সরকারের পদত্যাগ ঘটাতে সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিচ্ছে বিএনপি। পদত্যাগ ছাড়া নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি আদায়ের আর কোন বিকল্প দেখছেন না দলটির নেতারা। এ জন্য রাজপথের আন্দোলনকেই গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। দলটির নেতাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে,ফয়সালা যা হবার রাজপথেই হতে হবে। এজন্য কেন্দ্র থেকে তৃণমূলে বারবার কর্মসূচিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে বলে বিএনপির নেতারা জানিয়েছেন। চূড়ান্ত মুহূর্ত বিবেচনা করা হচ্ছে কোরবানীর ঈদের পরের দিনগুলোকে।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন,বিএনপি নেতাকর্মীরা এখন সাহসিকতার সঙ্গে জনগণকে নিয়ে রাজপথের আন্দোলন-সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। অবৈধ আওয়ামী সরকারের পতন ছাড়া তাঁরা ঘরে ফিরে যাবেন না। আমরা গণতান্ত্রিকভাবে নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন চালিয়ে যাবো। সরকারের পদত্যাগই আমাদের মুখ্য দাবি।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন রাজধানীর দলীয় সমাবেশে সরকারের বিরুদ্ধে ‘গণ-অভ্যুত্থান’ সৃষ্টি করতে নেতা-কর্মীদের সর্বাত্মক প্রস্তুতি নেওয়ার আহবান জানিয়েছেন ।
খন্দকার মোশাররফ বলেন, ‘যে সংকট সামনে এই সংকটের ফয়সালা করতে হলে রাজপথেই করতে হবে। রাজপথে ফয়সালা করার জন্য আপনারা প্রস্তুতি গ্রহণ করুন। আমরা গণতান্ত্রিকভাবে আন্দোলন করে জনগণের মধ্যে ইস্পাতকঠিন ঐক্য গড়ে এই সরকারকে বিদায় করব-এটাই আমাদের শপথ।’
মোশাররফ বলেন, নব্বইয়ে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ছাত্র-গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে এরশাদকে বিদায় করা হয়েছিল। পাকিস্তান আমলে আইয়ুব খানের মতো স্বৈরাচারকে এ দেশের মানুষ গণ-আন্দোলন করে বিদায় করেছে। এই সরকারকে বিদায় করতেও গণ-অভ্যুত্থানের কোনো বিকল্প নাই
ঈদের পর গত ১৩ মে রাজধানীতে সমাবেশের মাধ্যমে আবার রাজপথের আন্দোলনে সরব হয়ে উঠেছে বিএনপি ও তার মিত্র জোট ও দলগুলো। তবে জোটগত আন্দোলনে শরীকদের সাথে কিছু কিছু বিষয়ে মতের অমিল হওয়ায় যুগপৎ আন্দোলনে সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে বলে নেতারা জানিয়েছেন।
এ প্রসঙ্গে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, চলমান যুগপৎ আন্দোলন কর্মস‚চি নিয়ে শরিকদের সঙ্গে আলোচনা হচ্ছে। শিগগির আন্দোলনের যৌথ ঘোষণাপত্র ঘোষিত হবে। আর যৌথ ঘোষণার ভিত্তি হবে কল্যাণরাষ্ট্র। ভাবনাগুলো ভাবনারই বিষয়! কোন পথে হাঁটছে বিএনপি?
যুগপৎ আন্দোলনে থাকা সব শরিক দলকে নিয়ে একটি ঘোষণাপত্র দিতে শেষ মুহ‚র্তেও কাজ সারছে বিএনপি। এতদিন গণতন্ত্র মঞ্চের সঙ্গে যৌথভাবে ঘোষণাপত্র দেওয়ার কাজটি এগিয়ে নিয়েছিল দলটি। কিন্তু অন্য শরিক দলগুলো এতে আপত্তি তোলায় সেই রাস্তা থেকে সরে দাঁড়ায় জোটের নেতৃত্বে থাকা বিএনপি।
দলটির নেতারা বলছেন, সবগুলো জোটের মতামত নিয়ে একটি সমন্বিত ঘোষণাপত্রের খসড়া ইতিমধ্যে তৈরি হয়েছে। ৯ মে মঙ্গলবার রাতে অনুষ্ঠিত বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনাও হয়েছে। বৈঠক থেকে কিছু পর্যবেক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এখন সেগুলো ঠিক করা নিয়ে কাজ চলছে। এটি স্থায়ী কমিটির আগামী বৈঠকে চ‚ড়ান্ত হতে পারে। পরে তা ঘোষণা করা হবে।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘চলমান আন্দোলন কর্মস‚চি নিয়ে শরিকদের সঙ্গে আলোচনা হচ্ছে। শিগগিরই যুগপৎ আন্দোলনের যৌথ ঘোষণাপত্র দেওয়া হবে। এই ঘোষণার ভিত্তি হবে কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা।’
এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত বিএনপির একাধিক নেতা বলেছেন, ‘সরকারবিরোধী আন্দোলনে বিএনপির নেতৃত্বে গণতন্ত্র মঞ্চ, ‘জাতীয়তাবাদী সমমনা জোট’ নামে ১১-দলীয় জোট, ১২-দলীয় জোট, গণতান্ত্রিক বাম ঐক্য ছাড়াও এলডিপি (অলি), বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, গণফোরামের দুই অংশ আন্দোলনে রয়েছে। শুধু গণতন্ত্র মঞ্চের সঙ্গে বিএনপি যৌথ ঘোষণাপত্র দিক, তা চায় না অন্য শরিকরা।
জোট শরিকরা বলছে, সরকারবিরোধী আন্দোলন নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। শরিকদের মধ্যে যাতে প্রশ্ন না ওঠে, সেদিকে নজর রাখতে হবে। শরিকরা যাতে মনে না করে, কোনো জোট বা দলকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। যেমন ২০১৮ সালে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টকে দেওয়া হয়েছিল। জোটের নেতাদের মতে, যুগপৎ আন্দোলনের ভিত্তি হিসেবে একটি ঘোষণাপত্রের প্রয়োজন।
গত ৩০ ডিসেম্বর গণমিছিলের কর্মস‚চি দিয়ে জোটের যুগপৎ কর্মস‚চি শুরু হয়। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শরিকদের সঙ্গে আলোচনা করে না বিএনপি। অনেকটা এককভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে বাকিদের জানিয়ে দেয় দলটি। এ কারণে যুগপৎ আন্দোলনের শরিক কয়েকটি দল বিএনপি-ঘোষিত কর্মস‚চি পালনে শিথিলতা দেখায়।
গত ৭ ডিসেম্বর তোপখানা রোডে নাগরিক ঐক্যের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে গণতন্ত্র মঞ্চ ১৪ দফা তুলে ধরেছিল। পরে বিএনপির ১০ দফা ও গণতন্ত্র মঞ্চের ১৪ দফা মিলিয়ে যৌথ দাবি হিসেবে ৭ দফার খসড়া তৈরি হয়। সেটিসহ গণতান্ত্রিক বাম ঐক্যের ১৩ দফা ও শরিক অন্য দলের নেতাদের মতামত নিয়ে স্থায়ী কমিটির বৈঠকে আলোচনা হয়। সর্বশেষ লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) প্রেসিডেন্ট কর্নেল (অব.) ড. অলি আহমদের সঙ্গে গুলশানের কার্যালয়ে এ বিষয়ে বৈঠক করে বিএনপি।
বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পাটির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক দেশ বর্তমানকে বলেন, ‘আগামী দিনে আন্দোলন বেগবান করতে আমরা কিছু দফা দিয়েছি। যতটুকু জানি, বিএনপি স্থায়ী কমিটি বৈঠক করেছে। বিষয়গুলো নিয়ে তারা আরও আলোচনা করবে। দফাগুলো নিয়ে তারা আমাদের সঙ্গে বসবে বলে জানিয়েছে। এ বিষয়ে আলোচনার জন্য সঠিক দিনক্ষণ ঠিক হয়নি।’
‘জাতীয়তাবাদী সমমনা জোট’ নামে ১১-দলীয় জোটে রয়েছে ন্যাশনাল পিপলস পার্টি (এনপিপি), জাগপা (খন্দকার লুৎফুর), ডেমোক্রেটিক লীগ (ডিএল), বাংলাদেশ ন্যাপ, বিকল্প ধারা (নুরুল আমিন), সাম্যবাদী দল, গণদল, ন্যাপ-ভাসানী, ইসলামী ঐক্যজোট, পিপলস লীগ ও বাংলাদেশ সংখ্যালঘু জনতা পার্টি।
১২-দলীয় জোটে আছে জাতীয় পার্টি (কাজী জাফর), কল্যাণ পার্টি, জাতীয় দল, বাংলাদেশ এলডিপি, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা, তাসমিয়া প্রধান), এনডিপি, এলডিপি (সেলিম), মুসলিম লীগ, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, ইসলামী ঐক্যজোট, ইসলামী দল ও সাম্যবাদী দল। লেবার পার্টি আলাদাভাবে বিএনপির সঙ্গে আন্দোলনে রয়েছে। ইসলামী ঐক্যজোট ও সাম্যবাদী দল নতুন দুটি জোটেই আছে।
এ ছাড়া গণতন্ত্র মঞ্চের দলগুলো হলো জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি), নাগরিক ঐক্য, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, গণসংহতি আন্দোলন, গণ অধিকার পরিষদ, ভাসানী অনুসারী পরিষদ ও রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন। গণ অধিকার পরিষদ জোট থেকে বেরিয়ে গেলেও তারা বিএনপির নেতৃত্বে আন্দোলনে থাকবে। তারা বেরিয়ে যাওয়ায় গণতন্ত্র মঞ্চে ছয়টি দল রয়েছে।
সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি, সমাজতান্ত্রিক মজদুর পার্টি, বাংলাদেশের সাম্যবাদী দল (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী) ও প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক দল মিলে ২০১৭ সালে গণতান্ত্রিক বাম ঐক্য নামে জোট গঠন করে। এ ছাড়া কর্নেল (অব.) অলির নেতৃত্বাধীন এলডিপি, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও গণফোরামের দুই অংশ (ড. কামাল ও মোস্তফা মহসিন মন্টু) বিএনপির সঙ্গে আন্দোলনে রয়েছে।
দিকে গতকাল বৃহস্পতিবার আবারও নতুন কর্মস‚চি ঘোষণা করেছে বিএনপি। সকালে রাজধানীর নয়াপল্টনে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী এ কর্মস‚চি ঘোষণা দেন। কর্মস‚চির মধ্যে রয়েছে, ২৩ ও ২৮ মে ঢাকা ছাড়া সব মহানগরে পদযাত্রা।
রিজভী বলেন, উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অধীনস্থ আদালত এবং সরকারের অবজ্ঞা, মামলা ও গ্রেপ্তার, পুলিশি হয়রানি, দ্রব্যম‚ল্যের ঊর্ধ্বগতি, বিদ্যুতের লোডশেডিং, সরকারের দুর্নীতিসহ ১০ দফা বাস্তবায়নের দাবিতে এ কর্মস‚চি পালিত হবে। এরই মধ্যে এ দাবিতে গত বুধবার ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণে বিএনপির পদযাত্রায় সাধারণ মানুষের বিপুল সমাগম ঘটেছে। তিনি বলেন, আমরা আন্দোলনে দলীয় নেতাকর্মীদের পাশাপাশি সমাজের সব শ্রেণী পেশার মানুষকে আহবান জানাই আসুন অবৈধ সরকারকে পদত্যাগে বাধ্য করি।
বিএনপির দলীয় ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো জানায়, আসন্ন কোরবানির ঈদের পর ঢাকায় বড় ধরনের অবস্থান কর্মসূচির কথা ভাবা হচ্ছে। সেখান থেকে লাগাতার অবরোধ,অবস্থান, হরতালের মতো কর্মসূচি দিয়ে সরকারকে পদত্যাগে বাধ্য করা হবে।