মাদাগাস্কারে বাংলাদেশি তিন নাবিকের জেল: দেশে ফেরার আর্তনাদ

দক্ষিণ-পূর্ব আফ্রিকা মহাদেশের উপকূলীয় দ্বীপ রাষ্ট্র মাদাগাস্কারের কারাগারে মানবেতর জীবনযাপন করছে বাংলাদেশি তিন নাবিক।  চায়না পতাকাবাহী একটি জাহাজে চাকরি নিয়ে সেদেশের সমুদ্রবন্দরে অনুপ্রবেশসহ দুই মামলায় ২৫ বছরের সাজা খাটছে তিন বাংলাদেশিসহ জাহাজের ১৬জন নাবিক।  কারাবন্দী এসব নাবিক স্বদেশে ফেরার জন্য আর্তনাদ করছেন।  নিবন্ধিত নাবিক না হওয়ায় তাদের মুক্তির জন্য কোনো উদ্যোগই নিচ্ছে না সরকারি সংস্থাগুলো।  এদিকে দেশে উদ্বিগ্ন স্বজনরা।

দুই মামলায় ২৫ বছরের জেল হওয়া তিন নাবিক হলেন মো. এমরান (৩৬), পিতা -মো. আলমগীর, পিরোজপুর, হাসিফ সরদার (৪৩), পিতা-সুরত আলী সরদার, চিতলমারী, বাগেরহাট ও মো. সোহেল রানা (৩৯), পিতা- মো. আরশাদ মিয়া, দাউদকান্দি, কুমিল্লা। এছাড়া একই জাহাজে থাকা এস এম রোমান নামে অপর একজন নাবিক একটি মামলায় পাঁচ বছর জেল খেটে গত বছরের ২৭ জুন মুক্ত হয়ে দেশে ফিরেছেন।

সমুদ্রগামী জাহাজে লোক নিয়োগকারী সংস্থা বা ম্যানিং এজেন্টরা দেশি-বিদেশি জাহাজে নাবিকদের নিয়োগ দিয়ে থাকে।  নৌ-পরিবহন অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে দেশে অনুমোদিত ম্যানিং এজেন্ট রয়েছে ৬৬টি।  দুই বছর পর পর এগুলো হালনাগাদ করা হয়।  এ তালিকায় চট্টগ্রামের ম্যানিং এজেন্ট ব্রাদার্স শিপিং এন্টারপ্রাইজের নামও ছিলো।  নানা অনিয়মের কারনে নৌ-পরিবহন অধিদপ্তর এটির লাইসেন্স বাতিল করে দেয়।  ম্যানিং এজেন্টের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে চায়না পতাকাবাহী জাহাজ ‘এম.ভি. ফ্লাইয়িং’এ চাকরি নেন বাংলাদেশি চার নাবিক।  এছাড়া একই জাহাজে ছিলেন সেকেন্ড ওনার (মালিক), ক্যাপ্টেন, চীফ ইঞ্জিনিয়ারসহ ১১ জন চায়না নাগরিক এবং দুইজন বার্মার নাবিক মিলে ১৭ জন।

বাংলাদেশি চার নাবিকের পরিবার, কারাবন্দী নাবিক এবং মেরিনার্স অ্যাসোসিয়েশান সূত্রে জানা যায়, কারাবন্দী এমরান ২০১৭ সালের এপ্রিলে, হাসিফ ২০১৭ এর জুলাইয়ে, সোহেল রানা ২০১৮ এর মার্চে এবং রোমান ২০১৮ এর মার্চে এমভি ফ্লাইয়িং-এ চাকরি নেন। হংকং থেকে স্ক্র্যাপ নিয়ে ২০১৮ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর জাহাজটি ভিয়েতনামের উদ্দেশে রওয়ানা দেয়।  দুই দিন পর অর্থাৎ ২৮ সেপ্টেম্বর ভিয়েতনামের বন্দরে জাহাজ থেকে পণ্য আনলোড করা হয়।  জাহাজটির চায়না মালিকের নির্দেশে ক্যাপ্টেন ১৬জন ক্রুসহ খালি জাহাজ নিয়ে মালয়েশিয়া-সিঙ্গাপুর-মরিশাসের সমুদ্রবন্দর হয়ে ২০১৮ সালের ১৯ ডিসেম্বর মাদাগাস্কারের জলসীমায় প্রবেশ করে।  বিষয়টি নজরে পড়ে সেদেশের কোস্ট গার্ডের।  ওই দিন অর্থাৎ ১৯ ডিসেম্বর সেখানকার সময় রাত পৌণে একটার দিকে জাহাজটিকে অনুসরণ করে কোস্ট গার্ডের একটি জাহাজ। জলদস্যু ভেবে জাহাজের ক্যাপ্টেন দ্রুত ইঞ্জিন স্টার্ট দিয়ে বহির্ণোঙরে নিয়ে যায়।   টাগ বোর্ড থেকে সিভিল ড্রেস পরিহিত লোক একে ৪৭সহ ভারী অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে ধাওয়া করে বাংলাদেশি নাবিকবাহী জাহাজকে।  টাগ বোর্ড থেকে মুহূর্মুহু গুলি বর্ষণ এবং রকেট লাঞ্চার নিক্ষেপ করা হলে জাহাজের স্টিয়ারিং কন্ট্রোল রুমসহ বিভিন্ন জায়গায় আগুন ধরে যায় এবং ব্যাপক ক্ষতি সাধন হয়।   এ ঘটনায় জাহাজের সেকেন্ড ওনার এবং ক্যাপ্টেন গুলিবিদ্ধ হন।

দেশে ফেরা নাবিক রোমান জানান, অনুপ্রবেশের অভিযোগে ১৭ নাবিককে পাঁচ বছরের জেল এবং এক কোটি আরিয়ারি (মাদাগাস্কারের ১ আরিয়ারি = বাংলাদেশি ০.০২৪ টাকা) জরিমানা করা হয়।  একই রায়ে জাহাজের মালিককে পাঁচ লাখ ডলার জরিমানা করা হয়।  জাহাজের মালিক জরিমানা পরিশোধ না করায় সেদেশের সরকার ছয় লাখ ডলারে জাহাজটি বিক্রি করে দেয়।  জাহাজের মালিক ক্ষতিপূরণের টাকা পরিশোধ না করায় সেদেশের আদালত অপর একটি মামলায় বাংলাদেশি তিন নাাবিকসহ ১৬জনকে আরও বিশ বছরের সাজা দেন।   দ্বিতীয় মামলা থেকে রেহাই পান রোমান।

দেশেফেরা রোমান ২০১৮ সালের ১৯ ডিসেম্বর থেকে পরবর্তী লোমহর্ষক ঘটনার বর্ণনা দেন। এ প্রতিবেদকের সাথে মোবাইলে কথা হয় মাদাগাস্কারের তোয়ামসিনা প্রদেশে অবস্থিত তামাতাভ সেন্ট্রাল কারাগারে বন্দী এমরানের সাথেও।  নাবিকদের সংগঠন বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএমওএ)-এর সভাপতি ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ আনাম চৌধুরীর সহায়তায় কারারক্ষীদের ফাঁকি দিয়ে মোবাইলে এমরান এ প্রতিবেদককে জাহাজে ঘটে যাওয়া ঘটনা এবং জেল জীবনের বর্ণনা দেন।

দুজনেই এ প্রতিবেদককে বলেন, ঘটনার পরের দিন (২০ ডিসেম্বর) সকল নাবিককে জাহাজের একপাশে সবাইকে দাঁড় করিয়ে ডলার, চায়না ও বাংলাদেশি মুদ্রা, মোবাইলসহ যাবতীয় মূল্যবান জিনিষপত্র হাতিয়ে নেয় সেদেশের কোস্ট গার্ড।  শারীরিক এবং মানসিক নির্যাতন করে তথ্য আদায়ের চেষ্টা করে।  ২০১৯ সালের ৬ ফেব্রæয়ারি সকাল ১০টা পর্যন্ত বাংলাদেশি চার নাবিকসহ ১৭জনকে জাহাজে আটকে রেখে নানাভাবে নির্যাতন করে সেদেশের  আইনশৃংখলা বাহিনীরা সদস্যরা।  দুই মাস জাহাজে আটক রাখার পর ২০১৯ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয় বাংলাদেশি চার নাবিকসহ ১৭জনকে।

২০২২ এর  ২৭ জুন রোমান মুক্তি পেলেও বাংলাদেশি অপর তিন জনসহ জাহাজের ১৬ জন নাবিকের বিরুদ্ধে রোজ উড (রফতানি নিষিদ্ধ অতি দামী কাঠ) রফতানির অভিযোগে আরও একটি মামলা দায়ের করে সেদেশের সরকার।  ওই মামলায় ২০ বছরের শাস্তি দেয় নিম্ন আদালত।

মামলাটি করা হয় ২০২১ এর ১৮ নভেম্বর। দেশিয় মেরিনার্সদের অ্যাসোসিয়েশানের সভাপতি ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ আনাম চৌধুরী নাবিকদের আন্তর্জাতিক সংগঠন ইন্টারন্যাশনাল ট্রান্সপোর্টেশান ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের (আইটিএফ) কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগ করে একজন আইনজীবী নিয়োগ করেন।  আইটিএফ নিযুক্ত আইনজীবী নিম্ন আদালতের আদেশের বিরুদ্ধে গত বছরের ৩ মে আপিল করলে আদালত বাংলাদেশি নাবিকদের পক্ষে দায়েরকৃত আপিল খারিজ করে দেন। আইটিএফ সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে  সেদেশের সুপ্রিম কোর্টে শুনানীর জন্য একটি আবেদন করা হয়েছে।

কারাজীবনের বর্ণনা দিতে গিয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে কারাগার থেকে টেলিফোনে এমরান জানান, প্রতিদিন সকালে এবং বিকেলে একটি করে মাঙ্গাসু (অনেকটা বাংলাদেশি মিষ্টি আলুর মতো) এবং মাসে একবার ছোট চামচে পাঁচ চামচ পরিমাণ ভাত দেওয়া হয়।  কারাগারে আর কোনো খাবার জোটে না।মাদাগাস্কারে বাংলাদেশি কোনো দূতাবাস না থাকায় তারা আরও সংকটে পড়েছে।  সুমন নামে বাংলাদেশি এক ব্যবসায়ী এবং বাংলাদেশি নাবিকদের সংগঠন বিএমএমওএ বিষয়টি মাদাগাস্কাকারের কাছাকাছি মরিশাসের দূতাবাসের নজরে আনলে দূতাবাসের উর্দ্ধতন কর্মকর্তা কারাবন্দীদের একবার দেখতে যান এবং কিছু আর্থিক সহযোগিতা করেন।  এছাড়া জাহাজের চায়না মালিক কারাজীবনের প্রথম বছর খাবারের জন্য যৎসামান্য টাকা দিলেও পরে যোগাযোগ বন্ধ করে দেন।

অবিবাহিত এমরান আরও জানান, উচ্চ বেতনের আশায় ম্যানিং এজেন্টকে পৌণে পাঁচ লাখ টাকা দিয়ে জাহাজে চাকরি নিয়েছি।  সিডিসি জাল কিনা সেটি বুঝতে পারি নি।  সিডিসি জাল বলে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে আমাদের মুক্ত করতে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না।  সরকারের কাছে আবেদন, যদি অপরাধ করে থাকি তাহলে মাদাগাস্কারের কারাগার থেকে মুক্ত করে দেশে নিয়ে জেলে প্রেরণ করা হোক। আমার একমাত্র অবলম্বন বৃদ্ধা মাকে দেখতে দেশে ফিরতে চায়।  আশা করি, প্রধানমন্ত্রী মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে আমাদের মুক্ত করতে সহযোগিতার হাত বাড়াবেন।

কারাবন্দী হাসিব সরদারের স্ত্রী জাহনারা বেগম এ প্রতিবেদককে বলেন, শাশুড়ি এবং দুই সন্তান নিয়ে চরম অর্থকষ্টে জীবনযাপন করছি।  স্বামীর মুক্তির জন্য সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে ঘোরাঘুরি করেছি, মুক্তির আশ্বাস পাইনি।কারাবন্দী সোহেল রানার পিতা মো. আরশাদ মিয়া টেলিফোনে একই সুরে বলেন, পাঁচ বছর ধরে সরকারের নানা দপ্তরে ধর্ণা দিয়েছি। এখন হতাশ।  শুনেছি আরও একটি মামলায় ছেলের ২০ বছরের জেল হয়েছে।  ছেলের মুক্তির জন্য সরকারের পক্ষ থেকে কোনো উদ্যোগ গ্রহণ না করায় হতাশ সোহেলের বৃদ্ধ বাবা।

নাবিকদের সংগঠন বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএমওএ)-এর সভাপতি ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ আনাম চৌধুরী দেশ বর্তমানকে বলেন, আইএফটির সহায়তায় তিন নাবিকের মুক্তির জন্য আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।  কারাবন্দী তিন নাবিকের পরিবারকে আইটিএফের পক্ষ থেকে যতটুকু সম্ভব আর্থিক সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে।  কিন্তু আর্থিক সহযোগিতার চেয়ে বড় কথা আমার তিন নাবিককে মুক্ত করা।  সেদেশের সর্বোচ্চ আদালতে আপিল করা হয়েছে।  ক্যাপ্টেন আনাম মনে করেন, কুটনৈতিক পর্যায়ে উদ্যোগ নেওয়া হলে তাদের মুক্তি আরও ত্বরান্বিত হবে।

সরকারি সমুদ্র পরিবহন (শিপিং)-এর শিপিং মাস্টার মো. জাকির হোসেন চৌধুরী দেশ বর্তমানকে বলেন, মাদাগাস্কারে তিন নাবিকের ২৫ বছরের শাস্তির বিষয়টি তার জানা নেই।  যারা নিবন্ধিত নাবিক তারা জাহাজে ওঠার আগে সাইন অন করে যান।  তিনি অবশ্য স্বীকার করেন নানা অনিয়মের অভিযোগে ব্রাদার্স মিপিং এন্টারপ্রাইজের লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে।