প্রধান দুই দলের রাজনৈতিক ইস্যু

অগ্নিকান্ডের ঘটনায় জনমনে নানা প্রশ্ন

রাজধানীর বঙ্গবাজার, ঢাকা নিউ সুপার মার্কেট, উত্তরা বিজিবি মার্কেট সহ দেশের বিভিন্ন স্থানেপরপর অগ্নিকান্ডের ঘটনায় জনমনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।  এসব ঘটনা নিছক দুর্ঘটনা, নাকি নাশকতাতা খতিয়ে দেখতে শুরু করেছে ফায়ার সার্ভিসসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীগুলো। গোয়েন্দারা ইতোমধ্যে মাঠে নেমেছে। তদন্ত শুরু করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটিও। কিন্তু  তদন্তের আগেই ঘটনার জন্য দুই প্রধান রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি একে অপরকে দায়ী করছে।  অগ্নিকান্ডের ঘটনাকে রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিনত করেছেন দুই দলের নেতারা।

এ নিয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, লজ্জা শরম থাকলে বিএনপি অগ্নিকান্ডের দোষ আওয়ামী লীগের ওপর চাপাতো না।  আওয়ামী লীগ জনগণের রাজনীতি করে, বিএনপি ক্ষমতা ও পকেটের রাজনীতি করে।  আওয়ামী লীগের কাছে ক্ষমতা হলো বিপদে মানুষের পাশে থাকা আর বিএনপির কাছে ক্ষমতা হলো ভোট চুরি।

আগুন কারা লাগাচ্ছে খোঁজ নেওয়া হচ্ছে জানিয়ে সেতুমন্ত্রী বলেন, বিএনপির গায়ে জ্বালা কেন? বাংলাদেশ ভালো আছে?  আগুন লাগানোর অভ্যাস বিএনপির রয়েছে, সরকার হটানোর যে আগুন নিয়ে খেলছে, সে আগুনে বিএনপি নিজেই ঝলসে যাবে।

যুবলীগ চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ বলেন,সাম্প্রতিক আগুনের ঘটনা আমাদের ব্যথিত করছে। জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।  এই ঘটনা নাশকতার ষড়যন্ত্র কি না সেটা সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখার জন্য সংশ্লিষ্ট সকলকে অনুরোধ করছি।

তিনি বলেন, জনগণ অনুমান করছে যে, অগ্নিকান্ডের জন্য বিএনপি দায়ী। তারা (বিএনপি) যাদের সঙ্গে শরিক করেছে জামায়াত তারাতো আগুন দেওয়ার প্রবর্তক, ১৯৭১ সাল তার প্রমাণ।  ৭১ সালে এই জামায়াত আমাদের গ্রামের পর গ্রাম পুড়িয়ে দিয়েছে।  ২০১৪ সালেও এই জামায়াতকে সঙ্গে নিয়ে তারা অগ্নিসন্ত্রাস করেছে।  সুতরাং তাদের সন্দেহ করার যথেষ্ট কারণ আছে।

অন্যদিকে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার বাজারে-বাজারে আগুন দিচ্ছে, অন্যদিকে জনগণের স্বপ্ন-ইচ্ছা, আকাঙ্খাগুলোকে আগুনে পুড়ে দিচ্ছে।  তিনি সরকারকেদায়ি করে বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার কোথাও সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারছে না।  তাই একের পর এক অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটছে।  অগ্নিকান্ডে হাজার কোটি টাকার কাপড় পুড়ে গেছে।  এরপর মানুষকে কীভাবে রক্ষা করা যায়, তার কোনো পরিকল্পনা নেই।

সরকারের অব্যবস্থাপনাকে দায়ী করে তিনি বলেন, বঙ্গবাজারে ভয়াবহ অগ্নিকান্ডে সব ধূলিসাৎ হয়ে গেছে।  এর আগে আরও বর্ণনাতীত ঘটনা ঘটেছে।  এর কারণ হলো সরকারের যারা প্রতিষ্ঠানগুলো দেখভাল করার দায়িত্বে রয়েছে, তারা উপযুক্ত নন।  তারা কী এমন উন্নয়নের কাজ করছে যে আগুন নেভানোর মতো বিভাগ পর্যন্ত তাদের নেই। সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর উদাসীনতা, অযোগ্যতা, দুর্নীতি ও নজরদারির অভাবের কারণে ভয়াবহ পরিণতির স্বীকার হতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।

এদিকে গত সোমবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল সাংবাদিকদের বলেছেন, আগুনের ঘটনাগুলো রাজনৈতিক নাশকতা কিনা, সেটা খতিয়ে দেখতে বলা হয়েছে সংশ্লিষ্টদের।  পুলিশ, ব্যবসায়ী, ফায়ার সার্ভিসসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষই নাশকতার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখছেন বলে জানান তিনি।  ব্যবসায়ী নেতারাও মনে করেন নাশকতা ছাড়া এসব সম্ভব নয়।  সেজন্য তারা নাশকতার বিষয়টি মাথায় রেখে মার্কেটে মার্কেটে নিরাপত্তা ব্যবস্থাও জোরদার করছেন।  সিসি ক্যামেরাসহ অন্যান্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা বাড়ানো হয়েছে।

মঙ্গলবার (১৮ এপ্রিল) ডিএমপি সদরদপ্তরে ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে বৈঠকেঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের প্রধান অতিরিক্ত কমিশনার মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ জানয়েছেন,রাজধানীর প্রায় প্রতিটি মার্কেটে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

হারুন অর রশীদ বলেন, আমরা দেখতে পাচ্ছি ঈদের আগে একের পর এক আগুন লাগার ঘটনা ঘটছে।  আগুন লাগার ঘটনা নাশকতা হতে পারে।  এজন্য রাজধানীর প্রায় প্রতিটি মার্কেটে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। সম্প্রতি বড় দুটি আগুন লাগার ঘটনা প্রায় একই সময়ে ঘটেছে।

প্রসঙ্গত, গত ৪ এপ্রিল সকাল৬ টার দিকে বঙ্গবাজারের ভয়াবহ আগুনের ঘটনা ঘটে।  সেখানে ছয়টি মার্কেটে ৫ হাজারের বেশি দোকান পুড়ে যায়।  পরদিন পাশের আরেকটি মার্কেটে আগুন লাগে।  এরপর ভয়াবহ আরেকটি আগুনের ঘটনা ঘটে ১৫ এপ্রিল রাজধানীর ঢাকা নিউ সুপার মার্কেটে।  সেখানেও প্রায় দেড় হাজার দোকান পুড়ে পাঁচ হাজারেরও বেশি ব্যবসায়ী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।  এতে লাখ লাখ টাকার পুঁজি হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

শুধু বঙ্গবাজার কমপ্লেক্সেই ৩০০ কোটি টাকার বেশি সম্পদের ক্ষতি হয়েছে বলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের তদন্তে উঠে এসেছে।  এরপর ১৭ এপ্রিল সকালে উত্তরায় বিজিবি মার্কেটে ও বিকালে বায়তুল মোকাররম জুয়েলারি মার্কেটে আগুন লাগে।  এসব আগুনে অবশ্য বড় ধরনের কোনও ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। একই দিনে বিকালে রংপুর নগরীর মতি প্লাজা নামের একটি মার্কেটে আগুন লাগে।  ফায়ার সার্ভিসের ১০টি ইউনিট দেড় ঘণ্টা চেষ্টা চালিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।  তবে ১০টি দোকানের মালামাল পুড়ে প্রায় ৫০ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন মার্কেটের ব্যবসায়ীরা।

রাজধানীতে একের পর এক অগ্নিকান্ডের ঘটনা আমলে নিয়ে ‘অতি ঝুঁকিপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ’ সুপার মার্কেট ও শপিং মলের তালিকা প্রকাশ করেছে ফায় সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স।  ঢাকা মহানগর এলাকায় ৫৮টি মার্কেট ও শপিং মল পরিদর্শন করে সংস্থাটি।  এর মধ্যে ৯টিকে অতি ঝুঁকিপূর্ণ, ১৪টিকে মাঝারি ঝুঁকিপূর্ণ ও ৩৫টি মার্কেটকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা হয়েছে।