মৃত ব্যক্তির হিসাব থেকে আমানতের টাকা উধাও!

জনতা ব্যাংকের মাগুরার প্রধান শাখায় জালিয়াতি

ব্যবসায়ী আতিকুর রহমান মারা যান এক দশক আগে। ওই সময় মাগুরার আতর আলী সড়কের জনতা ব্যাংকের প্রধান শাখায় তার নামে খোলা হিসাবে ৮ লক্ষাধিক টাকা ছিল। হিসাবে নমিনির নাম উল্লেখ ছিল না। ঠিক এই সুযোগটি নেন ব্যাংকের কর্মকর্তারা। তারা ওই টাকা তুলে আত্মসাৎ করেন।

এদিকে হঠাৎ করে আতিকুর রহমানের ব্যাংক হিসাবের কিছু কাগজপত্র খুঁজে পান পরিবারের সদস্যরা। তারা দেখেন, প্রধান শাখায় ওই টাকা রয়েছে। সম্প্রতি গচ্ছিত ওই টাকা তুলতে গেলে বাধে বিপত্তি। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ জানান, আতিকুর রহমানের সঞ্চয়ী হিসাবে কোনো টাকা নেই। পরে মৃত ব্যক্তির হিসাব থেকে আমানতের ওই টাকা উধাওয়ের বিষয়টি জানতে পারেন পরিবারের সদস্যারা।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ব্যবসায়ী আতিকুর রহমান ২০০২ সালের ৩০ মে মাগুরা জনতা ব্যাংকের প্রধান শাখায় একটি সঞ্চয়ী হিসাব (নং-০১০০০১১৩১৮২৩৬) খোলেন। তিনি ২০১৩ সালে মারা যান। মারা যাওয়ার সময় তার ওই ব্যাংক হিসেবে ৮ লাখ ৪৮ হাজার ৯২৬ টাকা সঞ্চয় ছিল। ওই হিসাবে আতিকুর রহমানের কোন নমিনির নাম উল্লেখ না থাকায় সুযোগ বুঝে ব্যাংক কর্মকর্তারা টাকা তুলে আত্মসাৎ করে। নমিনি না থাকলে নিয়মানুযায়ী মৃত ব্যক্তির গচ্ছিত টাকার মালিক হন তার উত্তরাধিকারেরা। এজন্য উত্তরাধিকার সনদের প্রয়োজন হয়। আদালতে উত্তরাধিকার সনদ পেতে হিসাবের ‘ব্যাংক স্টেটমেন্ট’ দাখিল করতে হয়। যে কারণে তার ওয়ারিসরা ব্যাংকের শাখায় ‘ব্যাংক স্টেটমেন্ট’ তুলতে যান। মূলত তখনই ওই জালিয়াতির ঘটনা ধরা পড়ে।

মৃত আতিকুর রহমানের ভাতিজা গোলাম হায়দার বলেন, আমরা গত ৩০ আগস্ট ব্যাংকস্টেটমেন্ট তুলতে গেলে ব্যাংকের ম্যানেজার জানান; ওই হিসাবে মাত্র ৩৪ হাজার ৯৯১ টাকা আছে। কিন্তু আমরা তাকে জানাই ওই হিসাবে মোট ৮ লাখ ৪৮ হাজার ৯২৬ টাকা ছিল। ওই টাকা কোথায় গেল তা জানতে চাইলে ম্যানেজার জানান, ৩৪ হাজার ৯৯১ টাকা ছাড়া আপনাদের হিসাবে কোনো টাকা নেই। টাকা না থাকলে টাকা পাবেন কিভাবে।

ঘটনা শুনে আমরা হতবাক হই। পরে ম্যানেজার মিলন কুমার দত্তের কাছে ব্যাংক হিসাবে জমা থাকা টাকার প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেখাই। তখন তিনি বিব্রতবোধ করে বলেন, আমি নতুন এসেছি। খোঁজÑখবর নিয়ে দেখি। আপনারা দু-তিনদিন পর আসেন।

ম্যানেজারের কথা মতো ৩ সেপ্টেম্বর দুপুরে ব্যাংকে যায়। তখন ম্যানেজার তাঁদের একটি ‘ব্যাংক স্টেটমেন্ট’ দেন। ওই স্টেটমেন্টে দেখা যায়, ওই ব্যাংক হিসাবে ৮ লাখ ৩৪ হাজার ৯৯১ টাকা জমা রয়েছে। অথচ দুদিন আগে বলা হয়েছিল ৩৪ হাজার ৯৯১ টাকা ছাড়া কোনো টাকা নেই। ওই ৮ লাখ টাকা দুদিনের মধ্যে কোথা থেকে একাউন্টে আসল জানতে চাইলে ম্যানেজার কোনো সদুত্তর না দিয়ে এড়িয়ে যান। তিনি বলেন, আপনাদের টাকা তো আপনারা পেয়েছেন। এ নিয়ে আর মাথা ঘামানোর দরকার নেই।

ব্যাংক স্টেটমেন্ট ও অন্য কাগজপত্র পর্যালোচনা করে জানা গেছে, মূলত আতিকুর রহমানের ওই ব্যাংক হিসাব থেকে ২০২০ সালের ১৯ অক্টোবর রামিসা এন্টারপ্রাইজ (হিসাব নম্বর- ০১০০২১৩২৬০৮৬৮) নামের চলতি হিসাবে প্রথমে ৫ লাখ টাকা সরানো হয়। যার রেফারেন্স নম্বর-এফটি২০২৯৩এম৩কেএম৬;১। নিয়মানুযায়ী টাকা সরানোর ভাউচারটি প্রস্তুত করেন ব্যাংকের তৎকালিন কর্মকর্তা মোঃ মাজেদুল ইসলাম এবং অনুমোদন দেন ব্যাংকের আরেক কর্মকর্তা রোজিনা পারভীন। এ ঘটনার ছয়দিন পর গত ২৫ অক্টোবর আতিকুর রহমানের হিসাব থেকে আবারও রামিসা এন্টারপ্রাইজের হিসাবে ৩ লাখ টাকা সরানো হয়। যার রেফারেন্স নম্বর-এফটি২০২৯৯সিএইচসি৭বি;১। এ ভাউচারটি প্রস্তুত করেন ব্যাংকের তৎকালিন কর্মকর্তা বিশ্বজিৎ কুমার বিশ্বাস এবং অনুমোদন দেন ব্যাংকের দায়িত্বশীল কর্মকর্তা রোজিনা পারভীন।

ঘটনা সম্পর্কে জানতে রামিসা এন্টারপ্রাইজের স্বত্ত্বাধিকারী শামীম আরার সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি। তবে তার স্বামী ফরিদ খান দেশ বর্তমানকে বলেন, রামিসা এন্টারপ্রাইজ নামের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানটি আমার স্ত্রীর নামে। প্রতিষ্ঠানের নামে জনতা ব্যাংকের প্রধান শাখায় একটি চলতি হিসাব (নম্বর-০১০০২১৩২৬০৮৬৮) রয়েছে। আমরা ব্যস্ত মানুষ। তাই টাকা জালিয়াতি করে আমাদের একাউন্টে সরানো সম্পর্কে আমরা আগে কিছুই জানতাম না। তবে ব্যাংকের বর্তমান ম্যানেজার কিছুদিন আগে আমাদের ব্যাংকে ডেকে নিয়ে যান। তখন তিনি একটি জমা ভাউচারে সই করিয়ে নিলে জালিয়াতির বিষয়টি জানতে পারি। যা করেছে ব্যাংকের লোকজন। এর দায় দায়িত্ব সবই তাদের।

যোগাযোগ করা হলে ওই টাকা সরানোর প্রথম ভাউচার প্রস্তুতকারী ব্যাংক কর্মকর্তা মো. মাজেদুল ইসলাম (বর্তমানে শ্রীপুর উপজেলার লাঙ্গলবাঁধ শাখার ব্যবস্থাপক) বলেন, ওই সময় আমি আমানত বিভাগে কাজ করতাম। আমার আইডি ব্যবহার করে ওই টাকা সরানো হলেও আমি ওই ব্যাপারে কিছুই জানি না। ঘটনা জানার পর গত ৪ সেপ্টেম্বর আমি বিষয়টি তদন্তের জন্য উধ্বর্তন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানিয়েছি।

তবে টাকা সরানোর দুই ভাউচারের অনুমোদনকারি কর্মকর্তা রোজিনা পারভীন ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, বিষয়টি উধ্বর্তন কর্তৃপক্ষ দেখছেন। জানতে চাইলে বর্তমানে প্রধান শাখার ব্যবস্থাপক মিলন কুমার দত্ত বলেন, উধ্বর্তন কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া আমি এ ব্যাপারে কিছুই জানাতে পারব না। আপনারা উধ্বর্তন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করুন।