে কাস্টমসের প্রবৃদ্ধি ছিলো ২০.৭০ শতাংশ।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, পণ্য আমদানি কমে যাওয়ায় রাজস্ব আয়ের হিসাব পাল্টাচ্ছে চট্টগ্রাম কাস্টমসের। অনেক ব্যাংকের শাখায় এলসি একেবারেই বন্ধ। কোনো কোনো ব্যাংক সীমিত পরিসরে এলসি খুললেও উচ্চ মার্জিনের কারণে ব্যবসায়ীরা এলসি খুলতে এগিয়ে আসছে না। কারো কারো মতে, চট্টগ্রাম বন্দরে উচ্চ হারে ট্যারিফ আদায়ের ঝুঁকি এড়াতে অনেক ব্যবসায়ী বন্দর পরিবর্তন করছে। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ রিকণ্ডিশন্ড ভেহিক্যালস ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশানের সেক্রেটারী (বারভিডা) জেনারেল সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ শহীদুল ইসলাম বলেন, আগে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে বেশির ভাগ ব্যবসায়ী গাড়ি আমদানি করতেন। চট্টগ্রাম বন্দরে বেশি ট্যারিফ হওয়ার কারণে বারভিডার ১১শ’ সদস্যের মধ্যে মাত্র ৫০ জন চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে গাড়ি আমদানি করছে। অন্যরা মোংলায় গাড়ি খালাস করে। মোংলায় রাজস্ব আয়ের ৫২ শতাংশ আসে গাড়ি আমদানি থেকে। গাড়ি আমদানিকারকরা চট্টগ্রাম বন্দর বিমুখ হওয়ায় রাজস্ব আহরণের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে চট্টগ্রাম কাস্টমসে।
চট্টগ্রাম চেম্বার অব চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাষ্ট্রির প্রেসিডেন্ট মাহবুবুল আলম রাজস্ব আয় কমে যাওয়া প্রসঙ্গে বলেন,রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক মন্দা এখনও শেষ হয়নি। ডলার সংকটের কারণে সরকার আমদানি সীমিত করেছে। চাহিদা অনুযায়ী এলসি দিতে পারছে না ব্যাংক। যার কারণে চট্টগ্রাম কাস্টমসে রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে বিরূপ প্রভাব পড়েছে।