মোদির বিরুদ্ধে নির্বাচনী জনসভায় ‘মুসলিমবিদ্বেষী’ মন্তব্যের অভিযোগ, তুমুল বিতর্ক

ভারতে লোকসভা নির্বাচনের মধ্যে দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিরুদ্ধে ‘মুসলিমবিদ্বেষী’ মন্তব্য করার অভিযোগ উঠেছে। যা নিয়ে শুরু হয়েছে জোর বিতর্ক ও সমালোচনা। ভারতীয় মুসলিম নেতাদের পাশাপাশি বিরোধী নেতারাও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। সিএনএন। বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশ ভারতে গত শুক্রবার (১৯ এপ্রিল) লোকসভা নির্বাচনের প্রথম ধাপের ভোট অনুষ্ঠিত হয়। দ্বিতীয় ধাপে ১৩ রাজ্যের ৮৯টি লোকসভা আসনের ভোটগ্রহণ হবে আগামী ২৬ এপ্রিল। প্রথম দফার ভোটের পরদিন থেকেই শুরু হয় দ্বিতীয় দফার ভোটের প্রচার। বিজেপি-কংগ্রেস-তৃণমূলসহ রাজনৈতিক দলগুলো শেষ মুহূর্তে ভোটারদের মনজয়ে মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছেন। কী বলেছেন মোদি  গত রোববার (২১ এপ্রিল) রাজস্থান রাজ্যের বাঁশবাড়া কেন্দ্রে বিজেপির এক নির্বাচনী জনসভায় অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী মোদি। ওই জনসভায় তিনি মুসলিমবিদ্বেষী মন্তব্য করেছেন বলে অভিযোগ বিরোধীদের। বিরোধীরা বলছেন, লোকসভার প্রথম দফায় ভোটের হার আশানুরূপ না হওয়ায় মোদি সরাসরি ধর্মীয় মেরুকরণের পথে হাঁটলেন। জনসভায় প্রধান বিরোধী দল ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেসকে (আইএনসি) জড়িয়ে মুসলিমদের বিরুদ্ধে আক্রমণ শানান মোদি। বলেন, কংগ্রেস ক্ষমতায় এলে দেশের সম্পদ মুসলিমদের মধ্যে বণ্টন করে দেবে। হিন্দুদের পারিবারিক সোনা-রুপার সঙ্গে বিবাহিত নারীদের গলায় পরা পবিত্র মঙ্গলসূত্র পর্যন্ত তারা কেড়ে নিয়ে বাঁটোয়ারা করে দেবে। সিএনএনের প্রতিবেদন মতে, ওই মন্তব্যে মোদি মুসলিম শব্দটি সরাসরি উল্লেখ করেন। এছাড়াও ‘অনুপ্রবেশকারী’ ও ‘যারা অনেক সন্তান জন্ম দেয়’ এমন দুটি শব্দ ও শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করেন তিনি। এই দুটি শব্দ দিয়ে বিজেপির নেতারা সাধারণত মুসলিম সম্প্রদায়কে বুঝিয়ে থাকেন। জনসভায় উপস্থিত বিজেপি কর্মী-সমর্থকদের উদ্দেশে মোদি বলেন, যখন তারা (কংগ্রেস) ক্ষমতায় ছিল, তারা বলেছিল, সম্পদের ওপর মুসলিমদের অগ্রাধিকার। তারা তোমাদের সমস্ত ধন-সম্পদ একত্র করে যাদের বেশি সন্তান আছে তাদের মধ্যে বণ্টন করে দেবে। তারা অনুপ্রবেশকারীদের মধ্যে বিতরণ করবে। জনসভায় উপস্থিত কর্মী-সমর্থকদের কাছে মোদি এবার জানতে চান, তারা কি চান, তাদের কষ্টার্জিত সম্পত্তি মুসলিমদের মধ্যে, যাদের অনেক বাচ্চাকাচ্চা হয় তাদের মধ্যে, অনুপ্রবেশকারীদের মধ্যে ভাগ-বাঁটোয়ারা করে দেয়া হোক। এবারের ভোটে কংগ্রেস ও মুসলিমদের সমার্থক করে এই প্রথম সরাসরি আক্রমণ করলেন মোদি। তিনি আরও বলেন, মুসলিমদের মধ্যে সম্পত্তি বণ্টন করার কথা কংগ্রেসের এবারের নির্বাচনী ইশতেহারেও বলা হয়েছে। তার দাবি, প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে মনমোহন সিংও বলেছিলেন, দেশের সম্পত্তির ওপর মুসলিমদের অধিকার সবার আগে। সম্প্রতি তেলেঙ্গানায় দেয়া এক ভাষণে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী বলেছিলেন, কোন এক শ্রেণির হাতে দেশের কত সম্পদ, জাতগণনার পাশাপাশি ক্ষমতায় এলে কংগ্রেস তা জরিপ করে দেখবে। রাহুল বরাবর অভিযোগ করে আসছেন, প্রধানমন্ত্রী মোদি শুধু ঘনিষ্ঠ কিছু পুঁজিপতির স্বার্থ দেখেন। তার আমলে দেশের ১ শতাংশ মানুষ ৪০ শতাংশ সম্পদের মালিক হয়েছেন। রাহুলের সেই বক্তব্যের রেশ ধরেই রোববার রাজস্থানের জনসভায় মোদি বলেন, মনমোহন সিং প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে বলেছিলেন, দেশের সম্পদের প্রথম অধিকারী মুসলিমরা। এবার কংগ্রেস তার ইশতেহারে বলেছে, ক্ষমতায় এলে আপনাদের রোজগারে অর্জিত সম্পদ মুসলিমদের মধ্যে বিলিবণ্টন করে দেবে। তিনি আরও বলেন,
মা-বোনেদের কাছে থাকা সোনা–রুপার হিসাব কষা হবে। তারপর তা বিলি করা হবে তাদের মধ্যে, যারা অনুপ্রবেশকারী, যাদের অনেক বাচ্চাকাচ্চা হয়। মা-বোনেদের মঙ্গলসূত্রও তাদের হাত থেকে রেহাই পাবে না। কংগ্রেসের ভাবনাকে ডাকাতদের মনোবৃত্তির সঙ্গে তুলনা করে উপস্থিত কর্মী-সমর্থকদের কাছে তিনি জানতে চান, তারা তা মেনে নেবে কি না। মোদির কথায়, আপনারা কি মনে করেন, আপনাদের কষ্টার্জিত অর্থ অনুপ্রবেশকারীদের দেয়া উচিত? আপনারা কি তা মেনে নেবেন?  বিরোধী শিবিরের কঠোর প্রতিক্রিয়া মোদির এসব মন্তব্য ভারতের রাজনীতিতে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে এবং বিরোধী শিবিরে ব্যাপক বিতর্ক উসকে দিয়েছে। বিরোধীরা দীর্ঘদিন ধরেই মোদি ও তার দল বিজেপিকে ক্রমবর্ধমান হিন্দু জাতীয়তাবাদ উসকে দেয়ার জন্য বিভাজনমূলক বক্তব্য ব্যবহারের জন্য অভিযুক্ত করে আসছেন। মোদির এসব মন্তব্য নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন করেছে কি না ভারতের নির্বাচন কমিশনকে (ইসিআই) তা তদন্ত করার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
আচরণবিধিতে বলা হয়েছে রাজনীতিবিদদের অবশ্যই ‘জাতপাত’ এবং ‘সাম্প্রদায়িক অনুভূতি’র ভিত্তিতে ভোটারদের কাছে ভোট চাওয়া যাবে না। ভারতের নানা সম্প্রদায় ও ধর্মের মধ্যে ‘বিভেদ বাড়াতে পারে বা পারস্পরিক ঘৃণা বা উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে’ এমন কর্মকাণ্ডও অনুমোদিত নয়।
কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে বলেছেন, প্রথম দফার ভোট বিজেপির বিরুদ্ধে গেছে বলে প্রধানমন্ত্রীর মাথা খারাপ হয়ে গেছে। বেশ বোঝা যাচ্ছে, মোদি হতাশ হয়ে পড়েছেন। কারণ প্রথম দফায় ‘ইন্ডিয়া’ জোট এগিয়ে গেছে। মোদি তাই ঘৃণা-বিদ্বেষের আশ্রয় নিয়েছেন। ক্ষমতার জন্য অসত্য কথা বলছেন। বিরোধীরা যা বলেনি, তা বলে মানুষকে বিপথে চালিত করছেন। আরএসএস ও বিজেপির শিক্ষা ও প্রশিক্ষণই এমন। রাহুল গান্ধী বলেছেন, এটা হতাশার লক্ষণ। প্রথম দফার ভোট বিরুদ্ধে গেছে বুঝতে পেরে প্রধানমন্ত্রী এখন মিথ্যার আশ্রয় নিচ্ছেন। মিথ্যা ভাষণে তিনি এতটাই নিচে নেমেছেন যে এখন মানুষের নজর ঘোরাতে চাইছেন। প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে মনমোহন সিং বারবার মুসলিম সমাজের ক্ষমতায়নের কথা বলে এসেছেন। মোদি তা বিকৃত করছেন। কংগ্রেস নেতা রাহুল আরও বলেন, কংগ্রেসের এবারের ইশতেহার বৈপ্লবিক। এবার মানুষ তার পরিবার, কর্মসংস্থান ও ভবিষ্যতের কথা ভেবে ভোট দেবে। অন্য ভাবনায় বিচ্যুত হবে না। কংগ্রেসের আরেক নেতা জয়রাম রমেশ বলেন, তরুণ-তরুণী, কৃষক, দলিত, অনগ্রসরদের অভিযোগ নিয়ে একটি প্রশ্নেরও জবাব দিচ্ছেন না মোদি। লজ্জাজনকভাবে তিনি শুধু দেশের মানুষকে অপমান করে যাচ্ছেন। কংগ্রেস মুখপাত্র পবন খেরা মোদিকে ‘মিথ্যুক’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। সমাজবাদী পার্টির নেতা অখিলেশ যাদব বলেছেন,
মোদি যে মিথ্যা বলেন, তা শুধু দেশবাসীই নয়, গোটা পৃথিবী জানে। যেভাবে তিনি কংগ্রেসের ‘ন্যায়পত্র’ ও মনমোহন সিংয়ের নামে মিথ্যা অপবাদ দিলেন, তা নোংরা রাজনীতির উদাহরণ। মুসলিম নেতাদের প্রতিক্রিয়া মোদির বিতর্কিত মন্তব্যের জন্য মুসলিম সম্প্রদায়ের নেতারাও ব্যাপক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। বিশেষ করে যখন সংখ্যালঘু এই সম্প্রদায়ের অনেকেই আশঙ্কা করছেন, বিজেপির তৃতীয় মেয়াদে সারাদেশে চলমান সাম্প্রদায়িক সংকট আরও গভীর হবে। মোদির মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় লোকসভার সদস্য ও অল ইন্ডিয়া মজলিস-ই-ইত্তেহাদুল মুসলিমিনের (এআইএমআইএম) নেতা আসাউদ্দিন ওয়াইসি তার এক্স হ্যান্ডেলে লেখেন,
মোদি মুসলিমদের ‘অনুপ্রবেশকারী’ বললেন। মুসলিমদের ‘বহু সন্তানের জন্মদাতা’ বললেন। ২০০২ সালে থেকে এটাই তিনি করে আসছেন। মুসলিমদের গালি দিচ্ছেন। এটাই তার (জয়ের) একমাত্র গ্যারান্টি। ২০০২ সাল বলতে ওয়াইসি গুজরাটের ২০০২ সালের ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার কথা বুঝিয়েছেন। সেই সময় গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ওই দাঙ্গায় এক হাজারেরও মানুষ মারা যায় যাদের সিংহভাগই ছিল মুসলিম। দাঙ্গার শুরু থেকেই অভিযোগ ওঠে যে, গুজরাটের তৎকালীন বিজেপির রাজ্য সরকার পরোক্ষভাবে দাঙ্গায় উসকানি দিয়েছে এবং হত্যাযজ্ঞ থামাতে ইচ্ছাকৃতভাবে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়নি।
ওয়াইসি আরও বলেন, তিনি এসব করেন ভোট পাওয়ার জন্য। মোদির আমলেই দেশের ১ শতাংশ মানুষের হাতে পুঞ্জীভূত হয়েছে ৪০ শতাংশ সম্পদ। সাধারণ হিন্দুদের তিনি মুসলমানদের ভয় দেখাচ্ছেন অথচ তাদের সম্পদ কেড়ে ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের ধনী করছেন। বিশিষ্ট মুসলিম সাংবাদিক রানা আইয়ুব তার এক্স হ্যান্ডেলে লিখেছেন, এটা কোনো হুইসেল নয়। এটি একটি সম্প্রদায়কে টার্গেট করে সরাসরি নির্লজ্জ বিদ্বেষমূলক বক্তব্য। মুসলিমবিরোধী মন্তব্য ও ঘটনা নাটকীয়ভাবে বেড়েছেউন্নয়ন ও দুর্নীতিবিরোধী প্রতিশ্রুতি দিয়ে ২০১৪ সালে প্রথমবারের মতো ক্ষমতায় আসেন মোদি। এরপর প্রথম মেয়াদে তার জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পায় এবং পাঁচ বছর পর খোলাখুলি হিন্দুত্ববাদের রাজনীতির মাধ্যমে ২০১৯ সালের নির্বাচনে দ্বিতীয়বারের মতো নির্বাচিত হন। গত এক দশক ধরে মোদি ও তার বিজেপির বিরুদ্ধে হিন্দু জাতীয়তাবাদী নীতি এগিয়ে নেয়ার পাশাপাশি ধর্মীয় মেরুকরণের রাজনীতির জন্য অভিযুক্ত করা হয়েছে। শুধু অভিযোগই নয়, একই সমেয় সাংবিধানিকভাবে বিশ্বের বৃহত্তম ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হলেও ভারতে ইসলামফোবিয়া তথা ইসলামবিদ্বেষ এবং ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ ব্যাপকভাবে বেড়েছে।  ভারতে সংখ্যালঘু হলেও মুসলিম জনসংখ্যা নেহাত কম নয়। তাদের সংখ্যা প্রায় ২৩ কোটি। তারা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে দেশটিতে বসবাস করছে। কিন্তু কিছু হিন্দু জাতীয়তাবাদী নেতা মুসলিমদেরকে ‘বহিরাগত’ বা ‘অনুপ্রবেশকারী’ বলে একটি মিথ্যা আখ্যান ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা চালান। এমন ভিত্তিহীন ও মিথ্যা বয়ানও প্রচার করা হয় যে, মুসলিমরা ইচ্ছাকৃতভাবে বেশি বেশি সন্তান জন্ম দিয়ে হিন্দু জনগোষ্ঠীকে ছাড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। বিজেপি অবশ্য বারবার এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে যে, তারা ধর্মের ভিত্তিতে বৈষম্য করে না এবং সকল নাগরিকের সাথে সমান আচরণ করে। কিন্তু গবেষণা, বিভিন্ন প্রতিবেদন ও মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো বলছে, ভারতে বিভাজন বেড়েছে। ওয়াশিংটন-ভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ইন্ডিয়া হেট ল্যাবের এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ইসলামবিদ্বেষ বা মুসলিমবিদ্বেষী মন্তব্য ও ঘটনা নাটকীয়ভাবে বেড়েছে। ২০২৩ সালে ৬৬৮টি বিদ্বেষমূলক ঘটনা নথিভুক্ত করে সংস্থাটি। রিপোর্ট মতে, ওই ঘটনাগুলোর ৭৫ শতাংশই ঘটেছে বিজেপি শাসিত রাজ্যে।