রাজধানীতে ছিনতাইকারীরা বেপরোয়া

অর্ধশতাধিক স্পটে ঘটনা ঘটছে, নারী পকেটমারের বড় চক্র সক্রিয়

রাজধানীতে বেপরোয়া হয়ে ওঠেছে পকেটমার ও ছিনতাইকারী চক্র। পুরুষ ছিনতাইকারীর পাশাপাশি নারী পকেটমারের বড় একটি চক্রও সক্রিয় রয়েছে। ব্যস্ততম নগরী ঢাকার প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে অলিগলি, পাড়া-মহল্লা, শপিংমল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতালসহ অন্তত অর্ধশতাধিক স্পটে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে। মোবাইলফোন, টাকা-পয়সা খোয়ানোর পাশাপাশি ছিনতাইকারীদের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে অনেককেই প্রাণ দিতে হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট তথ্য মতে, ঢাকার খিলগাঁও, মালিবাগ রেলগেট, মগবাজার, দৈনিক বাংলার মোড়, পীরজঙ্গী মাজার গেট, কমলাপুর বটতলা, মতিঝিল কালভার্ট রোড, হাতিরঝিল, শাহবাগ, বাংলামটর, কাওরান বাজার, গুলশান, বাড্ডা, ভাটারা, মিরপুর, পল্লবী, টেকনিক্যাল, রাজউক ক্রসিং, পল্টন মোড়, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ এলাকা, আজিমপুর, গুলিস্তান, গোলাপশাহ মাজার ক্রসিং, চানখাঁরপুল, হাজারীবাগ, হাইকোর্ট ক্রসিং, আব্দুল গণি রোড, ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, জিগাতলা বাসস্ট্যান্ড, নিউমার্কেট, পান্থপথ মোড়, সায়েন্স ল্যাবরেটরি, তেজগাঁও, উত্তরা, খিলক্ষেত, বিমানবন্দর, মানিকনগর স্টেডিয়ামের সামনে, বাসাবো ক্রসিং সহ প্রায় অর্ধশত স্পটে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে। এছাড়া যানবাহনে অজ্ঞানপার্টি, মলম পাটি, টানা পার্টির ভয়তো রয়েছেই। সুযোগ বুঝে ছোঁ মেরে সখের দামি মোবাইল ফোনটি নিয়ে দৌঁড় দেয়। এছাড়া যাত্রীদের চোখেমুখে মলম, মরিচের গুড়া স্প্রে করেও সবকিছু হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনা অহরহ ঘটছেই। সামনে কোরবান উপলক্ষে ছিলতাইকারী ও পকেটমাররা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠার আশঙ্কা রয়েছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সংশ্লিষ্ট এক তথ্য অনুযায়ী, ঢাকায় ছয় হাজারের বেশি ব্যক্তি ছিনতাই ও ডাকাতির মতো অপরাধের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে। তাদের মধ্যে ১ হাজার ৭৩৭ জন ছিনতাই এবং ৪ হাজার ৪৬১ জন ডাকাতিতে জড়িত। ডিএমপি’র কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডারে এসব অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের পূর্ণাঙ্গ বৃত্তান্ত রয়েছে। এতে ঢাকার ৫০টি থানা এলাকায় ছিনতাই-ডাকাতিতে জড়িত ব্যক্তিদের তথ্য রয়েছে। সূত্র বলেছে, ঢাকায় সাধারণত পথ আটকে অস্ত্রের মুখে টাকাপয়সা ও মূল্যবান মালামাল নিয়ে নেয় ছিনতাইকারীরা। এ ঘটনায় কোনো দলে পাঁচজনের কম থাকলে ছিনতাই আর পাঁচজন বা তার বেশি থাকলে ডাকাতির মামলা দেওয়া হয়ে থাকে। সেভাবেই তথ্যভান্ডারে অপরাধের ধরণ উল্লেখ করা হয়েছে।

পুলিশের হিসাব অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি তালিকাভুক্ত ছিনতাইকারী ও ডাকাত রয়েছে তেজগাঁও বিভাগে। সবচেয়ে কম মিরপুর বিভাগে। থানা হিসেবে ছিনতাইকারী ও ডাকাতের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি ভাটারা, শাহবাগ ও শেরেবাংলা নগর থানা এলাকায় (প্রতিটি থানায় ৩৪ জন করে)। এরপর রয়েছে হাজারীবাগ, মোহাম্মদপুর, বিমানবন্দর, খিলক্ষেত, তেজগাঁও, রমনা, হাতিরঝিল ও উত্তরা পশ্চিম থানা এলাকায়। তথ্যভান্ডার অনুযায়ী, সবচেয়ে কম ছিনতাইকারী ও ডাকাতের নাম তালিকাভুক্ত হয়েছে উত্তরখান, দক্ষিণখান ও উত্তরা পূর্ব থানায়। এই তিন থানা এলাকার ৬ জন করে মোট ১৮ জন তালিকাভুক্ত হয়েছে।

বর্তমানে রাজধানীর অনেক ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের রহস্যের জট খুলতে এই তথ্যভান্ডারকে কাজে লাগানো হচ্ছে বলে জানান সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। অবশ্য সংশ্লিষ্ট থানা ও বিভাগের পুলিশ কর্মকর্তাদের দাবি, যেসব এলাকায় ছিনতাইকারী ও ডাকাত বেশি গ্রেফতার হয়েছে, সেসব থানা এলাকার অপরাধীর বৃত্তান্ত তথ্যভান্ডারে যুক্ত হয়েছে বেশি।

পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, এলাকাভিত্তিক ছিনতাই বেশি হয় বাড্ডা, ভাটারা, মিরপুর ও পল্লবী এলাকায়। শাহবাগ, মগবাজার, রমনা, মালিবাগ রেলগেট, চানখাঁরপুল, ঢাকা মেডিকেল কলেজ এলাকা, গুলিস্তান, ধানমন্ডি, জিগাতলা বাসস্ট্যান্ড, নিউমার্কেট, পান্থপথ মোড় ও সায়েন্স ল্যাবরেটরি এলাকায়ও ছিনতাইয়ের ঘটনা বেশি ঘটছে। ছিনতাইকারীরা সাধারণত মধ্যরাত থেকে ভোর পর্যন্ত তৎপর থাকে। তারা ভোরে বাসস্ট্যান্ড, লঞ্চ টার্মিনাল ও রেলস্টেশন থেকে বাসামুখী রিকশাযাত্রী অথবা বাসা থেকে স্টেশনমুখী যাত্রীদের লক্ষ্যবস্তু বানায়। কারওয়ান বাজারসহ রাজধানীর বিভিন্ন আড়তমুখী ব্যবসায়ীদেরও লক্ষ্যবস্তু করে ছিনতাইকারীরা।

এ ছাড়া নির্জন গলিতে ধারালো অস্ত্র ও আগ্নেয়াস্ত্র ঠেকিয়ে পথচারীদের টাকাপয়সা কেড়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটে। আবার গাড়ি ও মোটরসাইকেলে করে পথ আগলে মানুষের টাকা, মোবাইলফেন বা স্বর্ণালংকার কেড়ে নেয় কোনো কোনো চক্র। কোনো দলে পাঁচজনের কম থাকলে ছিনতাই আর পাঁচজন বা তার বেশি থাকলে ডাকাতির মামলা দেওয়া হয়ে থাকে।

এলাকাভেদে ছিনতাইয়ের ধরনেও পার্থক্য আছে। যেমন বিমানবন্দর সড়কে পুলিশ, গোয়েন্দা শাখাসহ (ডিবি) বিভিন্ন সংস্থার পরিচয়ে বেশির ভাগ ছিনতাই হয়। এসব ছিনতাইকারী রাস্তায় ভুয়া চেকপোস্ট বসিয়ে বিদেশফেরত যাত্রীদের গাড়ি থামিয়ে সবকিছু ছিনিয়ে নেয়। এমন অনেক অপরাধী বিভিন্ন সময় ধরাও পড়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ডিএমপি এই তথ্যভান্ডার গড়ে তুলেছে সাসপেক্ট আইডেন্টিফিকেশন অ্যান্ড ভেরিফিকেশন সিস্টেম (এসআইভিএস) নামের একটি সফটওয়্যারের মাধ্যমে। তাতে ডাকাতি ও ছিনতাইয়ে জড়িত ৬ হাজার ১৯৮ জনের ছবিসহ নাম, বয়স, পিতার নাম, বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা, আঙ্গুলের ছাপ, গ্রেফতারের তারিখ, তাদের বিরুদ্ধে মামলার সংখ্যা, গ্রেফতারকারী কর্মকর্তার নাম-পদবি ও মোবাইল নম্বর রয়েছে।এ প্রক্রিয়া যেহেতু চলমান, তাই অপরাধীর সংখ্যা আরও বাড়তে থাকবে।

ডিএমপির একজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ঢাকায় অপরাধ নিয়ন্ত্রণে রাখতে এসআইভিএস গড়ে তোলা হয়েছে। এর মাধ্যমে অপরাধী শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। যেসব অপরাধী ধরা পড়ছে, তাদের বৃত্তান্ত এসআইভিএসে প্রতিনিয়ত যুক্ত হচ্ছে।

বর্তমানে রাজধানীর অনেক ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের রহস্যের জট খুলতে এই তথ্যভান্ডারকে কাজে লাগানো হচ্ছে বলে জানান সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। উদাহরণ হিসেবে পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, গত ১২ মে ভোরে একটি ডাকাত দলের কবলে পড়েন পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) নারী কনস্টেবল নার্গিস আক্তার (৩৩)। রিকশা থামিয়ে তার কাছ থেকে সোনার চেইন, নগদ টাকা ও মেবাইলফোন ছিনিয়ে নিয়ে যায় ডাকাতেরা। একই রাতে ধানমন্ডিতে আরেকটি ডাকাতি করে একই চক্র।

পরদিন ১৩ মে তেজগাঁও ও বনানী থানা এলাকায় আরও দুটি ডাকাতি করে তারা। ডাকাতির ঘটনায় পল্টন থানায় মামলা করেন নার্গিস আক্তার। তদন্ত করতে গিয়ে সিসিটিভি ক্যামেরার শতাধিক ফুটেজ থেকে ডাকাত চক্রকে চিহ্নিত করা হয়। পরে এসআইভিএসের সঙ্গে ছবি মিলিয়ে তাদের অবস্থান নিশ্চিত হয়ে ১৫ মে মহাখালী থেকে ডাকাত দলের চারজনকে গ্রেফতার করে পল্টন থানা পুলিশ।

এর আগে গত বছরের ২৭ মার্চ ভোরে মিরপুরের শেওড়াপাড়া বাসস্ট্যান্ডে ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে নিহত হন দন্ত চিকিৎসক আহমেদ মাহী (৩৯)। এ ঘটনায় ডিএমপির গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) পাঁচজনকে গ্রেফতার করে। এদিকে নারী পকেটমাররা বোরকা পরে, কখনো অত্যাধুনিক পোশাক পরে, কখনো ছোট বাচ্চা কোলে নিয়ে স্নেহময়ী মায়ের অভিনয় করে সহসাই ঢুকে যায় জনারণ্যে। চোখের পলকে হাতিয়ে নেয় মোবাইল, নগদ টাকা ও ব্যাগে থাকা মূল্যবান জিনিসপত্র।

বোরকা পরা অবস্থায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শপিং মল, হাসপাতাল, বাস স্টপেজে ঘুরে বেড়ান তারা। এসব জায়গায় বোরকায় শরীর ঢেকে চললেও আড়ালে এসব নারী আসলে পকেটমার হিসেবে কাজ করছেন। এরা সবাই সংবদ্ধ দলের সদস্য। স¤প্রতি এ চক্রের ছদ্মবেশী ৯ নারী পকেটমার ও তাদের ৭ মহাজনসহ ১৬জনকে গ্রেফতার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।

এ সময় তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে বিভিন্ন মডেলের ৪০টি মোবাইল ফোন। দুটি মোবাইল ফোন হারানোর ঘটনা তদন্ত করতে গিয়ে এ চক্রের সন্ধান পায় ডিবি। গ্রেফতার ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ ও তদন্তে এসব তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন ডিবির লালবাগ বিভাগের ডিসি মশিউর রহমান।

এ বিষয়ে রাজধানীর মিন্টো রোডে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে সম্প্রতি আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ডিবির লালবাগ বিভাগের ডিসি মশিউর রহমান বলেন, রমনা ও লালবাগের বিভিন্ন মার্কেট, হাসপাতাল এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আসা নারীদের ব্যাগ বা পকেট কেটে মোবাইল ও টাকা বিশেষ কৌশলে চুরি করার জন্য গড়ে উঠেছে নারী পকেটমারের বড় চক্র। এরা বিভিন্ন ছদ্মবেশে বিভিন্ন জনারণ্যে দাপিয়ে বেড়ায়। চোখের পলকে মোবাইল, টাকা ও স্বর্ণালংকার হাতিয়ে নেয়।

গ্রেফতারকৃতরা নিউমার্কেট, আজিমপুর, গুলিস্তান, গোলাপশাহ মাজার, ফুলবাড়িয়াসহ বিভিন্ন বাসস্ট্যান্ড, স্কুল-কলেজ, মার্কেট ও হাসপাতালে বিশেষ কৌশলে নারীদের ভ্যানিটিব্যাগ এবং পুরুষদের শার্ট-প্যান্টের পকেট থেকে মোবাইল ও নগদ টাকা চুরি করতো।

ডিবি কর্মকর্তা বলেন, বর্ষা আগে কাজ করেছেন ডিজে শিল্পী হিসেবে। পরে বান্ধবীদের হাত ধরে নতুন মডেলের মোবাইল পাওয়ার আশায় যুক্ত হন মোবাইল পকেটমারির কাজে। গত পাঁচ বছরে এ কাজ করে ধরা খেয়েছেন তিনবার, ছাড়া পেয়ে একই কাজে ফিরেছেন। এই চক্রের সদস্যরা একসঙ্গে দুজন থাকে। একজন টার্গেট করে মহিলাকে চাপ দেন, অন্যজন কৌশলে চোখের পলকে ভ্যানিটিব্যাগের জিপার খুলে মোবাইলফোন, নগদ টাকা, স্বর্ণালংকার ছিনিয়ে নেন।

গ্রেফতারদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় একাধিক মামলা রয়েছে। গত ১৪ জুন শাহবাগ থানা ও লালবাগ থানায় দায়ের করা মামলায় আসামিদের গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়। আদালত নারী আসামিদের জেলহাজতে পাঠিয়ে দেন এবং পুরুষ আসামিদের দুই দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

মার্কেট, স্কুলের ফটক, হাসপাতাল বা বাস স্টপেজে থাকা অবস্থায় নিজের মালামাল নিয়ে আরও সতর্ক থাকার আহŸান জানিয়ে ডিবির কর্মকর্তা মশিউর রহমান বলেন, মোবাইল বা অন্য জিনিস চুরি বা হারিয়ে গেলে থানায় সাধারণ ডায়েরি বা মামলা করতে হবে। উদ্ধার হওয়া ৪০টি মোবাইলের মধ্যে মাত্র একটি ফোন হারানোর জিডি পাওয়া গেছে। আইনি ব্যবস্থা নিলে কখনো না কখনো সুফল পাওয়া যায় বলেও জানান তিনি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিশেষ করে ছিনতাইয়ের ঘটনায় ভূক্তভোগীরা বেশিরভাগ সময় ঝামেলা এড়াতে থানা-পুলিশে অভিযোগ দিতে চান না। আর যেসব ঘটনা বেশি আলোচিত হয়, শুধু সেগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়। অভিযান চালিয়ে মাঝে মধ্যে পুলিশ ছিনতাইকারীকে গ্রেফতার করলেও কিছুদিন পর জামিনে বেরিয়ে আবার পুরোনো কাজে যুক্ত হয়। ছিনতাইকারীদের প্রতিরোধ করতে হলে তাদেরকে সঠিকভাবে পুনর্বাসনের পাশাপাশি এলাকায় এলাকায় কমিউনিটি পুলিশিং মজবুত করা দরকার বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। গোয়েন্দা পুলিশের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ছিনতাইকারী চক্রের একাধিক মটরসাইকেল পার্টি ছিনতাই করে বেড়াচ্ছে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় । তাদেরকে ঠেকাতে গোয়েন্দারা নিয়মিত অভিযান চালিয়ে যাচ্ছেন।