দ্বিতীয় উইকেট জুটিতে শান্ত-জয়ের দুর্দান্ত ব্যাটিংয়ে বড় রানের ভিত পেয়েছিল বাংলাদেশ। তবে সেটা কাজে লাগাতে পারেননি মিডল অর্ডার ব্যাটাররা। মুমিনুল থিতু হয়েও ইনিংস লম্বা করতে পারেননি। আর টেস্টে প্রথমবার দলকে নেতৃত্ব দেওয়া লিটনও নাম লিখিয়েছেন ব্যর্থদের দলে। ফলে তিনশোর আগেই বাংলাদেশের ৫ উইকেট তুলে নিয়ে ম্যাচে ফেরে সফরকারীরা। তবে দিনের বাকিটা সময় মিরাজ-মুশফিকের দুর্দান্ত ব্যাটিংয়ে ব্যাটে নিরাপদে পার করে বাংলাদেশ।
এরপর তৃতীয় সেশনে এসে দ্রুত কয়েকটি উইকেট তুলে নিয়ে লড়াইয়ে ফেরে আফগানিস্তান। তবে শেষ বিকেলে আরেকটি জুটি দাঁড় করিয়ে ফেলেছেন মুশফিকুর রহিম আর মেহেদি হাসান মিরাজ।
মুশফিক-মিরাজ জুটিতে এখন পর্যন্ত যোগ করেছেন ৭২ রান। প্রথম ইনিংসে আগে ব্যাটিংয়ে নেমে দিনশেষে ৫ উইকেট হারিয়ে ৩৬২ রান তুলেছে বাংলাদেশ। মিরপুরে প্রথম দিনে এটিই সর্বোচ্চ দলীয় সংগ্রহের রেকর্ড। মুশফিক ৪১ আর মিরাজ ৪৩ রানে অপরাজিত আছেন।
এর আগে ২০১২ সালে বাংলাদেশের বিপক্ষে ক্যারিবীয়দের করা ৩৬১ রান এতদিন ছিল সবার ওপরে। শের-ই বাংলার মাঠে স্বাগতিকদের আগের সর্বোচ্চ ৮ উইকেটে ৩৩০ রান, ২০১০ সালে করেছিল ইংল্যান্ডের বিপক্ষে। সব মিলিয়ে টেস্টের প্রথম দিনে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ ৩৭৪ রান, শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ২০১৮ সালের চট্টগ্রাম টেস্টে।
শেরে বাংলায় সিরিজের একমাত্র টেস্টে টস জিতে বাংলাদেশকে প্রথমে ব্যাটিংয়ে পাঠান আফগান অধিনায়ক হাসমতউল্লাহ শহীদি।
ব্যাটিংয়ে নেমে শুরুতেই ধাক্কা খায় টাইগাররা। ইনিংসের দ্বিতীয় ওভারে নিজের প্রথম বলেই উইকেটের দেখা পান আফগানিস্তানের অভিষিক্ত পেসার নিজাত মাসুদ।
মাসুদের বেরিয়ে যাওয়া বলে হালকা ব্যাট ছুঁয়ে যায় জাকির হাসানের। আফগানিস্তানের ক্রিকেটারদের আবেদনে আম্পায়ার সাড়া দেননি। রিভিউ নেয় সফরকারীরা। রিপ্লেতে দেখা যায়, বল লেগেছে জাকিরের ব্যাটে (১)। দলীয় ৬ রানে প্রথম উইকেট হারায় বাংলাদেশ।
শুরুতেই উইকেট হারিয়ে চাপে পড়েছিল বাংলাদেশ। তবে নাজমুল হোসেন শান্ত ক্রিজে এসে সেই চাপ সরিয়ে দেন বোলারদের ওপর। মাহমুদুল হাসান জয়ের সঙ্গে গড়েন দারুণ এক জুটি।
চোখ ধাঁধানো সব বাউন্ডারি হাঁকিয়ে শান্ত চালু রাখেন রানের চাকা। সেই তুলনায় জয় ছিলেন একটু ধীরস্থির। শান্ত তার ফিফটিও তুলেছেন দ্রুতগতিতে, মোটে ৫৮ বলে। যার মধ্যে ৪০ রানই আসে বাউন্ডারিতে। পরের ৫০ রান তুলতে অবশ্য খেলেছেন দুই বল বেশি (৬০ বল)। বাউন্ডারি হাঁকান আরও ৮টি।
গত এপ্রিলে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে মিরপুর টেস্টে দুই ইনিংসে করেছিলেন ০ আর ৪। তবে এরপর আইরিশদের বিপক্ষে ইংল্যান্ডের মাটিতে দুর্দান্ত এক সেঞ্চুরিসহ ওয়ানডে সিরিজের সেরা ক্রিকেটার হয়েছিলেন শান্ত।
সীমিত ওভারের সে ফর্ম এবার সাদা পোশাকেও টেনে আনলেন বাঁহাতি এই ব্যাটার। মারকুটে খেলে ক্যারিয়ারের তৃতীয় সেঞ্চুরি তুলে নেন ১১৮ বলে।
ফিফটি পেয়েছেন তার বড় জুটির সঙ্গী জয়ও। তবে তিনি বেশ দেখেশুনে খেলেছেন। ১০২ বলে হাফসেঞ্চুরি পূর্ণ করেন টাইগার ওপেনার। লেগস্পিনার জহির খানের বলে দুইবার ওভার থ্রো হলে দৌড়ে ৫ রান নেন শান্ত আর জয়। তাতেই ফিফটির ঘরে পা পড়ে জয়ের। যদিও সেঞ্চুরির সুযোগ হাতছাড়া করেছেন ভুলভাল শট খেলে।
বেশ ক্লান্ত দেখাচ্ছিল জয়কে। বারকয়েক আলগা শট খেললেন। অবশেষে উইকেটটা জমা দিয়ে এলেন ডানহাতি এই ওপেনার। জয়ের আউটে ভাঙে শান্তর সঙ্গে ২৬৭ বলে গড়া ২১২ রানের বড় জুটি। টেস্টে দ্বিতীয় উইকেটে এটি বাংলাদেশের দ্বিতীয় সেরা জুটি।
পার্টটাইম লেগস্পিনার রহমত শাহর বেরিয়ে যাওয়া বলে কাট করতে গিয়ে স্লিপে ক্যাচ দিয়েছেন জয়। ১৩৭ বল খেলে গড়া তার ৭৬ রানের ইনিংসে ছিল ৯টি বাউন্ডারির মার। বাংলাদেশ চা-বিরতিতে যায় ৪৯ ওভারে ২ উইকেটে ২৩৫ রান নিয়ে।
বিরতির পর ঘুরে দাঁড়ায় আফগানিস্তান। মুমিনুল হকের অফফর্ম কাটছেই না। আফগানিস্তানের বিপক্ষে টেস্টের আগে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ‘এ’ দলের বিপক্ষে রানে ফেরার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। এবার ব্যর্থ হলেন টেস্ট খেলতে নেমেও।
আফগান অভিষিক্ত পেসার নিজাত মাসুদের লেগ সাইডে বেরিয়ে যাওয়া বলে ব্যাট ছুঁইয়ে সাজঘরে ফিরেছেন মুমিনুল (১৫)। আম্পায়ার অবশ্য শুরুতে আউট দেননি। রিভিউ নিয়ে আম্পায়ারের সিদ্ধান্ত বদলায় আফগারা।
এরপর ফিরে যান দুর্দান্ত খেলা নাজমুল হোসেন শান্তও। তার ক্যারিয়ারসেরা ইনিংসটি ১৬৩ রানের। শান্ত যেমন আত্মবিশ্বাস নিয়ে খেলছিলেন, তাতে সেই ইনিংস ছাড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ ছিল। কিন্তু একটা সময় ধৈর্যের বাধ ভেঙে গেলো বাঁহাতি এই ব্যাটারের।
আফগান বাঁহাতি স্পিনার আমির হামজার বলে ডাউন দ্য উইকেটে এসে মিডউইকেটে ক্যাচ দিয়ে ফিরলেন শান্ত। ১৭৫ বলে গড়া শান্তর ১৪৬ রানের দুর্দান্ত ইনিংসটিতে ছিল ২৩টি চার আর ২ ছক্কার মার।
এই টেস্টেই অধিনায়ক হিসেবে অভিষেক হয়েছে লিটন দাসের। নেতৃত্বের চাপেই কি স্বাভাবিক ব্যাটিংটা করতে পারলেন না? খুবই দৃষ্টিকটু আউটে সাজঘরে ফেরেন টাইগার দলপতি।
রিস্ট স্পিনার জহির খানের বলে খোঁচা দিয়ে প্রথম স্লিপে ক্যাচ দিয়েছেন লিটন। ১৫ বলের ইনিংসে একটি ছক্কা হাঁকিয়ে তিনি করেন ৯ রান।
১ উইকেটেই ২১৮ রান তুলে ফেলা বাংলাদেশ পরে ৭২ রান তুলতে হারিয়ে বসে ৪টি উইকেট। শেষ বিকেলে মুশফিক-মিরাজ হাল না ধরলে দিনটা আক্ষেপেই কাটতো স্বাগতিকদের।
সংক্ষিপ্ত স্কোর প্রথম দিন শেষে: বাংলাদেশ প্রথম ইনিংসে- ৭৯ ওভারে ৩৬২/৫ (মুশফিক ৪৩*, মিরাজ ৪১*; লিটন ৯, শান্ত ১৪৬, মুমিনুল ১৫, জয় ৭৬, জাকির ১) বনাম আফগানিস্তান।
বাংলাদেশ একাদশ: জাকির হাসান, মাহমুদুল হাসান জয়, নাজমুল হোসেন শান্ত, মুমিনুল হক, মুশফিকুর রহিম, লিটন দাস (অধিনায়ক ও উইকেটকিপার), মেহেদী হাসান মিরাজ, তাইজুল ইসলাম, তাসকিন আহমেদ, শরিফুল ইসলাম, এবাদত হোসেন।
আফগানিস্তান একাদশ: ইব্রাহিম জাদরান, আব্দুল মালিক, হাশমতউল্লাহ শহীদী (অধিনায়ক), রহমত শাহ, নাসির জামাল, আফসার জাজাই (উইকেটকিপার), করিম জানাত, আমির হামজা, জহির খান, নিজাত মাসুদ, ইয়ামিন আহমদজাই।