মিয়ানমার : একটি বিচ্ছিন্ন দেশের ইতিকথা

বাংলাদেশের পার্শ্ববর্তী দেশ মিয়ানমার। বাংলাদেশের সাথে সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে মিয়ানমারের গুরুত্বপূর্ণ সাদৃশ্য ও যোগাযোগ রয়েছে। বাংলাদেশের দক্ষিণ পূর্ব দিকে অবস্থিত মিয়ানমার আয়তনে বাংলাদেশের প্রায় ৫ গুণ। কিন্তু দেশটির জনসংখ্যা তার আয়তনের তুলনায় নিতান্তই অল্প।

বর্তমান মিয়ানমারকে বুঝতে হলে তাকাতে হবে এর অতীত ইতিহাসের দিকে। মিয়ানমারের জনসংখ্যার শতকরা প্রায় ৬৮% হল বর্মী জনগোষ্ঠী। বর্মী ভাষায় কথা বলা এই গোষ্ঠীটি সংখ্যাগরিষ্ট। দ্বিতীয় প্রধান জনগোষ্ঠী হলো কারেন জনগোষ্ঠী। যারা জনসংখ্যায় ১০%। জনসংখ্যার আনুমানিক ৮% নিয়ে তৃতীয় বৃহত্তম জনগোষ্ঠী শান উপজাতি। অন্যান্য প্রধান নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর মধ্যে কাচিন, চীন, মগ, আরাকানী এবং লাও।

প্রাচীন মিয়ানমারের সবচেয়ে শক্তিশালী এবং সমৃদ্ধ রাজবংশ ছিল পেগান রাজবংশ। এই সময় বর্মী ভাষা এবং সংস্কৃতি সমৃদ্ধি লাভ করে। পেগান রাজবংশ ১০৪৪ সাল থেকে ১২৮৭ সাল পর্যন্ত মিয়ানমার শাসন করে। এরপর ১২৮৭ সালে মোঙ্গল নেতা কুবলাই খান মিয়ানমার আক্রমণ করেন। যার কারণে পেগান রাজবংশ ধ্বংস হয়ে যায়। দীর্ঘ প্রায় অর্ধ শতাব্দী কাল নানান বিশৃঙ্খলার পর রেঙ্গুনের নিকটবর্তী পেগুকে রাজধানী করে পেগু রাজ্য স্থাপিত হয়। ১৪৭২ সালে রাজা ধামাজেদী পেগুর সিংহাসনে বসেন। এই সময় মিয়ানমারে বৌদ্ধ ধর্মের প্রসার ঘটে। ১৫৫০ সালের দিকে রাজা বেইন নং মিয়ানমারের ক্ষমতায় এসে মিয়ানমারকে সুসংহত করেন। ১৬৩৫ সালে রাজা থালুন পেগু থেকে রাজধানী আভাতে স্থানান্তরিত করেন। আভা ছিল সমুদ্র যোগাযোগ থেকে অনেক দূরবর্তী। এই সুযোগে মিয়ানমারের সিরিয়ামে ইংরেজরা প্রথম বানিজ্য কুঠি স্থাপন করে।

১৭৫৭ সালের ২৩ শে জুন পলাশীর আম্রকাননে দেশীয় ষড়যন্ত্রের সুযোগে ইংরেজরা নবাব সিরাজুদ্দৌলাকে পরাজিত করতে সক্ষম হয়। তারপর ১৮৫৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহের সুযোগে এদেশের একচ্ছত্র শাসন কর্তা হিসেবে আবির্ভূত হয়। সিপাহি বিদ্রোহের পরপরই ইংরেজরা পার্শ্ববর্তী দেশ দখলের দিকে মনোযোগ দেয়। আফগানিস্তান, ভুটান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, তিব্বত, মিয়ানমার ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের শিকার। ১৬৪৭ সাল থেকে ১৮৮৫ সাল পর্যন্ত চারটি ইঙ্গ-বর্মী যুদ্ধের মাধ্যমে ১৮৮৫ সালে মিয়ানমার পুরোপুরি ইংরেজ শাসনের অধীনে চলে আসে। দীর্ঘদিন ইংরেজ শাসনে থাকার পর ১৯৪৮ সালে মিয়ানমার ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসন থেকে স্বাধীন প্রজাতন্ত্র রুপে আত্মপ্রকাশ করে।

মিয়ানমারের জান্তার কারাগারে বন্দী অং সান সুচির পিতা অং সানের নেতৃত্বাধীন এএফপিএরএফএল’র সহায়তায় জাপানের আগ্রাসন থেকে মিয়ানমারকে মুক্ত করে ব্রিটেন। অ ং সানের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী নেতৃত্বে তৎকালীন মিয়ানমারের সরকারের অং সান ও এর ছয় সদস্যকে হত্যা করে। ১৯৪৮ সালে স্বাধীনতা লাভের পর প্রধানমন্ত্রী হন উ নু। ১৯৫৮ সালে এএফপিএফএল-এ ভাঙ্গন হলে চিফ অব স্টাফ জেনারেল নে উইন এএফপিএফএল সরকারকে হটিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করে। ১৯৬২ সালে জেনারেল নে উইন সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে ক্ষমতায় আসেন। তিনি মিয়ানমারের শাসন কাঠামোয় আমূল পরিবর্তন আনেন। অর্থনীতিকে জাতীয়করণ ও সোস্যালিস্ট পোগ্রাম পার্টি নামে একদলীয় শাসন কায়েম করেন। স্বাধীন সংবাদ মাধ্যম নিষিদ্ধ করেন। ১৯৮১ সালে জেনারেল নে উইন সাবেক জেনারেল সান ইউয়ের কাছে ক্ষমতা ছেড়ে দেন। ১৯৮৭ সালে সামরিক সরকার বিরোধী আন্দোলনে হাজার হাজার বিক্ষোভকারী নিহত হন।

১৯৮৯ সালে পুনরায় মিয়ানমারে সামরিক শাসন জারি করা হয়। সারাদেশ ব্যাপী গণতন্ত্রকামী হাজার হাজার নেতা কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়। মিয়ানমারের স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা অং সানের মেয়ে ও এনএলডির নেত্রী অং সান সু চি কে গৃহবন্দী করা হয়। ১৯৯০ সালে সাধারণ নির্বাচনে সু চি’র নেতৃত্বে এনএলডি বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়। কিন্তু সেনাবাহিনী জনরায় অগ্রাহ্য করে। দীর্ঘ সামরিক শাসনের পর ২০১৫ সালের পার্লামেন্ট নির্বাচনে সু চি’র নেতৃত্বাধীন এনএলডি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। ২০১৬ সালের মার্চে হতিন কিয়াও প্রেসিডেন্ট হন। সামরিক শাসকদের প্রভাব বিহীন ২০২০ সালের নির্বাচনে ৪১২ টি আসনের মধ্যে ৩৪৬টি আসন পায় সু চি’র এনএডি আর সেনা সমর্থিত ইউএসডিপি পায় ৩৩ আসন। কিন্তু নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ তোলে সামরিক বাহিনী পুনরায় শাসন ক্ষমতা দখল করে।

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে দীর্ঘদিন থেকে বসবাসরত ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী ‘রোহিঙ্গা’। বর্তমান বিশ্বের অন্যতম নিগৃহীত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী তারা। অষ্টম শতাব্দী থেকে ‘রোহিঙ্গাদের’ লিখিত ইতিহাস পাওয়া সত্বেও, মিয়ানমারের জান্তা সরকার তাদের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকার করে আসছে। তাদেরকে ভোটাধিকার, চাকুরী, শিক্ষা সর্বক্ষেত্রে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ১৯৬২ সালে জেনারেল নে উইন সামরিক শাসক হয়ে রোহিঙ্গাদের নানান বিধিনিষেধের বেড়াজালে বন্দী করেন।কিন্তু স্বাধীনতা অর্জন ও বহুদলীয় গণতন্ত্রের যুগে রোহিঙ্গাদের মধ্য থেকে পার্লামেন্টে তাদের প্রতিনিধিত্ব ছিল। সরকারের পদস্থ কিছু কর্মকর্তা ছিল রোহিঙ্গা জাতির। কিন্তু এর কিছুদিন পর ঈড়ঁহপরষ ড়ভ ংঃধঃব রোহিঙ্গাদের ভাসমান নাগরিক হিসেবে সাব্যস্ত করে। এরই পরিকল্পনায় ১৯৭৮ সালে প্রায় ১০ হাজার রোহিঙ্গা হত্যা করা হয়। ১৯৮২ সালের আইনে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব অর্জনের সম্ভাবনা কার্যকর ভাবে প্রত্যাখ্যান করা হয়। তারা সামরিক নির্যাতন ও উগ্র বৌদ্ধদের দ্বারা দমন-পীড়ন, খুন-ধর্ষণের শিকার হচ্ছে নিয়মিত। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭৮, ১৯৯২, ২০১২, ২০১৫, ২০১৭ সালে উদ্বাস্তু হয়ে পার্শ্ববর্তী দেশে আশ্রয় নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ১০ লক্ষের উপর রোহিঙ্গা শরণার্থী বাস করছেন।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মিয়ানমারে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় ব্যাপকভাবে কাজ করে যাচ্ছে। সম্প্রতি বাইডেন প্রশাসন ‘বার্মা অ্যাক্ট’ বিল পাশ করেন। শুধু তা-ই নয়, এ বিলকে তাদের প্রতিরক্ষা বাজেটের অন্তর্ভুক্ত করেন। মূলত মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র সংগ্রামকে এগিয়ে নিতে আমেরিকার এটি একটি দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা।

মিয়ানমারের প্রতিবেশী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ ও চায় সেখানে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হোক। সেখানকার সকল ক্ষুদ্র জাতিগুলোর পূর্ণ অধিকার প্রতিষ্ঠিত হোক। বাংলাদেশে অবস্থানরত ১০ লক্ষ রোহিঙ্গা শরনার্থীসহ, ভারত, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়ায় শরনার্থী শিবিরে মানবেতর জীবনযাপনকারী সব নিগৃহীত রোহিঙ্গা মানুষের ঠাঁই হোক তাদের আপন ভূমিতে।

১৭৮৪ সালে মিয়ানমারের দখলকৃত একসময়ের স্বাধীন ও সমৃদ্ধ দেশ আরাকানের সাথে বাংলাদেশের রয়েছে আত্মার সম্পর্ক। মধ্যযুগে আরাকান রাজসভায় বাংলা ভাষা চর্চার রয়েছে এক সমৃদ্ধ ইতিহাস। মহাকবি আলাওল, দৌলত কাজী, আব্দুল করিম খোন্দকার, কোরেশি মাগন ঠাকুর আরাকান রাজসভায় বাংলা ভাষার চর্চাকে নিয়ে গিয়েছিলেন উন্নতির স্বর্ন শিখরে।

লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক।