বেসরকারী চাকরিজীবী রায়হান উদ্দিন (৩০)। মাত্র দুই দিন আগে সামাজিকভাবে আকদ হয়েছিল দীর্ঘদিনের প্রেমিকা সানজিদা সূচির সাথে। সামনে ঘটা করে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা করার কথাও ছিল। কিন্তু ভাগ্যেও কি নির্মম পরিহাস, নব দম্পতির হাতে লাগানো মেহেদীর রঙ না মুছতেই সড়ক দুর্ঘটনায় না ফেরার দেশে চলে যায় রায়হান। এ যেন বিয়ের পিঁড়িতে আর বসা হলো না রায়হানের।
গত রোববার সন্ধ্যায় সীতাকুণ্ডের ফৌজদারহাটে লরির সঙ্গে মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষে মারা যাওয়া রায়হান হাটহাজারী উপজেলার শিকারপুর ইউনিয়নের বাথুয়া এলাকার মৃত নাজিম উদ্দিনের ছেলে। তিনি চট্টগ্রাম নগরীর বেসরকারি পোর্ট সিটি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ১ম ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিলেন। গত ২ ফেব্রুয়ারি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নববধুর হাতে হাত রাখা ছবি পোস্ট এখন যেন স্মৃতি হয়ে রইল।
এদিকে হাসপাতালের ইমার্জেন্সি বিভাগের মর্গে রায়হানের লাশের পাশে নববধূ সানজিদা সূচির আহাজারিতে আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। বারবার মুর্ছা যাচ্ছে আর বলছেন, ‘আমার নওশাদকে বলেছিলাম তুমি বাইক বিক্রি করে দাও, আমাকে বলেছে বাইক বিক্রি করে দিলে আমাকে আলাদা থাকতে হবে। তুমি কি আমাকে ছাড়া থাকতে পারবা? আমি বলেছি না, আমি তোমাকে ছাড়া এক মুহূর্তও থাকবো না। আমার নওশাদ আমাকে ছেড়ে চলে গেছে।’ তার এমন আহাজারিতে সাথে থাকা আত্মীয়-স্বজনরাও কান্নায় ভেঙে পড়েন।
রায়হানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পোর্ট সিটি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সহপাঠীসহ বেশীরভাগ ছাত্র-ছাত্রী হাস্যজ্জ্বোল রায়হানের অকালে চলে যাওয়া মেনে নিতে পারছে না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যেম ফেসবুকে রায়হানের ছবি সম্বলিত শোকের স্ট্যাটাস নিউজ ফিডে ঘুরছে। গতকাল সোমবার সকাল ১১টায় নিজ গ্রাম পাটোয়া গ্রামে শায়িত করা হয় তাকে। তিনি নগরীর কাটগড় এলাকার এসএপিএল কনটেইনার ডিপোতে চাকরি করতেন।
শুধু রায়হান নয়, গত ২৪ দিনে চট্টগ্রামে ৪ মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় প্রাণ হারাল ৬ জন।
এর আগে ২২ জানুয়ারি বিকালে চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার পদুয়া ইউনিয়নের নয়াপাড়া মসজিদের সামনে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে ট্রাকচাপায় ৩ জন মোটরসাইকেল আরোহী নিহত হয়েছেন। নিহতরা হলেন- লোহাগাড়ার পদুয়া এলাকার জালাল আহমদের ছেলে মো. আবছার (৪০), চুনতি এলাকার আব্দুল কাদেরের ছেলে জুবায়ের (২৫) ও রাঙ্গুনিয়া উপজেলার বাবুলের ছেলে মো. জাহেদ (২৭)।
এর আগের দিন ২১ জানুয়ারি রাতে কর্ণফুলী উপজেলার জামালপাড়া এলাকায় ট্রাকের ধাক্কায় মো. জিহাদ (২২) নামের এক মোটরসাইকেল আরোহী নিহত হন। নিহত জিহাদ বাঁশখালী উপজেলার জহির উদ্দিন হেলালের ছেলে।
১২ জানুয়ারি রাতে মোটরসাইকেল নিয়ে বন্ধুর বাড়িতে বেড়াতে যাওয়ার পথে বোয়ালখালীর উপজেলার কালুরঘাট-বেঙ্গুরা সড়কের একটি কালভার্টের সাথে ধাক্কা লেগে আবদুল্লাহ আল হোসাইন (২০) নামের এক তরুণের মৃত্যু হয়েছে। আবদুল্লাহ কুমিল্লার চান্দিনা থানার মাইচখার ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ড কালেমসার হাজী বাড়ির মো. হুমায়ুন কবীরের ছেলে।
চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ (চমেক) হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ নুরুল আলম আশেক দেশ বর্তমানকে গতকাল সোমবার বিকালে বলেন, সড়ক দুর্ঘটনায় আহত রায়হান উদ্দিনকে চট্টগ্রাম মেডিক্যালে কলেজ হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করে। তার সাথে থাকা সহকর্মীও গুরুত্বর আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
তিনি আরও বলেন, প্রায় সময় মোটরসাইকেল সড়ক দুর্ঘটনায় আহতরা হাসপাতালে ভর্তি হন। বেশীরভাগ প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরলেও তাদের মধ্যে অনেকেই গুরুতর আহত হয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করে বলেও জানান পুলিশ ফাঁড়ির এই ইনচার্জ।
নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা)’র চট্টগ্রাম নগর কমিটির সভাপতি এস এম আবু তৈয়ব দেশ বর্তমানকে বলেন, দিন দিন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে সড়ক দুর্ঘটনা। বেপরোয়া গতি, ওভারটেকিং, ট্রাফিক আইন অমান্য, সড়কে চালকের প্রতিযোগিতা ও উদাসীনতার কারণে দুর্ঘটনা বাড়ছে। দুর্ঘটনা রোধে ট্রাফিক পুলিশ বিভাগে দায়িত্বরতরা সড়কে চালকদের শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে হবে এবং চালকদের মধ্যে প্রতিযোগিতাপ্রবণ মনোভাব কমাতে হবে বলেও মনে করেন তিনি।
জানতে চাইলে চট্টগ্রাম জেলার পুলিশ সুপার এস. এম. শফিউল্লাহ দেশ বর্তমানকে বলেন, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানো খুবই দুঃখজনক। সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সর্বদা তৎপর। দুর্ঘটনা রোধে সচেতনতা বৃদ্ধিসহ আইনের কঠোর প্রয়োগ বিদ্যামান আছে। মোটরসাইকেল আরোহীদের হেলমেট ব্যবহার, ওভারটেক না করা ও রাস্তার বাম পাশে গাড়ি চালানো ও বেপরোয়া গতিতে গাড়ি না চালানোর পরামর্শ দেন চট্টগ্রামের এই পুলিশ সুপার।
দেশ বর্তমান/এআই